যমালয়েও যখন রিপুর তাড়নায় বিবেকভ্রষ্ট

ইশরাত জাহান প্রমি:

আজ বিশ্বের সমগ্র দেশ করোনা ভাইরাসের মহামারিতে আতঙ্কগ্রস্ত। জীবন ও জীবিকার তাড়নায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় কিংবা সম্পূর্ণ অসহায়। তবে এই মৃত্যুপুরীর যমালয়ে দাঁড়িয়েও মানুষ যেন রিপুর তাড়নায় হত্যা করেছে তার বিবেককে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় চোখ বুলাতেই করোনার মৃত্যুর সংবাদের পর যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিগোচর হয় তা হলো নারী ও শিশু ধর্ষণের সংবাদ। এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ এই দুঃসময়কে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষদের উপর চালিয়ে যাচ্ছে নির্যাতন, যার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের মত ঘটনা।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে একটি সংবাদ দেখে রীতিমত স্তব্ধ হলাম। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে অচেতন করার ওষুধ খাইয়ে তারই ১৫ বছরের কন্যা সন্তানকে ধর্ষণ করে। মেয়েটি সজোরে চিৎকার করেও তার মাকে জাগাতে পারেনি। অতঃপর ধর্ষণ করার ঠিক ১৭ ঘন্টা পর চেতনা ফেরে মায়ের। কিন্তু ততক্ষণে যে অনেক দেরি হয়ে গেলো।

এইদিকে লকডাউন থাকা অবস্থায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় ঢাকা ফেরত এক নারী যাত্রীকে রিক্সা ভ্যান থেকে নামিয়ে আদিম উন্মত্ততায় মেতে উঠে একদল নরপশু।

এখানেই শেষ নয়। গ্রামাঞ্চলে অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারকে ত্রাণ বিতরণের নামে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ করছে আরেকদল নরপশু। এর সাথে জড়িত ছিলো স্থানীয় ইউপি সদস্য ও রাজনৈতিক নেতা মহোদয়গণ। ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর নামক একটি ব্লগে পেলাম এমন কিছু ঘটনার বিবরণ। বরগুনার তালতলীতে করোনাভাইরাসের কারণে বেকার হয়ে খাবারের অভাবে ভুগছিল এক দিনমজুর পরিবার। ওই পরিবারকে খাবার সহায়তা দেওয়ার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করতে সেই দিনমজুরের মেয়েকে তার বাড়িতে ডেকে পাঠায় স্থানীয় ইউপি ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান। মেয়েটি সেখানে গেলে তাকেও ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ঢাকার কেরানীগঞ্জ থানার খেজুরবাগ এলাকায় ত্রাণ নিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ বছর বয়সী এক মেয়ে শিশু। ত্রাণ দেয়ার নাম করে ওই শিশুকে বাড়িতে নিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়েছিলো। আর সেই সাথে ত্রাণ চুরির ঘটনা তো আছেই। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে বলতে হয় ভাতে মরবো তবু সম্ভ্রমকে হারাবো না।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার কতটা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিনই গড়ে ১৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। করোনাকালে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ ভাগ। ‘মানুষের জন্য’ নামক একটি ফাউন্ডেশনের জরিপে উঠে এসেছে, এপ্রিলে ১৭ হাজার নারী-শিশুর সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পেরেছেন, প্রায় ৪ হাজার নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। আর মে মাসে ৫৩ হাজার নারী ও শিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৩ হাজারের বেশি নারী ও শিশু এই ভয়াবহ পাশবিকতার শিকার। অর্থাৎ দুই মাসেই জরিপে অংশ নেওয়া নারী-শিশুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

তবে কেন সমাজকে এখনো এই ব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা যাচ্ছে না? বরং ক্রমাগত এই সহিংসতার হার বেড়েই চলেছে। এর উত্তর বের করতে আমাদের ধর্ষণ বিষয়ক আইনি বিষয়গুলো আলোচনা করা প্রয়োজন।

উপমহাদেশে নারী নির্যাতন রোধে প্রথম আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৮৬০ সালে। তবে সেখানে ধর্ষণের শাস্তি ছিল মাত্র ১০ বছর। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনী আনা হয় ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত) প্রণয়নের মাধ্যমে। সংবিধানের সেকশন ৯ এ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা সমমানের অর্থদন্ডের কথা বলা হয়েছে। যদি উক্ত ধর্ষক কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে তবেই সেই ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে ।

সুতরাং এখানেই স্পষ্টত প্রশ্ন তোলা যায় যে ধর্ষণের মতো একটি নিষ্ঠুর অপরাধের শাস্তি কেন এতো নগণ্য? এর মানে কি একজন ধর্ষককে উপযুক্ত শাস্তি পাওয়ার জন্য ধর্ষণের শিকার মেয়েদের জীবন নিতে হবে? আর সেই মেয়েটি কোনভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও যে সমাজের হাতে তাকে প্রতি পদে পদে খুন হতে হচ্ছে! জীবন্ত লাশের মতই তো তাকে বেঁচে থাকতে হয়। যদি একজন ধর্ষককে অতিদ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো তাহলে তা আরও বাকি ১০০ জনের মধ্যে ভীতি তৈরি করবে। তাই জানের মায়ায় হলেও হয়তো তখন তারা এই ঘৃণ্য অপরাধে লিপ্ত হবে না।

যতখানি আইন আছে তারও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের কোন নজির নেই বললেই চলে। কারণ আইন থাকতেও রয়েছে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘুষ প্রথার জের ধরে কিংবা প্রভাবশালী মহলের সাথে যোগসাজশ থাকাতে সহজেই তারা আইনের ফাক ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে সিরিয়াল রেপিস্টদের সংখ্যা।

আরেকটি কারণ হলো ধর্ষণের যে কোন মামলা প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘসূত্রিতা। এটি এতোই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যে ভুক্তভোগীরা শেষ পর্যন্ত ধর্ষকের সাথে আপোষ করে নিতে বাধ্য হয়। আমাদের দেশে হাজার হাজার ধর্ষণের মামলার বিপরীতে রয়েছে খুবই সীমিত সংখ্যক বিচারক এবং সাথে রয়েছে এজলাস সংকট। এর কারণে বিলম্বিত হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়াতেই।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ড. নমিতা হালদার এই বিষয়ে একটি চমৎকার যুক্তি দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে একসময় এসিড নিক্ষেপের ঘটনা প্রচুর ঘটলেও এখন সেটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে সরকার। এর কারণ হলো এসিড নিক্ষেপণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও তার বাস্তবায়ন। এসিড নিক্ষেপের যেকোন মামলার বিচারপ্রক্রিয়া মাত্র ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ রয়েছে এবং বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসিড নিয়ন্ত্রণ ট্রাইব্যুনালে প্রতিটি কার্যদিবসেই আসামিকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়। তাই অতি দ্রুত ট্রাইব্যুনালে শুনানি হয় এবং অপরাধীও উপযুক্ত শাস্তি পায়। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে এমন কঠোর কোন আইনের বালাই আমরা দেখছি না। তবে আইনে শুধু নামে মাত্র ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একেকটি মামলার শুনানিতে সময় লাগছে প্রায় বছরখানেক। এর উদাহরণ দিনাজপুরের ইয়াসমীনের ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লেগেছে ৯ বছর। নোয়াখালীর ট্রাইবুন্যালে ১৭ বছরের পুরনো একটি ধর্ষণের মামলা এখনো বিচারাধীন। মামলার এই শ্লথ গতির কারণে মনোবল হারিয়ে ফেলে অনেক নির্যাতিতা ও তার পরিবার।

সেই সাথে আরেকটি সমস্যা এখানে পরিলক্ষিত হয়। ধর্ষণের যে কোন মামলায় নির্যাতিতা মেয়েটিকেই তার ধর্ষণের বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়। আর সেই তদন্ত প্রক্রিয়াতেও মেয়েটিকে নানানভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয়। ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ, সাক্ষী জোগাড় করা ইত্যাদি বিষয়কে অনেকেই দ্বিতীয় ধর্ষণ বলে অভিহিত করেছে। তাই মানহানির ভয়ে অনেক মেয়েই আইনি ঝামেলায় না জড়িয়ে চেপে যেতে বাধ্য হয়। ফলে আমাদের দেশে ধর্ষণের মামলায় শাস্তির হার মাত্র ৩%।

তাই সরকারের উচিত ধর্ষণ রোধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সেই সাথে প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। ভিক্টিম ব্লেইমিং এর ভয়ে যেন কোন নির্যাতিতা মেয়েকে ধর্ষকের অপরাধ লুকিয়ে তিলে তিলে মরতে না হয়। মানহানির ভয়ে যেন কোন মেয়েকে জোর করে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া না হয়।

পাশাপাশি এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে গৃহ নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা রোধে সরকারি সাহায্য প্রদানের হটলাইনগুলোকে আরো তৎপর হতে হবে। আর ধর্ষণ দমনে নতুন করে একটি পৃথক ধর্ষণ দমন স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সেখানে বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে আমার ধারণা।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 407
  •  
  •  
  •  
  •  
    407
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.