পাপ-পূণ্য নয়, নিজেদেরই অস্তিত্বের সংকটে মৌলবাদী জঙ্গিরা

মুশফিকা লাইজু:

সমকাম বলতে পৃথিবীতে যে ব্যাপারটি আছে, তার অর্থ সমলিঙ্গে প্রেম। আরো সহজ করে বললে যখন কোন মানুষ সম-জৈবিক লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌন কামনা অনুভব করেন তখন সেই প্রবণতাকে সমকামী বলা হয়। আর সেই প্রেম বা কামনার সাথে জড়িয়ে থাকে ঐ মানুষটির আবেগ, অনুভূতি এবং প্রেম। সে বিষয়ে কথা বলা যাবে না কেন? যখন পৃথিবীতে এই প্রবণতা বা আবেগের অস্তিত্ব আছে। তবে ধর্ম বলেছে সমকাম পাপ!

এদিকে বিজ্ঞান বলছে প্রাকৃতিকভাবে কিছু মানুষের আলাদা ধরনের সহজাত যৌন প্রবৃত্তিই হলো সমকাম। প্রকৃতিগতভাবে বেশীরভাগ মানুষ যেমন বিষমকামী হয়ে থাকে, তেমনি কিছু সংখক মানুষ সমকামীও হতে পারে। আমরা জানি, বিশ্বপ্রকৃতি এবং মানবপ্রকৃতি একসংগে এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যৌন প্রবণতার জন্ম দেয়। যিনি ধর্ম মানছেন, মানবেন। আর যিনি বিজ্ঞান মানছেন, মানবেন। অন্য কারো ক্ষতি না করে ধর্মীয় বিধান বা যৌক্তিক বিজ্ঞান মানার অধিকার পৃথিবীর মানুষ হিসেবে সকলেরই নিশ্চয় আছে। যার যার পাপ সে সে ফলভোগ করবে। আমার পূণ্য আমারই কাছে, আমিই তার পুরস্কার পাবো। আর যদি জেনে-শুনে পাপই করে থাকি তবে তার শাস্তির জন্যও প্রস্তুত আছি। যদিও পাপ-পূণ্যের ধারণাটি সময়ের সাথে সাথে বদলাতে বদলাতে এসেছে। কোনো ধর্মে সমকাম পাপ, আবার কোনো ধর্মে বিধবা বিবাহও পাপ। ধর্মের মোড়কে কেউ সমকামীকে কুপিয়ে মারছে, কেউ বিধবাকে পুড়িয়ে মারার ফতোয়া দিচ্ছে। বেশীরভাগ সময়ে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ক্ষমতাবানদের সুবিধা করে দেয়ার জন্যই এই নিয়মগুলি বানানো হয়েছে। স্থান-কাল-পাত্র-সভ্যতা-জ্ঞান-অভিজ্ঞানভেদে তা বদলালে বদলাতেও পারে।

যদি আমাদের এই বাংলাদেশের দিকে তাকাই, দেখা যায় ৯০% মুসলমানের দেশে বেশ্যাবৃত্তি (দুঃখিত, আমি বেশ্যা শব্দটি ব্যবহার এবং বিশ্বাস কোনটাই করি না) একটি রাষ্ট্র স্বীকৃত স্বাধীন ও বৈধ পেশা। আর সেই দেশেই সমকামিতার জন্য জীবননাশের হুমকি দেয়া হয় সেটা বড়ই আশ্চর্য ব্যপার!! বেশ্যা (যদিও পূর্বাপর ধারণা থেকে নারীকেই বুঝিয়ে থাকে) একটা বৃত্তি যে পেশার ধরন হলো যৌনতা বিক্রি করা। চাইলে নারী-পুরুষ যে কেউ এই পেশা গ্রহণ করতে পারে। নিশ্চিত জানি, ধর্ম তো এই পেশাকেও বৈধতা দেয় না, যৌনতা বিক্রি তো ধর্মে মহাপাপ। এবং এই যৌনতা বিনিময় দুজন মানুষই করে থাকে, টাকার বিনিময়ে। একজন টাকা দেয়, অন্যজন টাকা নেয়। কিন্তু কখনও তো এরকম ঘোষণা শুনিনি যে, যৌনপল্লীর গেটে কোন ধর্মগুরু বা তার চ্যালা-চামুন্ডারা তলোয়ার ঝুলিয়ে রেখেছে এই মর্মে যে, কেউ এই দরোজা দিয়ে ঢুকলে বা বের হলে তার জন্য কঠিন শাস্তি অবধারিত!

এটা যে পুরোপুরি পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি তা যেকোনো চিন্তাশীল মানুষমাত্রই বুঝতে পারবেন। অবশ্য মূর্খ ও ভণ্ডদের কথা আলাদা। সুতরাং অন্যের শোবার ঘরে উঁকি দিয়ে যৌনাকাঙ্খা বা কাম চরিতার্থ করার পথ খোঁজা সভ্য বা মানবিক কাজ নয়। আপাত দৃশ্যমান নারী-পুরুষ দম্পতি তাদের ব্যক্তিগত যৌনতা বিনিময়ের জন্য কোন পথ অবলম্বন করে, তার খবর আমরা কয়জনে রাখি? এমন বহু স্বামী আছে যারা বিবাহিত স্ত্রীর পায়ু বা মুখই তার যৌনতার প্রথম ও প্রধান পছন্দ। কই তাদের হত্যার জন্য তো কোন দল তলোয়ার বা রামদা শান দিয়ে ঘুরে বেড়ায় না।

পৃথিবীতে যৌনতার বৈধ-অবৈধ মাপকাঠি আছে, আছে কাঠামোগত যৌন দিকনির্দেশনাও। আর তা একদল ক্ষমতাবান সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা নিজেদের আনন্দ ও স্বস্তির জন্য তৈরি করেছে। এবং কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘু জনসমষ্টির উপর চাপিয়ে দিয়েছে। কাঠামোর বাইরের এবং সমলিঙ্গের প্রতি যৌনতা যদি বিশেষ এক ধর্মের খাতায় পাপই বলেই গণ্য হবে, তবে সেই আপাত অদৃশ্যমান স্থানে ৭০ জন গোলাপী রংয়ের হুর (নারী না পুরুষ সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই) নিয়ে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করার লোভে অন্যের গর্দানের উপর খড়গ নিয়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকে মানুষেরা আসলে কোন্ কামী? বহু, সম, অসম, বিষম নাকি উভ? তারা আসলে কী? একগামী?

ধর্ম তো বহু আগেই বহুগামিতার অধিকার দিয়েই রেখেছে, তা আবার একের পর এক নয়, একই সাথে ধর্মের আশ্রয়ে এবং পুরুষতান্ত্রিক প্রশ্রয়ে। মানবিক সভ্যতার সাথে এই সাংঘর্ষিক বহুগামী উপাচার পৃথিবীতে চলছে। পৃথিবীর কোন প্রান্তে এই বহুগামিতার কারণে রক্তের উদযাপন দেখি না। কখনও বহুগামী পুরুষ তার কল্লা হারানোর ভয়ে সামাজিক সমাজের দ্বারে আকুতি জানায় না। আজ সেই বহুগামী গোপনে পায়ুকামী ক্রুদ্ধ ধর্মান্ধ মানুষেরা নিরীহ যৌন সংখ্যলঘু মানুষদের রক্তে হোলি খেলার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। যেন সভ্য মানুষেরা তাদের জৈবিক লিঙ্গ এবং যৌনক্রিয়ার ধরন খড়গ হাতে নরপিশাচদের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখেছে। দৃশ্যতঃ রাষ্ট্র অর্ধনমিত নেত্রে সেই দৃশ্য অবলোকন করছে মাত্র।

শেয়ার করুন:
  • 465
  •  
  •  
  •  
  •  
    465
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.