নারীর ফেসবুক স্বাধীনতা, তাহাদের উঁকিঝুঁকি এবং অনলাইন বুলিং

কাজী তামান্না কেয়া:

ফেসবুকে কিছু লিখেছেন? খেয়াল করেছেন কী অনুভূতিপ্রবণ বাঙ্গালীর অনুভূতি নড়ে-চড়ে উঠে ফেসবুক ওয়ালে কিছু লিখলে? ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে সমাজে চলমান ক্ষতিকর প্রথা নিয়েও ভালমন্দ কোন কিছু ফেসবুকে লেখা যাবে না। বললে বরং টুঁটি চেপে ধরতে আসবে প্রথমে আপনজনেরা, আপনি বিবাহিত হলে স্বামীর বাড়ির লোকেরা, ভাইবোনের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা, আর অনলাইনের অপরিচিতরা দলবেঁধে আক্রমণ করবে, তা যেন অদৃষ্টের লিখন।

আপনি কী নিয়ে লিখছেন সেটা বড় বিষয় নয়। আপনি নারী হয়ে লিখছেন, এটাই একটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আর যদি নারী অধিকার নিয়ে কিংবা পুরুষতান্ত্রিকতা নিয়ে লেখালিখি করেন, তাহলে তো আর কথাই নেই। মোট কথা আত্মীয়স্বজন, স্বামী, সন্তান, প্রতিবেশী এবং পরিবারের কাছ থেকেই কথা শুনতে হবে আপনাকে। যা একবাক্যে আপনার কাছে মনে হচ্ছে ভুল, সেই ভুল নিয়ে আপনি মত প্রকাশ করতে পারবেন না।

একবিংশ শতাব্দীতে আমরা তো অনেক এগিয়ে গেছি। আমরা নারীরা কি পারছি ফেসবুকে বা অনলাইনে হাত খুলে লিখতে? নারীর স্বাধীন লেখার বা পোস্ট দেয়ার ক্ষেত্রেটা কি তৈরি হয়েছে ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে?

দুই একটা উদাহরণ দেই। যেমন ধরুন আমাদের সমাজে বিয়েতে অঢেল টাকা খরচ করে শত শত হাজার হাজার মানুষ খাওয়ানো হয়। আচ্ছা, দুই থেকে পাঁচশো নাহয় বুঝলাম, কিন্তু এর বেশী আত্মীয় কয়জনের থাকে যে অত মানুষকে আপনি দাওয়াত করে খাওয়াতে যাবেন? এই খরচের বাইরে আছে আরো অনেক খাত, যেমন ছবি তোলা, ভিডিও করা, সোনার গয়না, চারটা পাঁচটা অনুষ্ঠান করা। এইসব করতেও তো আরো অনেক টাকা খরচ হয়। এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে পারবেন নিজের ওয়ালে? এখন আপনি যদি এই খরচ করতে না চান এবং তার স্বপক্ষে ফেসবুকে দুই’এক কথা লিখেন, দেখবেন ইনবক্সে চলে এসেছে আত্মীয়, বন্ধু, পরিবারেরা সদস্যারা। তাদের প্রথম কথা হবে, কেন লিখছেন? লিখে কী হবে? আরো জ্ঞান দিয়ে যাবে– এইসব লিখলে আপনারই ক্ষতি। আর আপনি অবিবাহিত হলে প্রথমেই মনে করিয়ে দেবে, আপনাকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না। পরিবার ছাড়াও উপহার হিসেবে আরো পাবেন অপরিচিত ছেলে, পুরুষের গালিময় ইনবক্স। তাদের সবার একই কথা—কেন লিখছেন? লেখাটাই কি অপরাধ? নাকি আপনি নারী লেখক সেটা অপরাধ? সমস্যাটা লেখালেখির চেয়েও বড়—আপনি নারী এবং লেখালিখি করা নারী– সেটা আপনার অপরাধ। আর বিষয়বস্তু তো আছেই।

আরো একটা উদাহরণ না টেনে পারছি না। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায়, চিটাগং এ কোরবানি দিয়ে মেয়ের বাড়ি রান পাঠানোর চল বহু আগে থেকে চলে আসছে। সিলেট অঞ্চলে ইফতার খাওয়ানোর নামে মেয়ের পরিবারে টাকা খরচ করানোর প্রতিযোগিতাও ইদানিং শুনছি। রোজা, ঈদ, কোরবানি এলেই এ সংক্রান্ত কিছু পোস্ট দেখি ভুক্তভোগীদের। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এই লেখাগুলি যারা লিখেছেন, তারা সেগুলো পোস্ট করছেন গার্লস গ্রুপে। নিজেদের ওয়ালে প্রকাশ করলে যে পরিমাণ বুলিং করা হবে কমেন্টে, ইনবক্সে কিংবা নিদেনপক্ষে হাহা রিঅ্যাক্ট দেওয়ার মাধ্যমে, তা নিতে কোন নারী কেউ চান না, সহজ উত্তর।

আমি বলছি না ঐ দুই অঞ্চলের সব পরিবার এমন। আমি বলছি, বহু পরিবার মোটের উপর এই দোষে দুষ্ট। এখন আপনি মেয়ে হয়ে এই সমস্যা নিয়ে ফেসবুকে নিজের ওয়ালে কথা বলতে চেষ্টা করে দেখুন। আমি বলে দেই কী কী বাধা আপনি নিজের পরিবার থেকে পাবেন।

আপনার বড় বোন থাকলে এবং তার শ্বশুরবাড়িও যদি একই মেন্টালিটির হয়, তাহলে সবার আগে বাধা দিবে আপনার বড় বোন। আপনি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পরিবারের বিরাট সম্মানহানি করে ফেলেছেন। এরপর বাধা দেবে আপনার ভাই। কারণ ভাইয়ের বন্ধু-বান্ধব আপনার ফেসবুক পোস্ট পড়ে ভাইকে টিপ্পনি কাটবে। ভাই এসে আপনাকে ধরবে। অথচ আপনারা সব ভাইবোন মিলে যদি এই বিষয়ে অনলাইনে, অফলাইনে সরব হতেন, তাহলে বছর বছর এইসব অপ্রয়োজনীয় খরচ করতে হতো না। আমি বলছি না, আপনার টাকা থাকলে আপনি এসব খরচ করবেন না। আমি বলছি আপনাকে এই খরচ করানোর জন্যে সর্বপ্রথম পরিবারের লোকেই চাপ প্রয়োগ করবে। আর ফেসবুকে এই বিষয়ে পোস্ট দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি করবে ঐ একই গ্রুপ, আত্মীয় এবং পরিবারের সদস্য।

আচ্ছা, সমাজ কি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়? সমাজে তো কত অমঙ্গলকর প্রথা ছিল। বিধবাদের বিয়ে না হওয়া, সহমরণ, নারী শিক্ষায় বাধা দেওয়া। সেই প্রথা কি একা একা উঠে গেছে? সেগুলোর বিরুদ্ধে কাউকে কথা বলতে হয়েছে, জনমত তৈরি করতে হয়েছে, বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এরপরেই আজকের মেয়েরা তার সফলতা ভোগ করছে। এরপরেও কি সবাই পেরেছে? নাহ। সমাজে আজও কত নারীর একবার ডিভোর্স হলে বা স্বামী মারা গেলে আর বিয়ে হয় না। বাংলাদেশের ৬০ ভাগ মেয়ে এখনও ১৬/১৭ বছর হবার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, ১৮ বছর বয়স হবার আগে তাদের অর্ধেকের বেশি আবার মা হয়ে যায়, অথচ সংবিধান মতে তারা তখনও শিশু। তো আপনি যদি এইগুলোর বিরুদ্ধে কথা না বলেন, সমাজ কি একা একা পরিবর্তিত হবে?

ফেসবুকে লিখে কোন পরিবর্তন হয় না, লিখে কী হবে? এই বাক্য দিয়েই শুরু হয় লেখালিখির ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু জানেন কি, দিনের কতখানি সময় আপনি ফেসবুক পোস্ট পড়ে কাটান? কত গবেষণার তথ্যউপাত্ত আজকাল ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়? ফেইসবুক হোক, ব্লগ হোক, আর ইউটিউব হোক—অনলাইনে সময় দেয়াটা আজকের বাস্তবতায় ধ্রুব সত্য। তো এমন প্ল্যাটফর্মে নারীর সমস্যা নিয়ে নারী নিজে লিখলে আপনি টুঁটি চেপে ধরার কে? আর কেনই বা ধরছেন? আপনার জীবনের সব ঠিক আছে তো? নাকি নিজের জীবন বলে তেমন কিছু নেই, তাই অন্যের টুঁটি চেপে ধরে সমাজ উদ্ধারের মহান ব্রত পালন করছেন?

আপনি যদি আমার মতন আঙ্গুল চালিয়ে নাও লেখেন, তবু দেখবেন, আপনার পোস্ট কী, সেগুলো দেখেও তারা নিজেদের মতো ধারণা করে বসবেন। তাই না লিখলেও আপনি ফেসবুকের বিনে পয়সার পুলিশি নজরদারী থেকে রেহাই পাবেন না। তাই যারা লিখেন না, তারা যে একেবারে শান্তিতে থাকবেন, সেটাও বলা যাচ্ছে না। তাই সময় হলো হাল না ছেড়ে কণ্ঠ জোরে ছাড়ার, হাত খুলে লেখার। আর অনলাইন বুলিং করতে আসে যেসব কুলাঙ্গাররা, ওয়ালে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করার। হ্যাপি রাইটিং!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.