অনার কিলিং (পর্ব-১): নারী যখন সম্মান নামক জড় বস্তুর আধার

মলি জেনান:

২০০৩ সাল। শাফিলিয়া তখন ১৭। টগবগে তরুণ এক প্রাণ। তুখোড় মেধাবী, পড়তেন এ লেভেলে। স্বাধীনচেতা মনে স্বপ্ন ছিল আইনজ্ঞ হবার। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি করতেন টেলিমার্কেটিং এর একটি কোম্পানিতে, উপার্জনের একটা অংশ খরচ করতেন দাতব্য কর্মসূচিতে। পছন্দ করতেন লেটেস্ট ফ্যাশনের পোশাক, নতুন ডিজাইনের জুতো আর ডায়েরি ভরা থাকতো ইংরেজি কবিতায়। সত্যিকার অর্থেই শাফিলিয়া ছিলেন গর্ব করবার মতো এক মেয়ে, যে সুযোগ পেলেই হয়ে উঠতে পারতো এক বাতিঘর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই আলোককণা বাতিঘর হয়ে উঠবার আগেই নিভে গেছে, বলা ভালো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে।

বাবা-মার মনে হতে থাকে শাফিলিয়ার স্বাধীনচেতা মনোভাব তাদের সংস্কৃতির অন্তরায় ও তার পশ্চিমী জীবনাচরণ তাদের পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনছে। তারা চাইতেন জন্মসূত্রে ব্রিটেনের নাগরিক হয়ে, সেখানকার মুক্ত পরিবেশে পড়াশুনা করে বড় হয়ে উঠেও তাদের সন্তানেরা হয়ে উঠুক পাকিস্তানের রক্ষণশীল পরিবারের একজন!
এই নিয়ে বাবা-মা ও শাফিলিয়ার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। তারা প্রতিনিয়ত মেয়ের পেছনে গোয়েন্দাগিরিতে মেতে উঠেন এবং তা বকাঝকা থেকে শুরু করে শারিরিক নির্যাতনে পৌঁছায়। এতেও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন তারা কৌশলে মেয়েকে পাকিস্তানে নিয়ে আসেন এবং তার অমতে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সমস্ত স্বপ্নকে পায়ে দলে এই বিয়ে শাফিলিয়ার কাছে মনে হয় মৃত্যুর সমান, তাই সে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে বাবা-মা তাকে আবার ব্রিটেনে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন; কিন্তু পরিবার ও সংস্কৃতির সম্মান রক্ষায় তার উপর শারিরীক ও মানসিক অত্যাচার চলতে থাকে পুরো মাত্রায়। এক পর্যায়ে তিন বোন ও ভাইয়ের সামনেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন তার বাবা-মা!

ছোট বোন আলিশার বর্ণনায় (সংক্ষিপ্ত) –

আপার দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন আব্বা। আম্মা বললেন-অনেক হয়েছে, আর নয়। এখানেই খেলা শেষ করে দেয়া যাক! মার কথা শুনে বাবা তাকে বললেন একটা পলিথিন ব্যাগ আনার জন্য। মা তাই করলেন। এরপর বাবা জোরে একটা ধাক্কা মেরে আপাকে ঘরের মেঝের ওপর ফেলে দেন। বাবা তার দুই হাটু আপার দুই উরুর উপর তুলে দিয়ে তাকে অনড়ভাবে ধরে রাখেন। আর দুই হাত দিয়ে ধরে রাখেন আপার দুই বাহু। পরে বাবা তাড়াতাড়ি পলিথিন ব্যাগটা আপার নাকে মুখে ‘সুন্দর করে’ চেপে ধরতে বলেন। মা তাই করেন। সে সর্বশক্তি দিয়ে গোঙানি দেয়ার চেষ্টা করে। আর মা সর্বশক্তি দিয়ে পলিথিনের ব্যাগটা নাকে মুখে অনড়ভাবে চেপে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। একদিকে প্রাণে বাঁচার সর্বোচ্চ চেষ্টা, আরেকদিকে নাকমুখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস বন্ধ করার জোর চেষ্টা। আমরা সকল ভাইবোন এই হত্যার দর্শক। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। একপর্যায়ে দেখা গেল, আপা নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা বন্ধ করে দিলেন। পা ছোড়াছুড়ি থামিয়ে দিলেন। বুঝলাম সব শেষ! মা মুখ থেকে পলিথিন ব্যাগটা সরিয়ে নিলেন। তারপর কোনো কারণ ছাড়াই আপার নিথর শরীরটার বুকের উপর বাবা কষে একটা লাথি দিলেন। আপাকে নির্মমভাবে হত্যা করতে দেখে আমি উপরের তলায় চলে যাই। কিছুক্ষণ পর আবার নিচে এসে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করি। দেখি মা একটি কার্টনে স্কচটেপ লাগাচ্ছেন আর বাবা আপার লাশ কার্টনে ভরার উপযুক্ত করার জন্য কেটে খণ্ড খণ্ড করছেন!

ছোট ভাইবোনদের সামনে বড় মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করে তাদের এই শিক্ষাই দিতে চেয়েছিলেন যে বড় বোনকে অনুসরণ করলে তাদের পরিণতিও হবে এমন। চোখের সামনে বড় বোনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও লাশ টুকরা করার দৃশ্য দেখে শাফিলিয়ার ভাইবোনদের মধ্যে মৃত্যুভয় ঢুকে যায়। তাদের হুমকি দেয়া হয়েছিল, কেউ জানতে পারলে তাদের পরিণতিও শাফিলিয়ার মতো হবে।
হত্যার ছয় মাস পর কাম্ব্রিয়ায় কেণ্ট নদীতে বন্যায় ভেসে আসা কার্টনে ভর্তি লাশের দেহাবশেষ পাওয়া যায়।

আপনার মনে হতে পারে এমন নৃশংস হত্যকাণ্ড আর হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি শাফিলিয়া কোনো বিরল দৃষ্টান্ত নয়। শাফিলিয়ার আগেও যেমন হাজার হাজার নারী অনার কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন, শাফিলিয়ার পরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি কোনও। অনার কিলিংয়ের শিকার হয়ে মারা যাওয়া নারীর সঠিক সংখ্যা কত তা জানা না গেলেও, প্রকৃত সংখ্যাটি যে কারো পিলে চমকে দিতে পারে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের পুলিশ বাহিনী ২০১০-১৪ সাল পর্যন্ত ১১,০০০ এরও বেশি অনার কিলিংয়ের মামলা রেকর্ড করেছে বলে জানা গেছে।

‘অনার কিলিং’ নামক গাল ভরা শব্দটিতেই লুকিয়ে আছে তার কারণ! ‘সম্মানের’ জন্য হত্যা! সম্মান! কার সম্মান? কীসের সম্মান? পরিবারের, সমাজের, ধর্মের, গোত্রের। আচ্ছা এই সকল প্রতিষ্ঠানের সম্মান নারীর শরীরে লেপ্টে দিয়েছে কে? প্রশ্ন করুন। পুরুষকে কেন এই সব সম্মান বহন করতে হয় না? রাজনীতিটা বুঝবার চেষ্টা করুন। নিজেকে ক্ষমতার আধার/শাসক ভাবতে গেলে শোষিত শ্রেণী থাকা চাই, ছড়ি ঘোরাবার জন্য প্রজাশ্রেণি না থাকলে সিংহাসন কণ্টকমুক্ত হয় না। সম্মানের ভার দিয়ে নারীদের নুইয়ে ফেলতে না পারলে পুরুষতন্ত্রের সিংহাসন যে টলে উঠবে। তাই নারীর স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা, প্রজ্ঞা, মেধা পুরুষতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে করে দেয় নড়বড়ে, ক্ষমতা হারাবার ভয়ে পুরষতন্ত্র হয়ে পড়ে খড়গ হস্ত। স্নেহময় বাবা, প্রেমময় ভাই হয়ে উঠেন হত্যাকারী! গর্ভধারিণীও থাকেন সেই দলে কখনো কখনো প্রথম সারিতে, এতে ভুল বুঝবার অবকাশ নেই যুগের পর যুগ পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তারাও একসময় টুলস হিসেবে ব্যবহৃত হন।

লেখক: মলি জেনান

আপনাদের খনা’র কথা মনে আছে? যিনি শ্লোকের মাধ্যমে প্রাত্যহিক ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ও ব্যবহার যোগ্য করে তুলেছিলেন, যে শ্লোকগুলোকে আমরা ‘খনার বচন’ বলে জানি। যার প্রজ্ঞা ও মেধায় মুগ্ধ হয়ে উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্য তাঁর নবরত্ন সভাকে বর্ধিত করে খনাকে দর্শন পণ্ডিত হিসেবে স্থান দেন। একজন নারীর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও পাণ্ডিত্য পুরুষতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়, তার মেধা ও প্রজ্ঞাকে পরিবারের লোকজন ঔদ্ধত হিসেবে নেয়। বাবার আদেশে ছেলে তার স্ত্রীর জিভ কেটে নেন এবং রক্তক্ষরণে খনা মারা যান।

(খনাকে নিয়ে আমার বেশ আগের একটি লেখা আছে যা চাইলে আপনারা পড়ে নিতে পারেন এই লিঙ্কের মাধ্যমে-https://womenchapter.com/views/19086)

চিন্তায় মেধায় ও মননে কেউ সমকক্ষ বা তার বেশি হয়ে উঠলে নিজেকে প্রথম লিঙ্গ ভেবে তাকে দ্বিতীয় লিঙ্গ করে শোষণ করাটা কঠিন এবং অসম্ভবও, তাই তাকে সম্মানের মুকুট পরিয়ে ভারে ন্যুব্জ করে রাখতে পারাটাই পুরুষতন্ত্রের রাজনীতি। একারণেই নারীর শরীরে পরিবারের, সমাজের, ধর্মের, গোত্রের সম্মান লেপ্টে দেয়া হয়। নারীকে করে তোলা হয় সম্মান নামক অলীক এক জড় বস্তুর আধার, যার মালিক সে নয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.