আমার অক্ষমতা আমারই অপরাধ

আসলাম আহমাদ খান:

সন্তানকে বলা হয়, মায়ের নাড়ি ছেঁড়া ধন। মায়ের কাছে সে ধনের মূল্য কখনো কমে না। বৃদ্ধ হলেও না। সন্তানের ভাল মন্দের সংবাদ কীভাবে যে মাতৃহৃদয়ে পৌঁছে যায়, প্রচলিত অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরও আমার কাছে তা এখনও এক মহা বিস্ময় ! এ বিস্ময়ের পরিপূর্ণ রহস্য কোনদিন উন্মোচিত হবে কি-না তাও জানি না।

১.
আমি তখন সদ্য আমেরিকা এসেছি। ছয় তলা বিল্ডিং এর পাঁচ তলায় আমার এপার্টমেন্ট। আমাদের বড় ছেলের বয়স তখন নয় কী দশ হবে। বাসার একটু সামনে থেকেই স্কুলবাসে উঠে এবং ফেরার সময়ও বাসার পাশেই নামিয়ে দেয়। মাঝ দুপুর। অধিকাংশ মানুষ তখন কাজের প্রয়োজনে বাইরে। হঠাৎ কে জানি বলাবলি করছে, এলিভেটর মাঝপথে বিকল হয়েছে। ভেতরে কেউ থাকলে থাকতেও পারে। সংবাদ শোনার পর ছেলের মা বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেল এলিভেটরের কাছে- যেন তার সন্তানই ভেতরে আটকা পড়েছে।
নাম ধরে ডাকলো, রূপাই!
ভেতর থেকে কান্না জড়িত অসহায় শিশু কণ্ঠের প্রত্যুত্তর পাওয়া গেলো। শুধু বললো, আম্মু…আমি বের হতে পারি না।
এবার মায়ের অস্থির হওয়ার পালা। কিন্তু সেসবের কিছুই হলো না। নিজের আবেগ ও অস্থিরতা সংবরণ করে ছেলেকে বললো, কোন চিন্তা নেই। এক্ষুণি তোকে বের করছি। যেন কিছুই হয়নি।
৯১১ নাম্বারে কল দিল। প্রত্যাশার চেয়ে কম সময়ের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে এলিভেটর থেকে ছেলেকে উদ্ধার করে মায়ের হাতে ফিরিয়ে দিল।
বাসায় ফেরার পর ঘটনা শুনে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা তোমার কাছে কেন মনে হলো যে, রূপাই-ই ভেতরে আছে ?
শুধু বললো, সংবাদটি শোনার পর আমার মনটা হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠলো ! কেন জানি মনে হলো,আমার রূপাই-ই ভেতরে আছে। এর বাইরে বিশেষ কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।
সেই – ‘কেন জানি মনে হওয়ার’ বিষয়টা আমার কাছে এখনো বিস্ময়!

২.
গ্রামের এক প্রতিবেশী মা এবং সন্তানকে জানি। দুনিয়ার সমস্ত অপকর্ম করে বেড়ানো ছেলেটির নেশা এবং পেশা- দুটোই। বৃদ্ধ মাকে দেখাশুনা করা দুরের কথা, সুযোগ পেলেই মায়ের খাবারের চাউলগুলো পর্যন্ত চুরি করে বিক্রি করে দেয়। মায়ের গায়ে হাত তুলতে তার হাত একটুও কাঁপে না। অহরহ ঘটতে থাকা এমন ঘটনায় একদিন পাড়ার লোকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল, অপেক্ষা করছিল কখন সেই কুলাঙ্গার ছেলে বাড়ি ফিরে। আসার সাথে সাথেই যে তাকে ধরে উত্তম-মধ্যম দেয়া হবে- এটা আঁচ করতে পেরে অভিযোগকারী মা-ই গোপনে ছেলের কাছে সংবাদ পাঠালো যেন বাড়ির আশে-পাশেও না আসে। বিচারপ্রার্থী মা এখন লোকজনের কাছে অনুনয়-বিননয় করছে- যেন এবারের মতো তাঁর ছেলেকে মাফ করে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে সেই ছেলেকে সংশোধন হতে দেখিনি, বরং তাকে নিয়ে মায়ের অস্থিরতাই দেখেছি প্রতি মূহুর্তে।

৩.
“মায়ের কান্দন যাবত জীবন…
দু’চার মাস বোনের কান্দন রে..
ঘরের পরিবারের কান্দন
কয়েক দিন পরে থাকে না
দূঃখের ও দরদী আমার জনম দুঃখী মা
গর্ভধারিণী মা-জনম দুঃখীনি মা…”

—— আমার এক বোনের চার বছর বয়সী সন্তান অসুখে মারা যায়। এর পর আরও পাঁচটি সন্তানের মা হয়েছেন। ছেলেরা বিয়েশাদী করে নিশ্চিত জীবন যাপন করছে। মা এখন নাতী-পুতির বড়মা। এই বৃদ্ধ বয়সে সুযোগ পেলেই চলে যাওয়া সন্তানের জন্য অঝোরে কাঁদেন! মানুষের মুখের সাথে মুখ মেলান- বেঁচে থাকলে দেখতে কার মতো হতো।

৪.
এবার ক্যামেরার ল্যান্স নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়ার পালা। সোফিয়া লোরেন বলেছিলেন,-
“কোন একটা বিষয় মায়েদেরকে দুইবার ভাবতে হয়। একবার তার সন্তানের জন্য, আরেকবার নিজের জন্য।”

আমি তখন দেশে। পাঁচ ভাইয়ের সবার ছোট আমি। বড় দুইভাই আমেরিকা প্রবাসী। পরের দুইজন দেশে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমার বেসরকারী কলেজের বেতনের টাকা হাতে পাওয়ার ১৫ দিন পরেই শেষ হয়ে যেতো। প্রতি মাসে বাজার করে পাঠানো কোন স্থায়ী সমাধান নয় ,যে কারণে আম্মাই সবচে বেশি করে চাইতেন আমি যেন আমেরিকায় চলে আসি। একদিন সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এলো। আম্মাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন আমার প্রবাস যাত্রা স্বচ্ছন্দ করতে। আমেরিকা আসার পরেও প্রতিনিয়ত খোঁজ নিতেন আমি ঠিকমতো চলতে পারছি কি-না।
আসার দিন এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে আম্মাকে ফোন দিলাম চূড়ান্ত বিদায় নেয়ার জন্য।
আম্মার কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুনলাম ভিন্ন কিছু কথা, —‘দেশে কি মানুষ কিছু করে না’ !
আম্মার কান্না থামছে না…
অপদার্থের মতো প্রশ্ন করলাম, আম্মা কাঁদছেন কেন ?
উত্তরে বললেন, বাবারে… জানি না- কেন যে শুধু শুধু কান্না আসে…

দেশে থাকতে মা জীবিত থাকার সুবিধার সবটুকুই কাজে লাগিয়েছি নিজের প্রয়োজনে, বিনিময়ে মায়ের দিকে উপুড় করেছিলাম ভালোবাসার শূন্য কলসী। মা-কে দেশে ফেলে স্বপ্ন পূরণের দেশ আমেরিকায় আসলাম। এখানে এসে দিন রাত পরিশ্রম করে কোন সোনার হরিণের সন্ধান এখনো পাইনি। কঠোর পরিশ্রমের বদৌলতে হাতে কিছু ডলার আসে, দু’চাকার পরিবর্তে চার চাকা গাড়িতে চড়ি- এই যা। কিন্তু মাতৃহৃদয়ের ভালোবাসার কাছে তা একেবারেই নগণ্য। আর সপ্তম শ্রেণী পাশ মায়ের দূরদর্শিতার কাছে এম.এ. পাশ ছেলের সার্টিফিকেট পথের ধুলোয় উড়তে থাকা এক টুকরো উচ্ছিষ্ট কাগজ ছাড়া আর কিছুই না।

পুনশ্চ: এ লিখার মাধ্যমে কাউকে কোন লেসন দেয়ার অভিপ্রায় কিংবা দৃষ্টতা কোনটিই আমার নেই। তবে কিছু উপলব্ধি করতে পারলে, তেমন কোন ক্ষতিও নেই।

৮ জুলাই ২০২০
নিউ ইয়র্ক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.