নারীর ভালো থাকায় নারীই ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’

কামরুন নাহার:

আমার এক ছাত্র একদিন নানান কথায় হঠাৎ বলে বসলো “আপনারা মেয়েরা এমন কেনো” ? আমি বললাম “কেমন”? ওর উত্তর ছিলো “আপনারা মেয়েরা একজন আর একজনের ভালো দেখতেই পারেন না”! আমি বললাম “এমন কথা কেনো বলছো”? আমি তাকে এই প্রশ্নটা করেছিলাম ঠিকই কিন্তু আমি নিজেও জানি তাঁর প্রশ্নটা খুব যৌক্তিক। ও আমায় একটি ঘটনা বলেছিলো সেদিন এবং আমি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলাম ওর কাছে যে “আমরা মেয়েরা আসলেই এমন”।

সৃষ্টির নিয়মেই নারীর পুরুষের আর পুরুষের নারীর প্রতি টান কাজ করে । বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এই টান বা আকর্ষণ কোনোটাই খারাপ নয় যদিনা তার মাধ্যমে কারো ক্ষতি হয় বা কেউ অতিরিক্ত বেনিফিসিয়ারি হয়। আবার সবসময় যে এমনটা হয় তাও নয়। শিক্ষক আমি সেই জায়গা থেকেই একটা সরল উদাহরণ দেই। ছাত্ররা ফিমেল টিচারদের আর ছাত্রীরা মেল টিচারদের পছন্দ করে এটা আমার নিজের চোখেই দেখা; এটা আমি যখন ছাত্রী ছিলাম তখনও দেখেছি। কিন্তু এর ব্যাতিক্রমটাও আছে।

আমার ভাগ্য একটা দিকে খুব ভালো (!) আমি ছাত্র এবং ছাত্রী উভয়ের ভালোবাসা পেয়েছি অকৃপণভাবে এবং সেই অকৃপণভাবে ভালোবাসা পাওয়ার মাশুলও আমায় নানানভাবে দিতে হয়েছে। সামাজিক কারণে ছাত্রীরা পরিবার থেকে আমার ভ্রমণসঙ্গী হবার অনুমতি পেতো না। তাই ভবঘুরে আমি ছাত্রদের নিয়ে ঘুরতাম এবং এখনও ঘুরি।

আর এই ঘুরাঘুরির একটা বেশ ভালো ইম্প্যাক্ট পড়তো মেয়েদের মনে। তারা এটাকে অন্যভাবে রঙ দিতো। “ম্যাডাম ওকে নিয়ে ঘুরতে যায় কেনো এতো ? ম্যাডামের ওর সাথে নিশ্চয়ই কোনো আলাদা সম্পর্ক আছে” এই জাতীয় কথা তারা বলে বেড়াতো এবং আজও তা অব্যাহত আছে। যেসব ছাত্রদের সাথে ভ্রমণ করেছি তাদের মেয়ে ক্লাসমেটরা আমার সম্পর্কে কী বলছে সেটা সেই ছেলেরা এসে আমায় বলতো, সরাসরি নয় অবশ্য, কিন্তু আমি বুঝে নিতাম। সেই থেকে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত আমি দেখেছি ছাত্রীরা আমায় ভালোবাসার ভান করতো বেশি, ভালোবাসতো কম। কিন্তু আমার এমনও ছাত্রী আছে যাদের কাছে নিজের বোন এর চেয়ে আমি কম কিছু নই। আমার বিশ্বাস অধিকাংশ ফিমেল টিচারের সাথেই এমনটা হয়। মেল টিচারের সাথেও এমনটা হয় না তা বলছি না! কোনো ছাত্রীর সাথে কোনো মেল টিচারকে কোথাও বসে কফি খেতে দেখলে বাকিটা কেমিস্ট্রি ! যাক সে কথা আমার বিষয় ছাত্রী-শিক্ষক কেমিস্ট্রি নয়!!

আমি আমার ওই ছাত্রটাকে বলেছিলাম “বাবা শোনো – আদি থেকে আজ অব্দি সমাজে নারীরা নানানভাবে বঞ্চিত। পাশের বাড়িতে বেড়াতে গেলেও একটা ১৬ বছরের মেয়েকে তার চার বছরের ভাইটির আঙ্গুল ধরে যেতে হয়। হোক বয়স চার সে ছেলেতো! বোনকে প্রোটেকশন দেবে! আর এই অবস্থায় আমি অবিবাহিতা একজন যখন সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঘুরে বেড়াই তখন সেটা পুরুষদেরই নিতে কষ্ট হয়; পারলে তারা আমায় ছাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে ফেলে! আর সেখানে দিনের পর দিন নিয়মের ঘেরাটোপে আটকে থাকা একটা মেয়ে যার সীমানা বাসা থেকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত সে যখন তার চোখের সামনে একজন নারীকে এমন বিন্দাস ঘুরে বেড়াতে দেখবে তার জ্বলবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেও এমন স্বাধীন, স্বনির্ভর একটা জীবন চায়, মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে চায় কিন্তু পারেনা। সেও এমন নিশ্চিন্ত, নির্ভার একটা জীবন চায়; সেও চায় অন্যের আকর্ষণের কেন্দ্র হতে। কিন্তু সে যেহেতু এটা পায়না তাই অন্য আর একজন এটা পাচ্ছে এটা তার পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন হয়। তখন তার নামে দুইটা বাজে কথা বলে সুখ পাওয়া ছাড়া তার আর কিছু করার থাকেনা। আর ম্যাডামের সাথে ঘুরতে যেতে না পারা একজন ছাত্রী একজন শিক্ষিকাকে ছাত্রের সাথে নানান সম্পর্কে জড়ায় এবং ছাত্রের সাথে শুইয়ে দিতেও ছাড়ে না। এই কাল্পনিক শুইয়ে দেয়ার মাধ্যমে একজন ছাত্রীর তার বন্ধুর মতো কোথাও যেতে না পারার কষ্ট, ম্যাডামের মতো হতে না পারা কষ্টের এক ধরণের রিলিজ (ক্যাথারসিস) হয় এবং অভিজ্ঞতা থেকেই বলি এটা পুরুষের তুলনায় নারীর মধ্যে বেশি হয়।

আমরা নারীরা বেশ অদ্ভুত। আমরা বঞ্চিতদের কাতারে আর তাই আমাদের উচিত একজনের আর একজনের সমব্যথী হওয়া, সহমর্মী হওয়া। সেটাতো আমরা হই-ই না উল্টো কোনো একজন নারীর ব্যাক্তি জীবন বা কর্মজীবনে যখন ভালো কিছু হতে যায় তখন আমরা নারীরাই সেই ভালোর পথে ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’ হয়ে দাঁড়াই। শুধু কর্মক্ষেত্র নয়, সবখানেই নারী খুব কম সময়ই নারী-বান্ধব হয়। বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে আসলেও দেখবেন একজন নারীই পাত্রীকে বলে হেঁটে দেখাও, চুল দেখাও, সূরা ইয়াসিন শোনাও!

যেখানে কাজ করেন একটু কল্পনা করেন সেখানে আপনার সমব্যাথী একজন নারী সহকর্মী না পুরুষ সহকর্মী। আপনি বসের রুম থেকে বের হয়ে এলে আগে কে টিপ্পনী কাটে! আপনার প্রমোশনে কার পিত্তি বেশি জলে! আর কোনো কারণে যদি আপনার বস নারী হয় তাহলে তার আচরণ আপনার সাথে কেমন হয় আর আপনার পুরুষ সহকর্মীর সাথে কেমন হয় খেয়াল করুন! কোনো গবেষণা নয়, আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি যে অফিসে বস নারী সেই অফিসে তার নারী সহকর্মীরা বেশি বঞ্চিত। আপনার বান্ধবী খুব ভালো পজিশনে আছেন শুনলে , খুব বাড়ি-গাড়ি করেছে শুনলে আপনি বলে বসতেই পারেন “ওর মাথায় কিছু নেই তারপরও ও কিভাবে এতো কিছু করলো সেকী আমরা বুঝিনা”! আপনার মাথায় অনেক কিছু আছে, আপনি অনেক মেধাবী তা আপনি কেনো তার মতো ওই পজিশনে যেতে পারলেন না! কে আপনাকে আটকেছে! মূলত আপনার মুরোদ নাই তাই এসব বলে সান্ত্বনা নেন। নিতে থাকেন।

আর পুরুষ! অধিকাংশ পুরুষের ধারণা নারী তার মেধায় কিছু পায় না! যা পায় তা ‘নারী’ হবার যোগ্যতা দিয়ে; স্যারের রুমে সেজেগুজে গিয়ে বসে থেকে নয়তো বসের সাথে অফিস ট্যুরে গিয়ে। If the equation is that much easy then why don’t you try dear friend! হ্যাঁ গুটিকয় নারী ‘নারী কোটায়’ যোগ্যতার বেশি সুযোগ পায় কিন্তু সেটা আলাদা ইস্যু, এবং এই দেশে বিরল ঘটনা। আর পুরুষদের এমনভাবে ভাবতে আমরা নারীরাই সহায়তা করি। আমাদের নারীদের মনে রাখতে হবে সবকিছুর শুরু পুরুষের হাত ধরে। আপনার যতো বঞ্চনার গল্প, যতো অপ্রাপ্তির গল্প তার মূলে আপনার সমাজ যেটা পুরুষরা নিয়ন্ত্রণ করে । তারা আপনার ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আপনার ইমোশনকে নিয়ন্ত্রণ করে, আপনার মেধা-যোগ্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আপনার সিদ্ধান্ত, প্রেম-ভালোবাসা-ঘৃণাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এতো সুক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে আমরা নারীরা তা টের পাই না। আর সেই টের না পাওয়াই নারীকে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট

শেয়ার করুন:
  • 715
  •  
  •  
  •  
  •  
    715
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.