কীভাবে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে করোনাভাইরাস?

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক:

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মানুষের যে শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যহানি ঘটছে, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়ছে তাদের মস্তিষ্কেও। বিভ্রান্তির মতো ছোটখাট সমস্যা থেকে শুরু করে স্বাদ-গন্ধের অনুভূতি হারিয়ে ফেলা, এমনকি মারণঘাতি স্ট্রোক, সবকিছুরই মূলে রয়েছে কোভিড-১৯। ত্রিশ ও চল্লিশের ঘরে থাকা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী রোগীরা এই স্ট্রোকের ফলে এমন সব স্নায়বিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা হয়তো তাদেরকে ভোগ করে যেতে হবে আজীবন। যদিও গবেষকরা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো উত্তর খুঁজে পাননি যে কেন মস্তিষ্কে কোভিড-১৯ এ ধরনের প্রভাব ফেলছে, তারপরও ইতোমধ্যেই তারা কিছু সম্ভাব্য তত্ত্ব হাজির করেছেন।

এ বিষয়ক কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছেন রবার্ট স্টিভেন্স, এম. ডি.। তিনি জন্স হপকিন্স প্রেসিজান মেডিসিন সেন্টার অভ এক্সেলেন্স ফর নিউরোক্রিটিক্যাল কেয়ারের সহযোগী পরিচালক। কাজ করছেন জন্স হপকিন্সে ভর্তি হওয়া কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের স্নায়বিক সমস্যা নিয়ে। চলুন জেনে নেয়া যাক স্টিভেন্সের ভাষ্যে সেইসব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ব্যাপারে।

প্রশ্ন: কোন কোন উপায়ে করোনাভাইরাস মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে?

উত্তর: বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের কেসগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসের ফলে মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের কন্ডিশন (মানসিক অবস্থা) দেখা যেতে পারে।

তার মধ্যে রয়েছে:

বিভ্রান্তি
অচেতনতা
খিঁচুনি
স্ট্রোক
স্বাদ-গন্ধের অনুভূতিহীনতা
মাথাব্যথা
অমনোযোগ
আচরণে পরিবর্তন

এছাড়া কিছু রোগী প্রান্তিক স্নায়ুবৈকল্যের সম্মুখীনও হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গিলিয়ান-বারে সিনড্রোম, যার ফলে রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে, কিংবা শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার হিসাব মতে, কোভিড-১৯ ইউনিটগুলোতে আমি যেসব রোগীর চিকিৎসা করছি তাদের মধ্যে অর্ধেকের মাঝেই কোনো না কোনো ধরনের স্নায়ুবৈকল্যের উপসর্গ দেখা গেছে।

প্রশ্ন: গবেষকদের মতে কোভিড-১৯ কীভাবে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে?

উত্তর: এখন পর্যন্ত হওয়া গবেষণাগুলোর ভিত্তিতে আমরা মনে করছি চারভাবে কোভিড-১৯ মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। তবে এই চারটি ধরন সম্পর্কেই আরো বিস্তারিত ও নিখুঁত গবেষণা চালাতে হবে। কেবল তারপরই আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।

তীব্র সংক্রমণ

প্রথম সম্ভাব্য ধারণা হলো, ভাইরাসটি হয়তো যেকোনো উপায়েই হোক মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে এবং সেখানে তীব্র ও আকস্মিক সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে। চীন ও জাপানের কিছু কেসে স্পাইনাল ফ্লুইডে ভাইরাসটির জেনেটিক উপাদান শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ফ্লোরিডার একটি কেসে মস্তিষ্কের কোষে ভাইরাসটির ক্ষুদ্রাণুর চিহ্ন মিলেছে। এটি হওয়ার পেছনে কারণ হতে পারে এই যে, ভাইরাসটি রক্তপ্রবাহ কিংবা স্নায়ুতে প্রবেশ করেছে। কিছু কোভিড-১৯ রোগীর ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলা থেকে অনুমান করা যায় ভাইরাসটি হয়তো অলফ্যাক্টরি স্নায়ুর ভেতর থেকে প্রবেশ করেছে, যেটি নাকের ঠিক উপরেই অবস্থিত, এবং মস্তিষ্কের সাথে ঘ্রাণ বিষয়ক তথ্য আদান-প্রদান করে।

ওভারড্রাইভে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

দ্বিতীয় আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হয়তো কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ওভারড্রাইভের ভিতর প্রবেশ করে। এর কারণে শরীরে অসহনীয় মাত্রার প্রদাহ শুরু হয়, যার কারণে অনেক টিস্যু ও অর্গান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় এভাবেই মূল ভাইরাসটির চেয়েও, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়ায় রোগীরা বেশি যন্ত্রণার শিকার হয়।

শরীরের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা

তৃতীয় তত্ত্বটি হলো কোভিড-১৯ এর ফলে রোগীর শরীরের অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিবর্তন আসা — উচ্চমাত্রার জ্বর থেকে শুরু করে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া কিংবা একাধিক অঙ্গের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া। মস্তিষ্ক শরীরের এতসব পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না, যার ফলে মস্তিষ্কও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। মূলত এই কারণেই কোভিড-১৯ আক্রান্ত বেশি মারাত্মক রোগীদের প্রলাপ বকতে দেখা যায়, কিংবা অনেকে কোমায়ও চলে যায়।

রক্তজমাটের অস্বাভাবিকতা

চতুর্থ যে উপায়ে কোভিড-১৯ মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে তা হলো কিছু রোগীর স্ট্রোকে আক্রান্তের প্রবণতা। যেসব রোগীর অবস্থা বেশি গুরুতর, তাদের রক্তজমাটের প্রক্রিয়াও হয়ে যায় অস্বাভাবিক। তাই তাদের শরীরের অনেক ভেতরের কোনো শিরায় কিংবা ফুসফুসে জমাটবাঁধা রক্ত আটকে থাকতে পারে। এর ফলে ওইসব স্থানে রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। আর যখন রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না, তখন রোগী স্ট্রোক করে।

প্রশ্ন: ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠায় যাদের বয়স, এমন অনেক রোগী স্ট্রোক করছে। এমনটি কেন হচ্ছে?

উত্তর: যদিও আমরা এখনো জন্স হপকিন্সে এমন কমবয়সী কোনো রোগী পাইনি, তবে আমি আমার সহকর্মীদের থেকে নিউ ইয়র্ক ও চীনে এ ধরনের রোগীর রিপোর্ট পেয়েছি।

এটির কারণ হতে পারে রোগীদের অতিক্রিয়াশীল রক্ত জমাট প্রক্রিয়া। এছাড়া কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে আর যে প্রক্রিয়াটি অতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে তা হলো তাদের এন্ডোথেলিয়াল ব্যবস্থা, যা রক্তনালীর ভেতর অবস্থিত। এন্ডোথেলিয়াল ব্যবস্থায় এমন কিছু কোষ বিদ্যমান, যেগুলো রক্তনালী ও বডি টিস্যুর মধ্যে প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। কমবয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে জৈবিকভাবেই এই প্রক্রিয়াটি বেশি সক্রিয়। তাই অতিক্রিয়াশীল এন্ডোথেলিয়াল ও রক্ত জমাট প্রক্রিয়া একজোট হয়ে এই রোগীদের শরীরে জমাটবাঁধা রক্তের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে তাদের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।

তবে তারপরও, এখনই এটি বলে দেয়া ঠিক হবে না যে কোভিড-১৯ এর ফলে কেবল কমবয়সী রোগীদেরই স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। এমনটিও অবশ্যই হতে পারে যে সব বয়সের কোভিড-১৯ রোগীদেরই স্ট্রোক করার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

প্রশ্ন: জন হপকিন্স কীভাবে মস্তিষ্কের উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে?

উত্তর: আমরা নির্বাচিত কিছু কেস নিয়ে সম্ভাব্য সবচেয়ে উপযুক্ত গবেষণার মাধ্যমে কাজ করছি। এক্ষেত্রে আমরা ইমেজিং, যেমন এমআরআই, ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) এবং স্পাইনাল ফ্লুইডের নমুনাকে কাজে লাগাচ্ছি। তবে এই গবেষণাগুলো সম্পন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। আমাদের কোভিড-১৯ রোগীরা খুবই দুর্বল হতে পারে, সেই সঙ্গে বিভ্রান্তও। তাই আমাদেরকে তাদের রোগের চিকিৎসা করা এবং তাদের থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাঝে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। আশা করা যায় এর মাধ্যমেই আমরা একসময় যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করে ফেলব, যাতে করে এই ভাইরাসটিকে আমরা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবো, এবং ভবিষ্যতে এটি বা এ ধরনের অন্যান্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই চালাতে পারবো।

লেখাটি অনুবাদ করেছেন: জান্নাতুল নাঈম পিয়াল, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

https://www.hopkinsmedicine.org/health/conditions-and-diseases/coronavirus/how-does-coronavirus-affect-the-brain

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.