বাংলাদেশের মুসলিম নারীরা কি তালাক দিতে পারেন?

অর্পিতা শামস মিজান:

আমি যেহেতু আইনের সামাজিক প্রয়োগ নিয়ে কাজ করি, তাই আমার আইন সংক্রান্ত আলোচনাগুলো তাত্ত্বিকের চাইতে বেশি আসলে কি হচ্ছে সেটা নিয়ে। পারিবারিক আইন বাংলাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত আইনের মধ্যে অন্যতম। কিছুদিন আগে একটি আলোচনায় ইসলামিক আইনে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আলোচনার প্রসঙ্গে বোঝা গেল, প্রথমত মুসলিম নারীদের বৈবাভিক অধিকার সম্পর্কে অনেকে শুধু যে জানেন না তাই নয়, অনেকে ভুল জানেন, এবং বিশেষ করে নারীদের অধিকার সামনে আসলে সেটিকে অস্বীকার করার একটি প্রবণতা আমাদের সমাজে আছে।

নারীদের যে স্বতন্ত্রভাবে ‘স্বামী’ কে ছেড়ে দেয়ার অধিকার ও ক্ষমতা থাকতে পারে, এটা অনেকেই মানতে বা বিশ্বাস করতে পারেন না।

দুঃখের বিষয় এই যে, আইন আইনের জায়গায় থাকে। নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষমতা থাকুক না কেন, এই আইন প্রয়োগ করে নিজের অধিকার আদায়ের পথটি অত্যন্ত কন্টকাকীর্ণ। আদালত বা কাজী অফিস যে পদ্ধতিতেই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলুক না কেন, অধিকার আদায় করতে নারীদের যে যুদ্ধ করতে হয়, তার তুলনা নেই। এখানে কেবল অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত না। বরং, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস দেখানোর জন্য সমাজ যেভাবে নারীর ওপর হারেরেরে করে চরাও হয়, সেভাবে অন্যদের ওপর চড়াও হলে হয়ত সমাজে এত দুর্নীতি, খুন, রাহাজানি, সহিংসতা হত না।
মজার বিষয় হল, বিয়ে নিয়ে আমাদের সমাজে উৎসাহ থাকলেও বিয়ের আইনি দিকগুলো নিয়ে মানুষ মাথা ঘামায় না যেকারণেই অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে।

আমি তুলনামূলক পারিবারিক আইনের শিক্ষার্থী হিসেবে মাস্টার্সে থিসিস করেছি এবং পরবর্তীতে এর শিক্ষক হিসেবে পড়াশোনা করতে হয়েছে। তাই কিছু জানা আবশ্যক এমন তথ্য এখানে দিচ্ছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইসলামের নানা মাযহাবে নানা নিয়ম পালিত হয়, আমি এখানে কেবল সুন্নী মতবাদ দিচ্ছি।

১। ইসলামে বিয়ে কয় প্রকার?
– তিন প্রকার। সহি (বৈধ), বাতিল (অবোইধ), এবং ফাসিদ (নিয়মমাফিক নয় এমন বিয়ে)
২। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ করা যায়?
– না। ১৮ বছরের নিচে বিবাহ আইনত দণ্ডনীয়। But unfortunately if the conditions are met then the marriage is religiously valid.

৩। মুসলিম নারীরা কি নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারেন?
– হ্যাঁ। প্রাপ্তবয়স্ক সমঝদার (অর্থাৎ যিনি মানসিকভাবে সক্ষম) ব্যক্তি, পুরুষ ও নারী উভয়ই নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারে। আমাদের দেশে বিয়েতে মেয়ের পক্ষ থেকে উকিলবাবা নিয়োগের প্রথা আছে। এটি একটি বা প্রথা। কনে প্রাপ্তবয়স্ক হলে এটি ইসলামি আইন অনুযায়ী প্রয়জনীয় শর্ত নয়। তথাপি উকিলবাবা থাকা কোন সমস্যা নয়।

৪। কনে কি কথা না বলে সম্মতি দিতে পারেন?
– আমাদের দেশে অনেক সময় বলা হয় কনে লজ্জা পাচ্ছে, সে অন্যের কানে কানে সম্মতি দিলেও চলবে। এ বিষয়ে হাদিস-ও আছে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই বিষয়টিকে অপব্যবহার করা হয়েছে। বিয়ে করতে অনিচ্ছুক এমন অনেক মেয়েদের জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছে। কনের সম্মতি না থাকলেও মুরুব্বিরা বলে দেন যে কনের সম্মতি আছে। এ সমস্যা এড়ানোর জন্য কনের নিজ কন্ঠে কবুল বা রাজি বলা উত্তম।

৫। বিয়েতে সম্মতি মানে কী?
– বিয়েতে সম্মতি মানে কনে কেবল হ্যাঁ বলবেন তা না, তিনি খুশি মনে রাজি হয়ে হ্যাঁ বলবেন। অর্থাৎ, যদি তাঁকে ভয় দেখিয়ে, জোর করে, মানসিক চাপে ফেলে ( তুমি হ্যাঁ না বললে তোমার বাবা বাঁচবেন না, আমাদের সম্মান শেষ হয়ে যাবে ইত্যাদি) হ্যাঁ বলানো হলে সেটা ইসলামিক আইনের দৃষ্টিতে সম্মতি নয়।

৬। কনের সম্মতি না থাকলে কি বিয়ে হয়?
– কনের সম্মতি ছাড়া বিয়ে সম্পাদিত হলে ইসলামিক আইনে এটিকে বাতিল ধরা হবে। বাতিল বিয়ে মানে এখানে আসলে বর কনে স্বামী স্ত্রীতে পরিণত হবেন না এবং তাদের কোন পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সৃষ্টি হবে না।

৭। খালি কাবিননামায় স্বাক্ষর করা যায়?
– অনেক কনে বিয়ের সময় আবেগের কারণে কবুল বলে খালি কাবিননামা (যেখানে ঘর পূরণ করা হয়নি) স্বাক্ষর করেন। এটি ঠিক না। কাবিননামা হল বিয়ের দলিল যেখানে যাবতীয় শর্তাদি, দেনমোহরের পরিমাণ, কত আদায় কত বাকি, এসব লেখা থাকে। না পড়ে স্বাক্ষর করা advisable না।

৮। বিবাহিত মুসলিম নারী কি একতরফা বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন?
– Under islamic law, মুসলিম নারীরা তিনভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন:
ক) তালাক এ তাফওিয এর মানে বিয়ের সময় কাবিননামাতে হাসবেন্ড নারীকে তালাক প্রদানের অধিকার দেবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের আইন মোতাবেক, সকল কাবিননামায় ১৮ নং ঘরে নারীকে তালাক এ তাফওিয এর ক্ষমতা দেয়া হয়। এটি নিশ্চিত করা কাজী সাহেবের দায়িত্ব।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,তালাক এ তাফওিয এ দেনমোহর মাফ হয় না।
খ) খুলাঃ নারী এক তরফা বিচ্ছেদ করতে পারেন। খুলার ক্ষেত্রে অনেক সময় নারীকে বিচ্ছেদের জন্য হাসবেন্ডকে আর্থিক মূল্য প্রদান করতে হয়। তবে এ বিষয়ে আধুনিক অনেক মুফতি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছিনা।
গ) মুবারাঃ যাকে আমরা মিউচুয়াল ডিভোর্স বা পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদ বলি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে হাসবেন্ড ও স্ত্রী উভয়ই বিবাহ বিচ্ছেদ চান।

৯। বাংলাদেশে মুসলিম নারীরা কিভাবে বিচ্ছেদ করতে পারেন?
– ১৯৩৯ সালের dissolution of Muslim Marriages Act অনুযায়ীঃ
২। মুসলিম আইন মোতাবেক বিবাহিত নারী নিম্নোক্ত এক বা একাধিক কারণ সাপেক্ষে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি পাইবে:
(ক) যে তাহার স্বামী চার বৎসর যাবত নিরুদ্দেশ;
(খ) যে তাহার স্বামী দুই বতসর যাবত তাহাকে ভরণপোষণ দেন নাই অথবা দিতে গাফিলতি করিয়াছেন;
[(খ-অ) যে তাহার স্বামী মুসলিম পারবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর পরিপন্থী উপায়ে আরেকজন স্ত্রী গ্রহণ করিয়াছেন];
(গ) যে তাহার স্বামী সাত বা ততোধিক বতসরের কারাদন্ডে দণ্ডিত হইয়াছেন;
(ঘ) যে তাহার স্বামী যথাযথ কারণ ব্যতীত তিন বৎসর যাবত তাহার বৈবাহিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইয়াছেন;
(ঙ) যে তাহার স্বামী বিবাহ সম্পাদনের সময়ে নপুংসক ছিলেন এবং এখনও আছেন;
(চ) যে তাহার স্বামী দুই বতসর ধরে উন্মাদ, অথবা কুষ্ঠব্যাধী বা কোন তীব্র যৌনরোগে আক্রান্ত,
(ছ) যে তাহার পিতা অথবা অন্য কোন অভিভাবক কর্তৃক তাহার [১৮ বৎসর] হইবার পূর্বে তাহাকে বিবাহ দিয়েছিলেন, এবং [১৯ বৎসর] হইবার পূর্বে তিনি ঐ বিবাহে অস্বীকৃতি প্রকাশ করিয়াছেন:
তবে শর্ত থাকে যে, ঐ বিবাহে মিলন [consummated] হয় নাই;
(জ) যে তাহার স্বামী তাহার প্রতি সহিংস আচরণ করেন, অর্থাৎ,-
(অ) প্রায়শই তাহাকে নিপীড়ন করেন, অথবা হিংস্র আচরণের মাধ্যমে তাহার জীবন দুর্বিসহ করিয়া তোলেন, যদিওবা উক্ত হিংস্র আচরণ সর্বদা শারীরিক নির্যাতনে রূপ নেয় না, অথবা
(আ) তিনি বেপরোয়া জীবনযাপন করেন বা দুর্নামগ্রস্ত নারীদের সহিত ওঠা বসা করিয়া থাকেন, অথবা
(ই) স্বামী তাহাকে অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করেন, অথবা
(ঈ) স্বামী তাহার সম্পত্তি নষ্ট করেন বা সম্পত্তিতে তাহার নিজস্ব আইনগত অধিকার প্রয়োগে বাধা প্রদান করেন, অথবা
(উ) তাহার ধর্মচর্চা বা পালনে বাধা দেন, অথবা
(ঊ) একাধিক স্ত্রী থাকিলে, তাহাদের সাথে কোরান মোতাবেক সমান আচরণ করেন না;
(ঋ) এছাড়া অন্য যেকোন কারণে যাহা মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ বলিয়া স্বীকৃত হইয়া থাকে।
এক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ মোতাবেক কিংবা দেওয়ানী আদালতে মামলা করার মাধ্যমে বিচ্ছেদ।
দ্বিতীয় উপায়:
কাবিননামায় ১৮নং কলামে তালাকের ক্ষমতা অর্পিত হয়ে থাকলে এবং বিচ্ছেদের শর্ত হিসেবে উল্লিখিত কারণ মিলে গেলে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৭৪ ও এর বিধিমালার এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭/৮ ধারা মোতাবেক তালাকের নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ.

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য:
অনেকের ভুল ধারণা আছে যে, পারিবারিক আদালতের রায় পেলেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
পারিবারিক আদালতের রায়ে শুধু বিচ্ছেদ হবার কারণ/কারণগুলোর যাচাই অন্তে সিদ্ধান্ত হয় এবং তাই এটি দ্বারা কিন্তু অটোমেটিক্যালি বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না। রায়ের কপি মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৭/৮ ধারার বিধান পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর প্রেরণ করা হয়। সেখানে বর্ণিত ৭/৮ ধারার বিধানাবলি পালন করা শেষেই কেবল বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তাই যেভাবেই বিবাহ বিচ্ছেদ হোক না কেন বর্ণিত ৭/৮ ধারার বিধানাবলি পালন করা বাধ্যতামূলক।

“১০। নারী তালাকের মামলা করলে এক্ষেত্রে কি দেনমোহর মাফ হবে?
– দেনমোহর মাফ করা তালাকের পূর্বশর্ত নয়। ১৯৩৯ সালের আইনের কথা:
৫। এই আইনে উল্লিখিত কোনকিছুই বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে বিবাহিত নারীর দেনমোহর বা সে সংক্রান্ত অন্য কোন অধিকার খর্ব করিবে না।

আশা করি আমরা জেনে বুঝে পারিবারিক আইন প্রয়োগ করবো। এটি কেবল আত্মসম্মানের বিষয় নয়, এটি পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সত্যি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.