“সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব যখন শাসকের হাতিয়ার হয়“

দিলশানা পারুল:

সমকামী ইস্যুটা এমন সময় অনলাইনে সামনে এলো যখন সরকার ২৫টা পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে। এক ধাক্কায় পাটকলের সাথে যুক্ত ৩০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছে, গতকাল রাতে পাটকল শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম ও ওলিয়ার রহমানকে সাদা পোষাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে আঞ্চলিক থানা, যেটার গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করে নাই, এক ধাক্কায় দেড় কোটি নতুন গরিব যোগ হয়েছে অর্থনীতিতে, ৫০ হাজার পরিবার মানে প্রায় এক লক্ষ ৩০ হাজার এর উপরে লোক ঢাকা ছেড়েছে অভাবের তাড়নায়, ১৩% নতুন বেকার যোগ হয়েছে।

ডয়েচে ভেলে বলছে, গরিব লোকজনের সংখ্যা শতকরা ৪০ বেড়ে যাবে। পত্রিকা অফিস, বায়িং হাউজ, পোষাক কারখানা, সমস্ত জায়গায় গণ ছাঁটাই চলছে। চারপাশে হাহাকার চলছে চিকিৎসা না পাওয়ার, ফেইসবুক খুললেই পত্রিকার ছবি দেখা যাচ্ছে ভোর চারটা থেকে মানুষ করোনা টেস্টের জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারা বিশ্বে যখন করোনা টেস্ট ফ্রি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে তখন তার জন্য সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে, বেসরকারি হাসাপাতালেও ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ এখন শোনার হরিণের নাম, স্রেফ বাচ্চা হতে গিয়ে চিকিৎসা না পেয়ে সুস্থ সবল মা মারা যাচ্ছে।

শুধু এইখানেই শেষ না, চোখের সামনে দিয়ে মন্ত্রী আমলারা বিমানে করে দেশ ছাড়ছে। মানুষের এই বিপদে যাদের হাল ধরার কথা তারা মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে উড়াল দিচ্ছে নিশ্চিত জীবনে। শুধু এতোটুকুই না, এইরকম একটা সংকট মুহূর্তেও স্বাস্থ্যখাতে কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে চলেছে ভয়াবহ দুর্নীতি। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে, হচ্ছে। দুদক জানাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেটের দুর্বৃত্তায়নের কথা। আবার এই বিষয়গুলা নিয়ে আপনি কথা বলবেন সেই উপায় নাই ডিজিটাল আইনে মামলা দিয়ে আপানাকে জেলে পাঠাবে, পাঠাচ্ছে। ঠিক এইরকম একটা সময়ই সমকামী ইস্যুটা এখন সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বিষয়টা যতোটা সহজ ভাবা হচ্ছে, তা নয়। মনে হচ্ছে, ইচ্ছে করেই ইস্যুটাকে সামনে নিয়ে এসে মূল ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা বা আড়াল করার চেষ্টা চলছে। খুবই পুরনো পদ্ধতি বলা চলে।

খেয়াল করেন একটা নাম বিক্রিতভাবে উচ্চারণ করার জন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাকে এরেস্ট করে হাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়, অথচ আয়মান সাদিককে হত্যার হুমকি দেয়া কাউকে চিহ্নিতই করা যায় না। কেন? প্রশ্ন করেন। অনলাইনে টেকনিক্যাল অসম্ভব দক্ষ একটা জনশক্তি আছে যারা খুব সুন্দর করে ভিডিও কাট করে কোন অংশটা ভাইরাল করতে হবে তা জানে এবং তা ভাইরাল করে। এই যে ঝাঁকে ঝাঁকে আইডি হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকার বিরোধী যেকোনো আলোচনায়, শয়ে শয়ে কমেন্ট করে, এরা কারা? একটা খুব দক্ষ মহল ফেবুতে আছে যারা চাইলে যে কোনো বিষয় ভাইরাল করে ফেলতে পারে। সবই একসূত্রে গাঁথা। এইটা কি কোন কন্সপিরেসি থিউরি আওড়ালাম? না। এইটা একটা নিপাট অবজারভেশন শেয়ার করলাম।

তার মানে কি এই আমাদের সমাজে হোমফোবিক নাই? অভিজিত রায়ের কি হত্যা হয় নাই? আছে। ঠিক যেমনি ভাবে ইসলামোফোবিক আছে, হোমোফোবিকও আছে। একটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক সংকট আর উপরেরগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট। একটা জনগোষ্ঠিকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করার একটা মোক্ষম অস্ত্র হলো তার সাংস্কৃতিক সংকট এবং দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রাখা এবং পারলে উসকে দেয়া। ধর্ম এবং সংস্কৃতি যখন শাসক এবং শোষকের অর্থনৈতিক শোষণকে আড়াল করার টুলস হয়, তখন আপনার ধারালো সচেতন হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।

শেয়ার করুন:
  • 124
  •  
  •  
  •  
  •  
    124
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.