ওয়েব সিরিজের নামে আরও ভয়ংকর গল্পের আভাস নেই তো!

এ্যানি হামিদ:

বাম মস্তিষ্ক বলছে হ্যাঁ! ডান মস্তিষ্ক বলছে না! ফেসবুকে নতুন একটি ওয়েব সিরিজের নাম “অগাস্ট ১৪” দেখতেই মনে হলো কী আছে তাতে? অন্যদের মন্তব্য পড়ার সাহস হলো না। সেনসিটিভ বিষয় মাঝে মাঝে এড়িয়ে যাওয়া জরুরি মনে করি। তবে নাটকের চরিত্রে কারা আছে জানতে ইচ্ছে হলো। জাস্ট ৩০ সেকেন্ড দেখলাম শেষের অংশ, মুহূর্তেই ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দিলাম। এর পরপরই মনে হতে থাকলো এতোটা প্রেডিক্ট করে লেখাটি কি দেয়া ঠিক হলো..? হুবুহু ঘন্টা খানেক আগের স্ট্যাটাসটাই দিলাম..

‘ঐশী’র জীবনকে নিয়ে নির্মিত নাটকের গভীরতা কতটুকু সহজ হলো সাধারণের বোঝার পক্ষে! আবারও মানুষের ভাবনার কাঠগড়ায় ঐশীর দিকেই অভিশাপের শত আঙ্গুল! কারাবন্দি জীবন; এর আড়ালেও যে কত ঘটনা বাকি রয়ে গেল সে গল্প ‌কে বলবে!’

তারপর হঠাতই মনে হলো, ঠিক লিখলাম তো? এরপর নিজেকে প্রস্তুত করলাম নাটকটি দেখার জন্য। মস্তিষ্কের দোলাচল হওয়ার কারণ হলো— যে কোন নেতিবাচক গল্প দুটো ফলাফল ধারণ করে- একটি শিক্ষণীয়, অন্যটি শিখে নেয়া। ওয়েব সিরিজের নামে আগামীতে আরও কোন ভয়ংকর গল্পের আভাস এলো না তো! ভেবে দেখবেন। কারো জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তার ব্যক্তিগত সবকিছু কতবার নগ্ন করা হবে; ঐশীর জন্য মায়া হচ্ছে। বুকে ব্যথা করছে, যতক্ষণ দেখছি অজান্তেই মাথা নাড়ছি। মা-বাবাকে হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধ নিয়ে আমাদের মনে যেমন তীব্র ক্ষোভ আছে, তেমনি ঐশীর এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঐশীর জীবন কাউকে না কাউকে ভাবায়।

‘অগাস্ট ১৪’ গল্পটির মেজর অংশ জুড়েই আবেদনময়ী দৃশ্য। পর্ণোগ্রাফির আসক্তি বোঝাতে গিয়ে গল্পের উপজীব্য হিসেবে এই বিষয়কেই পুঁজি করা হয়েছে। তাই একসাথে সবাইকে নিয়ে দেখা যাবে না। ঐশীর মুখটা চোখে ভাসছে। কী নির্মম! অন্তরঙ্গ দেখাতে গিয়ে রঙ্গ বিষয়ের অন্ত থাকলো না। পৃথিবীর বহু মানুষ পর্ণ আসক্ত। সেই আসক্তির ভয়াবহ মানসিক বৈকল্য দেখাতে গিয়ে গোসল করার দৃশ্য এতো আবেদন নিয়ে দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। পুরো সিরিজ-এ পর্ণ আসক্তির যে অঙ্গভঙ্গি তা দেখানোর কোন প্রয়োজন ছিলো না। যে জীবন-যাপনের উদাহরণ দেখানো হয়েছে তাতে এডিটিং-এ কোন অপাসিটি নেই। বছরের পর বছর ফুলদানি ভেঙে পড়া, দরজা বন্ধের দৃশ্যই তো গল্প বলে দেয়। এইসব সিম্বলিক দৃশ্যই যথেষ্ট। রূপক গল্প আর বাস্তব গল্পকে তুলে ধরা কিন্তু এক নয়, তাও যখন ঘটনাটির ভিন্ন মাত্রা আছে এই দেশে। বাস্তব ঘটনার যে আদল তাতে মাদকাসক্তির উপর লাইম লাইট থাকলেও এই সিরিজে বরং তা পরোক্ষ রেখে প্রত্যক্ষভাবে যৌনসম্পর্ক ব্যাপারটাকেই বার বার উপস্থাপন করা হয়েছে। কে না জানে সমাজের চোখে মেয়েদের এই চরিত্রায়নই অপরাধী হওয়ার জন্য সহজ-স্বীকৃত!! প্রশ্ন আসে মনে, ঐশী প্রকৃতপক্ষেই কেমন ছিল?!

এই গল্পটির মূল উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে সন্তানকে সময় দিন, পাশাপাশি সন্তানদেরও নিজেদের ইতিবাচক পরিবর্তনে সচেষ্ট হতে হবে তবে কিছু বিষয় অন্যভাবেও দেখানো যেত। কী জাস্টিফাইড করা হয়েছে অত নগ্নতা দেখিয়ে? গোয়েন্দাগিরি, জিজ্ঞাসাবাদ কোথায় নেই ট্র্যাকিং কৌশল উন্মোচন করে দেয়া! তা সে হোক ফোনে জায়গার নাম না বলা, গ্লাস-এর ওপাশে দাঁড়িয়ে থেকে আয়নার ভিউ দেখানো। সত্যিই ওয়েব সিরিজ বটে!! দিনশেষে এই সিরিজ কি শিক্ষণীয় হবে নাকি শিখে নেয়া হবে তাই দেখার বিষয়। উসকে দিলাম না তো কোন প্রজন্মকে? “মানুষের জন্ম মৃত্যুর কি কোন ঠিক আছে”-এই বক্তব্য যদি ঐশীকে প্রভাবিত করতে পারে তাহলে তো এই সিরিজে অসংখ্য বিষয় আছে যা কাউকে না কাউকে প্রভাবিত করতে পারে; বয়:সন্ধিকালকে এতো খাটো করে দেখবেন না। ঐশীর এই বাস্তবতা অনেকের জীবনকেই হয়তো প্রতিনিধিত্ব করে, সেই ক্ষতকে সারিয়ে তোলাটাই জরুরি।

কেউ কেউ রিভিউ-এ এই ধরনের সিরিজ এর উন্মুক্ততা দেখানোকে বাহবা দিয়েছেন। আর তাই ইউটিউবে অগাস্ট ১৪ সার্চ দিলে পাওয়া যায়–দ্য সেক্স-হট ওয়েবসিরিজ, ক্রাইম হট ওয়েব সিরিজ কিংবা বাংলাদেশের প্রথম ১৮+| এই সিরিজের বাহবা কিন্তু নারীকে পণ্য বানিয়েই, তা না হলে শরীরী দৃশ্য এতো মুখ্য হলো কেন!!

সিরিজে অনেক বার ‘ওয়ান সিক্সটি ফোর’ টার্মটি বলা হয়েছে, এই গল্প নির্মাণ ও প্রচারের সম্মতির ক্ষেত্রে ঐশীর স্বেচ্ছায় ওয়ান সিক্সটি ফোর আছে তো? আবারও যে ঐশীকে খোঁচানো হলো, ঐশী জানে তো? আবারও যে ধিক্কারে জর্জরিত সে খবর ঐশী পেয়েছে তো? ঐশীর ছোট ভাইটার সামাজিক অবস্থান কেউ ভেবেছে? গত সাত বছরে ওই ভাইটির তো এখন টিনএজ থাকার কথা! ও কীভাবে বড় হচ্ছে? ঐশীর কথা না হয় বাদই দিলাম, আমাদের কি কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই ওই ভাইটির প্রতি?

এদেশে ১২ মাসের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়, এদেশে নৃশংসভাবে নিত্য নির্যাতনের শিকার হয় অসংখ্য নারী, এদেশে ছেলে শিশুও নিরাপদ নয় পেডোফাইল মানসিকতার কাছে!! যদি মানসিকতা পরিবর্তনই উদ্দেশ্য হয় তবে তো সব ঘটনার ওয়েব সিরিজ হওয়া উচিত। আর ওয়েব সিরিজ নিয়ে প্রতিবেশী দেশ বা অন্য দেশ কী করলো, সংস্কৃতির ধারক-বাহক কী; তার তুলনা না করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কোনো সুস্থধারার ছবি নির্মাণই প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। ১৮ প্লাস কনটেন্ট কে কীভাবে দেখবে এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে যে জিনিস সর্বস্তরে কোন সীমা-পরিসীমা না রেখেই উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, সেই আশংকা উড়িয়ে দেওয়াটা বোধহয় ঠিক নয়। বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্য যেন কোন দ্বন্দ্ব তৈরি করতে না পারে এই নিয়ে সব মহলের নির্মাতাদের বোধহয় ভাবার সময় এসেছে। যে কোন নির্মাণে ‘প্রেক্ষাপট’ ব্যাপারটিকে আমলে নেয়া সময়ের দাবি।

যাই হোক। অপরাধী তো অপরাধীই। তার কোন ক্ষমা হয় না। যে কোন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন নি:সন্দেহে নেতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দেয়। তবে ভাবনার বিষয় পরিচালক যা বোঝাতে চাইলেন তা পুরোটা বোঝানো গেলো কি? তবে ভাববার বিষয় অনেকেই তিশার মারাত্মক অভিনয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন, ক্যামেরার কাজও নি:সন্দেহে প্রশংসা পেতে পারে। কিন্তু মনে রাখা উচিত এটা ঐশীর জীবন ছিলো, বানানো গল্প নয়; তার মানসিক অবস্থাটা যেন আমরা সত্যিকারের মনের লেন্স দিয়ে দেখি, ক্যামেরা দিয়ে নয়। বয়:সন্ধিকালের নানা টানাপোড়েন, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, আবেগীয় অবস্থার এপিঠ-ওপিঠ সঠিকভাবে মূল্যায়ন জরুরি।

২০১৩ সাল থেকে ২০২০ সময়টা নেহায়েত কম নয়, এরকম আর কোন ঐশী তৈরি না হোক। অসংখ্য ছেলে-মেয়ে মাদকাসক্ত জীবনে জড়িয়ে, ভুল পথে পা বাড়িয়ে নিজের জীবনের যে অন্ধকার ডেকে আনছে তাদের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ দেয়া আমার, আপনার, আমাদের সকলের দায়িত্ব। দায়িত্ব পরিবারের, দায়িত্ব সমাজের, দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই যারা এই ওয়েব সিরিজ কে নিয়ে আবার ঐশীকে সামনে আনলো, সেই গল্পের রেশ ধরে আমি, আপনি আজ রিভিউ দিলাম, হয়তো ভুলেও যাবো ক’দিন পর।
কিন্তু তদন্ত থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাবাসের গল্পটা ঐশী নিজে লিখে শেষ করতে পারবে তো?

লেখক: সমাজকর্মী

(উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত প্রতিটি লেখাই লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.