রবি টেন মিনিট স্কুল- সমালোচিত ভিডিও নিয়ে কিছু কথা

নাহিদ দিপা:

রবি টেন মিনিট স্কুলের বহুল সমালোচিত (আলোচিত) ভিডিও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কী ঘটেছে বুঝতে ওদের পেইজে গিয়ে দেখলাম তাদের মাফ চাওয়ার আর আত্মপক্ষ সমর্থনের পোস্ট। সেই পোস্টের নিচে প্রায় আট হাজার কমেন্টস! বুঝলাম, তারা সমকামিতা আর পিরিয়ড নিয়ে কথা বলেছে। মানবিক যারা, তারা সমকামিতাকে সমর্থণ করেন। তবে এ নিয়ে আমার বিশেষ কোন কোন মাথা ব্যথা নাই। তবে নিজের মাথা এখন খুব ঘামে পিরিয়ড নিয়ে। কারণ এটা আমার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পিরিয়ড নিয়ে কোথাও দুকলম লেখা হলে তা গিলে ফেলি। আমার দুর্ভাগ্য সেই মহাসমালোচিত (আলোচিত) ভিডিও আমার চোখেই পড়েনি।
কমেন্টসগুলো পড়ে মনে হলো টেন মিনিটস স্কুল ভিডিও সরিয়ে নিয়ে একদম ঠিক কাজটাই করেছে। পিরিয়ড তো আসলেই গোপন ব্যপার। কেন গোপন? কারন এটা মেয়েদের একান্ত নিজস্ব। এ নিয়ে ছেলেরা কথা বলবে, নাউজুবিল্লাহ, ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ।

ছেলেদের শরীরের চেয়ে মেয়েদের শরীরে যে একটা ছিদ্র বেশি আছে, যে ছিদ্র দিয়ে এই পিরিয়ড হয়, সেই একই ছিদ্র দিয়ে আপনি যখন বের হন, তখন আযান দেন আপনার বাবা। ছেলে হলে তো বেশ বেশ! তিন ছাগলের আকিকায় সারা পাড়া জানবে। মেয়ে হলে মিষ্টি মুখ। সন্তানের আগমন খুব গৌরবের আর খুব উৎসবের।
ঐ একই ছিদ্র দিয়ে কীসব হয় বিয়ের পর, পারলে বাসর রাতেই। সেই বিয়ের কার্ড ছাপানো থেকে শুরু করে খাবারে, লাখ থেকে কোটি টাকা খরচ করবেন সমাজের সব স্তরের, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ। এটা তো জন্মোৎসবের চেয়ে আরো বড় উৎসব।
গোল বাঁধে তখন যখন ঐ একই ছিদ্র দিয়ে মাসে মাসে রক্ত বের হয়। তা খুব শরমের। মেয়ে যেন কাউকে না বলে সেই মুখস্ত বুলি শিখিয়ে দেয়া হয়, পেটে ব্যথার যন্ত্রনায় মরে গেলেও ডাক্তার দেখানো যাবেনা, তা প্রচলিত অনেক শিক্ষিত আধুনিক পরিবারেও। কিন্তু ঐ মাসিক না হলেই যে বিয়ের রাতে ইয়েও হবে না, ইয়ে করে বাচ্চাও বের হবে না, সেটা যেন বেমালুম ভুলে যাই।

কদিন আগে এক কোম্পানি স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপনে দেখালো, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যেতে পারবেনা, কারন ওই সময়ে তার পিরিয়ড চলবে। আপনাদের জাত গেল।
তার কিছু দিন পর আরেক কোম্পানি বিজ্ঞপন দিল, ভাই তার ছোট বোনকে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের কথা বলে। তাতেও আপনাদের জাত গেল। ধর্মের কল নড়ে গেল।
আরেক বিজ্ঞাপন তো আরেককাঠি সরেস। মা হারা মেয়েকে কিনা স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে দেয়ার কথা বলে বাবা? ওই মেয়ের কি খালা-ফুপু নাই? বাপকেই এগিয়ে আসতে হবে?
অথচ এমনও হাজারে বিজারে বিজ্ঞাপনে যখন বাবা মেয়েকে বিয়ে দেয়ার কথা বলেন, কেউ পছন্দের আছে কিনা জানতে চান বড় ভাই, বন্ধুরা বিয়ে খেতে এসে কনডমের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে যায়। সদ্য প্রসূত শিশু নিয়ে বিজ্ঞাপনের তো কোন কমতি নাই। সব ওকে।

টেন মিনিটস স্কুলের ক্ষমা চাওয়ার পোস্টের নিচে যে আট হাজারের মত কমেন্টসের কথা বলছিলাম, তাতে তাকে আরেকবার ধুয়ে দেয়া হয়েছে। যারা বলতে চেয়েছে বা বলেছে ভিডিও দুটো সরানো উচিৎ হয়নি, তাদেরকেও ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়া হয়েছে। দারুণ না?

টেন মিনিটস স্কুলের সাথে জড়িতদের মেরে ফেলার উন্মুক্ত পোস্ট, ভিডিও ও আপলোড করা হচ্ছে।
এই দেশে কেন পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা কথা হবে বলেন তো? এই যে সাধারণ ছুটির তিন মাস দেশের ৫ কোটি ৪০ লাখ নারীর পিরিয়ড হয়েছে, তা তারা কীভাবে সামাল দিয়েছে, তা নিয়ে কী ভেবেছে এই দেশের কেউ? এই সময় টিভি আর সিনেমা জগতের নারী তারাকারা কি ডায়েট করেছে, কিভাবে সময় কাটিয়েছে, কোন বই পড়েছে, কোন গান শুনেছে, কে কীভাবে শরীরের ফিটনেস রেখেছে, কে কোন শাড়ি/জামা/লিপিস্টিক পরেছে, কে কী স্পেশাল রান্না করেছে…এমনকি কে কয়টা আম খেয়েছে সব পত্রিকায় এসেছে। কিন্তু কেউ কি বলেছে, সে কীভাবে তার পিরিয়ড সামাল দিয়েছে? কেউ কি বলেছে, তিন মাসে সে নিজে তো কিনতে যেতে পারেনি স্যানিটারি ন্যাপকিন, কাকে দিয়ে কিনিয়েছে কিংবা তারা কি ভেবেছে দেশের সেই দুর্গম এলাকার মেয়েটা বা ঘুর্ণিঝড় আম্পানে পানিবন্দি হয়ে যাওয়া মেয়েটা কী করেছে? কেউ কি জানতেও চেয়েছে?

অথচ আমরা কে না জানি, নিয়মিত মাসিক হওয়া একটা মেয়ের সুস্থতার লক্ষণ। স্বাস্থ্য আবার আমাদের মৌলিক চাহিদার একটা অন্যতম চাহিদাও বটে। যদি এসব আমাদের না ভাবায়, তারাকারা যদি মাসিক/পিরিয়ড নিয়ে কথা বলতে না চান, সংবাদ মাধ্যম যদি এসব খবর প্রকাশে অনীহা দেখায়, দেশের স্বাস্থ্যখাত যদি উদ্যোগি না হয়, তাহলে এদেশে পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা অবশ্যই গর্হিত অপরাধ। টেন মিনিট স্কুল পিরিয়ড নিয়ে কথা বলে ভুল করেছে। ভুল করে ক্ষমা চেয়ে আরো ভুল করেছে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.