প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রয়োজন জেন্ডার এডুকেশন

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

“আমি ওসব নারীবাদী-টাদি না, আমি হলাম মানবতাবাদী।”

“নারীবাদী হওয়াটা শুধু ভণ্ডামি। ভালো মানুষ হওয়াই জরুরি।”

নারীবাদ নিয়ে এ জাতীয় গালভরা কথা হরহামেশাই শোনা যায়। এমনকি যারা নিজেদের তথাকথিত নারীবাদী বলে মনে করে, তাদের অনেকের কাছেও নারীবাদের কনসেপ্টটা ঠিক ক্লিয়ার নয়। সুতরাং যারা নারীবাদবিরোধী, তারা যে নারীবাদ সম্পর্কে আগাগোড়া ভুল ধারণা পোষণ করবে, এতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া সভ্য সমাজেও নারীবাদকে যেভাবে হাস্যরসের উপাদান হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তাতে যারা প্রকৃত সত্যটা জানার চেষ্টা করে না, তারা যে বিভ্রান্ত হবে এবং ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের’ দেখানো পথেই হাঁটবে, এটাও খুব স্বাভাবিক।

তাই আগে জানা জরুরি, নারীবাদটা আসলে কী। তবে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নারীবাদের সংজ্ঞা শেখানো নয়। কারো যদি একান্তই জানার আগ্রহ থাকে, গুগলে গিয়ে একটু খুঁজলেই চলে। তাহলে আর নারীবাদ নিয়ে মনে হাস্যরসাত্মক ধ্যান-ধারণার পোকা বাসা বাঁধে না।

এই লেখার উদ্দেশ্য হলো সেই কারণটা খুঁজে বের করা যে কেন সমাজের বেশিরভাগ মানুষই নারীবাদ সম্পর্কে জানে না, কিংবা নিতান্তই ভুল জানে। এর কারণ, একে তো মানুষের নিজে থেকে জ্ঞান অন্বেষণের ইচ্ছা নেই বললেই চলে, সেই সাথে এমন লোকজনের সংখ্যাও খুব কম যারা মানুষের কাছে নারীবাদের প্রকৃত সংজ্ঞাটা তুলে ধরবে। ফলে অন্য অধিকাংশ বিষয়ের মতোই, নারীবাদ সম্পর্কেও তাদের জ্ঞানের প্রাথমিক (এবং সম্ভবত একমাত্র) উৎস ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া, যেখানে ঠিকের চেয়ে ভুলের ছড়াছড়িই বেশি।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। চতুর্থ বর্ষে আমাদের একটি কোর্সের নাম জেন্ডার অ্যান্ড কমিউনিকেশন। এই কোর্সের ক্লাস নিতে এসে শ্রদ্ধেয় কাজলী শেহরিন ইসলাম ম্যাম আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে নারীবাদী কে কে?” হাতেগোনা তিন-চারজন হাত তুলেছিল। এরপর ম্যাম প্রশ্ন করেছিলেন, “নারীবাদী নও কারা?” সেখানেও সাড়া দেয়নি প্রায় কেউই।

কারণটা খুব সহজ: নারীবাদ কী এবং নারীবাদী কারা, এ ব্যাপারে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই কোনো ধারণা ছিল না। নারীবাদ ও নারীবাদী টার্মগুলো যে বর্তমান সমাজে অধিকাংশ সময়ই মজার ছলে ব্যবহৃত হয়, সেটা তারা জানত। এমনকি কেউ কেউ হয়তো নিজেরাও সেসব রসিকতায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু একাডেমিক ক্ষেত্রে এসে যখন তাদেরকে নারীবাদ ও নারীবাদী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখনই তারা প্রথম বুঝতে পেরেছে, “আরে! আমরা তো আসলেই প্রকৃত অর্থটা জানি না!”

অথচ খেয়াল করে দেখুন, আমি বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের কথা। বিভাগটা গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার মতো সবচেয়ে প্রগতিশীল বিভাগ, যারা সাম্প্রতিক সময়ে যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে সবার আগে থেকেছে। এবং সর্বশেষ, ক্লাসটা ছিল চতুর্থ বর্ষের। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা সকলে ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠের অন্যতম সেরা বিভাগটিতে তিন বছর পড়াশোনা করে ফেলেছে, জীবনের অতি প্রয়োজনীয় অনেক অভিজ্ঞতাও অর্জন করে ফেলেছে। তবু তারা জানে না, নারীবাদ ভালো কি মন্দ। যদি কেউ নারীবাদকে মন্দ হিসেবেও আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করত, তাহলেও বিষয়টা খুব বেশি হয়তো খারাপ লাগত না। কিন্তু ভালো কি মন্দ তা-ই না জানা, এ তো রীতিমতো ইগনোরেন্স! একুশ শতকে বসেও সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের ন্যায় অজ্ঞতা!

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরাও যদি না জানে নারীবাদ সম্পর্কে, সেক্ষেত্রে দেশের আপামত জনতা এ বিষয়ে জেনে উল্টিয়ে দেবে, সে আশা আমরা কীভাবে করি! তারা তো নারীবাদ নিয়ে সস্তা কিছু জোক বা মিমে হাহা দিয়ে, নিজেরাও একই মানসিকতা ধারণ করেই ক্ষান্ত দেবে।

তাই জেন্ডার অ্যান্ড কমিউনিকেশনের সেদিনের সেই ক্লাসটা করার পর থেকেই আমি ভাবছিলাম, এই কোর্সটা কেন আমাদের আরো আগে থেকেই ছিল না? যোগাযোগের শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম বর্ষে না হোক, দ্বিতীয় বর্ষেই আমাদের এই কোর্সটি থাকলে খুব ভালো হতো। তাহলে অন্তত ক্যাম্পাসে বা অন্য কোথাও নারীদের সাথে হওয়া অন্যায়-অবিচারগুলোয় আরো সোচ্চার হতে পারতাম। পুরুষদের পুরুষ হওয়ার সুবাদে শিকার হওয়া বঞ্চনাগুলোও অনুভব করতে পারতাম। সমাজে কেন নারী-পুরুষ উভয়ের প্রয়োজনীয়তা কোনো অংশে কম না, সেটাও খুব ভালো করে বুঝতে পারতাম।

এই চিন্তাটাও কদিন আগে বদলে গেছে। বদলানোর কারণ শেহেরীন আমিন সুপ্তি রচিত “স্বাবলম্বী হওয়ার আগে বিয়ে করাই উচিৎ না মেয়েদের” শীর্ষক লেখাটা। ওই লেখাটা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোতে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গেছে। যতগুলো গ্রুপে লেখাটা শেয়ার করা হয়েছে, সবগুলোতেই সবাই হামলে পড়েছে নিজেদের মতামত জানাতে। এবং মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থী লেখাটার বিরোধিতা তো করেছেই, এমনকি লেখক নারী হওয়ায় তাকে নিয়ে জঘন্যতম, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেও তাদের বিবেকে বাধেনি!

দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠরত শিক্ষার্থীদের সিংহভাগের অমন বিকৃত মানসিকতার সাক্ষী হওয়াটা ছিল স্নায়ুবিধ্বংসী একটা অভিজ্ঞতা। তারপরও প্রায় সব কমেন্টই পড়ছিলাম। কেননা, যোগাযোগের শিক্ষার্থী হিসেবে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের মানসিকতা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াটা যে খুব দরকার! তবে সেই জ্ঞাত হওয়ার পাশাপাশি খুবই চিন্তা উদ্রেককারী একটা কমেন্টও আমার চোখে পড়ল। একজন লিখেছেন, “ভার্সিটি লেভেলের প্রতিটা বিভাগে জেন্ডার কোর্স থাকা দরকার।”

এতদিন শুধু নিজের বিভাগেই আরো আগে কেন জেন্ডার কোর্স ছিল না বলে আক্ষেপ হলেও, শেহেরীন আমিন সুপ্তির ওই তুমুল আলোচিত লেখাটায় তথাকথিত শিক্ষিতদের প্রতিক্রিয়া দেখার পর আমারও বদ্ধমূল ধারণা জন্মে, সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সব বিভাগের জেন্ডার কোর্স থাকা দরকার। তাহলে আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যত্রতত্র জেন্ডার ইনসেনসিটিভ কথাবার্তা বলত না, কিংবা আসলেই যে দেশের বেশিরভাগ নারী পুরুষ কর্তৃক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, সেই ধ্রুব সত্যটাকে অস্বীকার করত না।

কিন্তু… শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জেন্ডার কোর্স থাকাটাই কি যথেষ্ট? বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কজনই বা পড়ার সুযোগ পায়? তার চেয়ে দেশের ঢের বেশি মানুষ তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এবং তাদের মনে নারীবিদ্বেষ আরো অনেক বেশি। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ফেসবুক পেজে, কিংবা রোর বাংলার মতো বিকল্পধারার জ্ঞানমূলক ওয়েবসাইটের ফেসবুক পেজেও যখন নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে পিরিয়ড সচেতনতা বিষয়ক লেখা শেয়ার করা হয়, সেখানকার কমেন্টগুলোতে চোখ রাখলে বেশ বোঝা যায় দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মানসিকতা এখনো মধ্যযুগেই পড়ে আছে। তাছাড়া অতি সম্প্রতি টেন মিনিট স্কুলে পিরিয়ড ও কনসেন্টের মতো বিষয় নিয়ে কনটেন্ট তৈরি হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী কী ঝড় বয়ে গেল, তা-ও তো কারো অজানা নয়।

এদিকে আমি নিজেও গত কয়েক মাস ধরে কাজ করছি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। সেটার চার নম্বরেই রয়েছে মানসম্মত শিক্ষার কথা। কীভাবে দেশে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তা জানার জন্য প্রচুর ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। এবং তার ফলে একটা বিষয় মোটামুটি নিশ্চিত হলাম: একটা শিক্ষিত জাতি গঠন কেবল তখনই সম্ভব, যদি সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ প্রাথমিক স্তরেই তো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধসহ যাবতীয় জ্ঞানের ভিত গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ওইসব বেসিক জ্ঞানকেই আরো শাণিত করে। অর্থাৎ যার বেসিক জ্ঞান যতটা শক্তপোক্ত, তার চিন্তাচেতনায় উৎকর্ষের সম্ভাবনাও তত বেশি প্রবল।

তাহলে এই যে আমাদের দেশের মানুষ ছোটবেলা থেকেই নারীদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে, নারী মুক্তির আন্দোলনকে খাটো করে দেখছে, ধরেই নিচ্ছে যে নারীদের সাথে যা-খুশি করা যায়, প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে থেকে শুরু করে যৌনতা কোথাওই নারীর সম্মতির প্রয়োজন নেই, চাইলেই নারীদের পিরিয়ড নিয়ে মজা করছে কিংবা সার্বিকভাবে নারীদেহকে ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে, নারীর বাল্যবিয়েকে সমর্থন করছে, নারীর স্বাবলম্বিতাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছে — এগুলো থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? কীভাবে শুধু প্রকৃত নারীবাদের সংজ্ঞা শেখানো নয়, পাশাপাশি নারীদের সম্মান করা ও পুরুষের সমান মনে করার শিক্ষাটা দেয়া যায়?

উত্তর খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় নয়। জেন্ডার শিক্ষার প্রচলন শুরু করতে হবে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই। অবশ্যই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের নারীবাদের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে শেখাতে বলছি না। কিন্তু একদম ক্লাস ওয়ান থেকেই নারীদের সম্মান করা, এবং এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিটি ক্লাসে নারী-পুরুষের সাম্য ও সমানাধিকার নিয়ে উচ্চতর ধারণা দিতে থাকা আবশ্যক। তাহলে আর বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই ছেলেরা নারীদেহ নিয়ে বিকৃত লালসায় আচ্ছন্ন হবে না, নিজেদেরকে সমবয়সী মেয়েদের চেয়ে উঁচুশ্রেণীর মনে করবে না, এবং এ ধারণা তাদের মনে জন্মাবে না যে নারীদের সাথে যা-খুশি-তাই করা যাবে।

অপরদিকে মেয়ে শিক্ষার্থীরাও সচেতন হবে তাদের অধিকার নিয়ে, পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ নিয়েও। হ্যাঁ, মেয়েরা তাহলে আর ওই ধারণার বশবর্তী হবে না যে তাদের মূল কাজ শুধু বিয়ে করে সংসারী হওয়া, বাচ্চার জন্ম দেয়া। তাদেরও যে ছেলেদের সাথে প্রতিযোগিতা করে জীবনে বড় কিছু হতে হবে, স্বাবলম্বী হতে হবে, এবং নিজেদেরও সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে, সে ধরনের মানসিক প্রস্তুতিও তারা ছোটবেলা থেকেই নিতে পারবে।

আর শিক্ষাব্যবস্থার এই রূপরেখা যদি বাস্তবায়িত করা যায়, তাহলে আশা করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে এসেও কাউকে “নারীবাদ কী?” প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চুপ থাকতে হবে না। এবং সেই সঙ্গে, কোনো একজন শেহেরীন আমিন সুপ্তি নারীর স্বাবলম্বিতা নিয়ে মুখ খুললেই সবাই মিলে শুধু নারী হওয়ার এবং নারীর দায়িত্ব ও অধিকার নিয়ে কথা বলার অপরাধে তাকে ইচ্ছামতো হেনস্তা করবে না, কিংবা নারী-পুরুষ সমানাধিকার বিষয়ক যেকোনো আলোচনায় অসহানুভূতিশীল প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। এবং অতি অবশ্যই তারা বুঝতে পারবে, নারীবাদ আর মানবতাবাদ পারস্পরিক সাংঘর্ষিক কিছু না, বরং যেকোনো প্রকৃত ভালো মানুষই একজন নারীবাদীও বটে।

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.