সন্তানের মনে ইনসিকিউরিটি জন্ম দেয় বাবা-মা

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

বর্তমানে দুনিয়ায় যত ধরনের সমস্যা, তার একটি প্রধান কারণ হলো ইনসিকিউরিটি। এই ইনসিকিউরিটি বা নিরাপত্তাহীনতার মতো আত্মবিধ্বংসী ব্যাপার খুব কমই আছে। এক ইনসিকিউরিটির কাছেই হার মেনে যায় মানুষের আর সকল ভালো দিক। ইনসিকিউরিটির ফলেই শিক্ষাজীবনে এক সহপাঠীর সাথে আরেক সহপাঠীর প্রতিযোগিতা পরিণত হয় রেষারেষিতে, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সম্পর্ক হয়ে যায় বিষাক্ত, অন্য যে কারো সাফল্য হয়ে ওঠে অসহনীয়। আর ইনসিকিউরিটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে দুজন ব্যক্তির মধ্যকার আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কে; হোক তা দুজন বন্ধু, কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।

মানুষ স্বভাবতই ইনসিকিউর বলে, কোনো জায়গায় তারা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী নয়। সবসময় তাদের মনের মধ্যে একটি ভয় কাজ করে, “এই বুঝি আমার জায়গাটা অন্য কেউ দখল করে নিল।” আর এই ভয় থেকেই তারা প্ররোচিত হয় বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজে। ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে তারা।

কিন্তু এই যে মানুষ ইনসিকিউর, তা কি তারা জন্মগতভাবেই? মোটেই তা নয়। বরং শৈশব থেকে ধীরে ধীরে তাদের মনোজগতে ঢুকিয়ে দেয়া হয় এই ইনসিকিউরিটির ব্যাপারটি। এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী কারা জানেন? শিশুর বাবা-মা। হ্যাঁ, যে বাবা-মাকে মনে করা হয় শিশুদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার স্থল, সেই বাবা-মাই আবার শিশুদের মনে ঢুকিয়ে দেয় সম্ভাব্য নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক।

“তোমাকে তো কেউ ভালোবাসে না,” কিংবা “জানো, তোমাকে না আমরা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছি”… অনেক বাবা-মাই নিছক মজার ছলে তাদের সন্তানকে বলে এই কথাগুলো। তাদের উদ্দেশ্য হয়তো শুধু নির্মল রসিকতার মাধ্যমে শিশুদের একটু রাগিয়ে দেয়া। কারণ রাগলে যে শিশুদের দেখতে খুব কিউট লাগে! আবার রেগে গিয়ে তারা যখন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে, সেটিও তো বাবা-মাকে কম আনন্দ দেয় না!

কিন্তু বাবা-মায়েরা নিজের সন্তানের কিউটনেস দেখার জন্য বা আনন্দলাভের জন্য, ক্রমশ সন্তানকে করে তোলে ইনসিকিউর। শিশুরা তো আর অতশত বোঝে না। তাদের বিবেচনাবোধও নেই। জন্মের পর থেকে বাবা-মাকেই তারা কাছে পায়, বাবা-মাকেই সবচেয়ে বেশি আপন ভাবে। সেই বাবা-মাই যখন মজার ছলে বলে, তাদেরকে কেউ ভালোবাসে না কিংবা তাদেরকে আসলে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছে, যেকোনো দিন আবার রাস্তায় রেখে আসা হবে, এই কথাগুলো শিশুদের সরল মস্তিষ্কও খুব সহজে নিতে পারে না। ওই ছোট্ট বয়স থেকেই তাদের মনে ভয় দানা বাঁধে। বাবা-মাকে হারাবার ভয়। এবং এই ভয়েরই অপর নাম ইনসিকিউরিটি।

এই ইনসিকিউরিটি আরো এক দফা বাড়িয়ে দেয়া হয় শিশুদের ছোট ভাই-বোন আসার আগে থেকেই। মা গর্ভবতী হওয়ার পর খুব বেশিদিন আর সেটি চাপা থাকে না। মায়ের শারীরিক পরিবর্তন দেখে স্বাভাবিকভাবেই শিশুদের মনে কৌতূহল জাগে, অজস্র প্রশ্ন উদিত হয়। ফলে এক পর্যায়ে তাকে খোলাসা করতেই হয় গোটা বিষয়টি। কিন্তু তখনও সহজভাবে বিষয়টি বলার পরিবর্তে, অনেক বাবা-মা বলে, “এবার তোমার আদরে ভাগ বসাতে আসছে আরেকজন!” কেউ কেউ তো এমনও বলে, “তুমি তো এত দুষ্টুমি করো, তাই আমরা আরেকটা বাবু আনছি।”

এই কথাগুলোও কিন্তু ব্যাপক প্রভাব ফেলে শিশুদের মনে। সেটিকে আরো বাড়িয়ে দিতে অবদান রাখে কাছের আত্মীয়স্বজন, যেমন চাচা-ফুফু-মামা-খালারা। তারা শিশুদের ভয় দেখিয়ে বলে, “এবার কিন্তু তোমার বাবা-মা আর তোমাকে ভালোবাসবে না! ভালোবাসবে শুধু নতুন বাচ্চাকে!” ফলে ছোট ভাই বা বোন পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই অনেক শিশু তাদেরকে ঘৃণা করতে শুরু করে। এতদিন তারা জেনে এসেছে, বাবা-মা শুধুই তাদের একলার। এখন সেই বাবা-মাকে অন্য কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইলে, শিশুমন কি তা মেনে নিতে পারে?

ছোট ভাই বা বোন জন্মের পর শিশুরা আপাতদৃষ্টিতে তাদের আশঙ্কাকে সত্যি হতেই দেখে। তারা দেখতে পায়, যাবতীয় যত্ন-আদর-খেয়াল বাবা-মা ওই নবজাতক শিশুকেই দিচ্ছে। তাদের দিকে ঘুরেও তাকাচ্ছে না। এই বিষয়টি কিন্তু শিশুদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। তাদের তো আর বোঝার বয়স হয়নি যে বাবা-মা আসলে তাদেরকে মোটেই কম ভালোবাসছে না। তাদের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা আগের মতোই আছে। শুধু নবজাতক শিশুকে একটু বাড়তি যত্ন করতে হয় আরকি, যেমনটি তাদের জন্মের পরও হয়েছিল।

এ তো গেল বড় সন্তান কর্তৃক তাদের ছোট ভাইবোনদের প্রতি ইনসিকিউরিটির বিষয়টি। ছোট ভাইবোনরাও কিন্তু তাদের বড় ভাইবোনদের প্রতি কম ইনসিকিউর বোধ করে না। কারণ বোঝার মতো বয়স হওয়ার পর থেকেই তারা দেখতে পায়, তাদের জন্য নতুন কিছু নেই। বড় ভাই বা বোনের ব্যবহৃত পুরনো জামাকাপড় থেকে শুরু করে পুরনো খেলনা, বইপত্র জোটে তাদের কপালে। এবং এটি নিয়ে তাদেরকে যথেষ্ট খোঁটাও দেয়া হয়। বলা হয়, “তোমার তো নিজের কিছু নেই, সবই বড় ভাইয়া/আপুর!”

ছোট সন্তানদের জন্য নতুন করে তেমন কিছুই করা হয় না। আনন্দময় যা-ই তাদের জন্য করা হোক না কেন, টুপ করে কেউ একজন বলে বসে, “এগুলো তো ওর বড় ভাইয়া/আপুর সাথেও করা হয়েছিল!” কিংবা তাদেরকে দেখেও যে কারো প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় এমন, “ছোটজন তো দেখছি বড়জনের মতো হয়নি!” বড় ভাই বা বোনের সাথে এই তুলনা জীবনের প্রতি পদে পদেই সহ্য করে যেতে হয় তাদের। নিজেদের কোনো স্বকীয় অস্তিত্বই যেন থাকে না।

আবার এমন অনেক বিষয়ও আছে যেগুলো বড় সন্তানের প্রতি বাবা-মা করে থাকে, যা আর পরবর্তী সন্তানদের জন্য করা সম্ভব হয় না। যেমন: প্রথম সন্তানের বাবা-মা হওয়া যেকোনো মানুষের জন্যই এক অভূতপূর্ব, অপার্থিক অনুভূতি। পরবর্তীতে আর যত সন্তানই হোক না কেন, সেই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি তো সম্ভব না। অথচ আত্মীয়স্বজনদের খোঁটা তো রয়েছেই, পাশাপাশি অনেক বাবা-মা নিজেরাও ছোট সন্তানদের বলে, “তোমার ভাইয়া/আপু হওয়ার পর যতটা খুশি হয়েছিলাম, তোমার বেলায় তো অতটা হইনি,” অথবা “তোমার ভাইয়া/আপুর প্রথম জন্মদিনে বিশাল আয়োজন করেছিলাম, এক হাজার লোক খাইয়েছিলাম। তোমার বেলায় তো সেরকম কিছুই করা হয়নি!”

এভাবেই বাবা-মা নিজেরাই বড় সন্তান, ছোট সন্তানের মাঝে বৈষম্য করে, তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে ফেলে। তাই ভাইবোনদের মাঝে যত হৃদ্যতা ও অন্তরঙ্গতাই থাকুক না কেন, কোথাও একটা চোরা ঈর্ষার রেখা ঠিকই রয়ে যায়। বড় সন্তানরা ভাবে, “ছোটজনের কারণে বাবা-মায়ের কাছে আমার কদর কমে গেছে।” আর ছোট সন্তানরা ভাবে, “বাবা-মা বড়জনকে যতটা ভালোবেসেছে, আমি কখনোই তা পেলাম না।” এই ভাবনাই হলো ইনসিকিউরিটি, যা অধিকাংশ মানুষই সারাজীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারে না।

শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার পরও নানাভাবে বাবা-মা সন্তানদের আরো বেশি ইনসিকিউর করে তোলে। “তোমাকে কিন্তু অঙ্কে একশোয় একশো পেতেই হবে, নইলে তোমার সাথে কথা বলব না,” কিংবা “অমুকের চেয়ে তোমাকে অবশ্যই বেশি পেতে হবে।” এগুলো বলে একে তো শিশুদের মনে ইনসিকিউরিটি বাড়িয়ে তোলা হয়, সেই সঙ্গে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই সমবয়সী অন্যদের সাথে তুলনা করে তাদের সকল আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। একটি ক্লাসে হয়তো সর্বোচ্চ ৩০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু প্রথম তো হবে কেবল একজনই। “প্রথম না হলেই সব শেষ” জাতীয় কথাবার্তা বলে যে বাকি ২৯ জনকে মানসিকভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়, তা বুঝতে পারে না অনেক বাবা-মাই।

এই যে একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই ইনসিকিউরিটিতে ভুগতে ভুগতে বড় হয়, সেটির প্রভাব তো তার বাকি জীবনেও পড়ে। নিজের বেস্টফ্রেন্ড অন্য কারো সাথে ভালো করে কথা বললেই তার চোখের জলে নাকের জলে একাকার হয়ে যায়। কর্মস্থলে কেউ নিজের চেয়ে একটু এগিয়ে গেলেই সে ধরে নেয়, তার ক্যারিয়ার শেষ। নিজের প্রেমিক/প্রেমিকা অন্য কারো সাথে কথা বললেই তার মনে হয়, ভালোবাসার মানুষটি এবার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

এরকম অসংখ্য ইনসিকিউরিটিতে ধুঁকতে ধুঁকতে একজন মানুষ হয়ে ওঠে পুরোপুরি টক্সিক। তার মধ্যে অন্য অনেক মানবীয় গুণাবলি থাকে ঠিকই, কিন্তু যখনই তার মনে পড়ে যায় “আমার জায়গাটা তো নিশ্চিত না, যে কেউ যেকোনো সময় দখল করে নিতে পারে,” তখন সে আর সেসব মানবীয় গুণাবলির ধার ধারে না। সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা জলাঞ্জলী দিয়ে সে থেকে যায় কেবলই আত্মমগ্ন, আত্মকেন্দ্রিক। তার কাছে অন্যের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সাফল্য সবকিছুই হয়ে ওঠে ঈর্ষণীয়। গুরুত্ব পায় শুধু নিজের অধিকারটুকু আদায় করে নেয়ার বাসনা।

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.