মহামারী আর পারিবারিক সহিংসতার শিকার প্রধানত নারী

রাফিয়া মাহমুদ প্রাত:

চার মাস ধরে পুরো পৃথিবী থমকে আছে। করোনার ভয়ংকর ছোবল থেকে রক্ষা পেতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও চলছে লকডাউন। পৃথিবী আজ ঠিক যেন স্রোতহীন নদীর মতোন।
এক ক্ষুদ্র ভাইরাস পুরো পৃথিবীর ভাগ্য দিয়েছে বদলে। অর্থনীতির চাকাকে করেছে পঙ্গু। অকালে প্রাণ ঝরছে। বিশ্বে আজ মৃতের সংখ্যা এক কোটিতে নিয়ে গেছে। আরও কয় কোটি পেরোলে এই ভাইরাস তৃপ্ত হবে জানি না!

একদিকে চলছে মৃত্যুর মিছিল, নামছে অর্থনৈতিক ধস। অন্যদিকে আবার প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার সজীবতা। কিন্তু কমেনি শুধু পারিবারিক সহিংসতা। বরং দিন দিন তা যেন বাড়ছেই। যেখানে গোটা পৃথিবী একসাথে লকডাউন করে দেয়া হলো মৃত্যু ঠেকাতে, এমনকি স্বেচ্ছাসেবকদের রাত দিন কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, যাতে মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতেও বাইরে যেতে না হয়, ঘরেই যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সেখানে এই ঘরবন্দী সময়টাকে অনেকে কাজে লাগাচ্ছে পরিবারের সদস্যদের উপর নির্যাতন করে! আর এই নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মাঝে বেশিরভাগই হচ্ছে নারী আর তারপরই শিশু। আবার স্বামী-স্ত্রীর সহিংসতার ভয়াবহ প্রভাবও পড়ছে শিশুদের ওপর। কোথাও তারা নির্যাতিত হচ্ছে শারীরিকভাবে, কোথাও বা মানসিকভাবে।

একদিকে অকালে প্রাণ যেন আর না ঝরে যায় সেজন্য যেমন চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে তেমনি এই পারিবারিক সহিংসতা আরেকটি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দুনিয়াকে।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ বা অনুন্নত দেশেই শুধু নয়, পৃথিবীর একেবারে শীর্স্থানীয় দেশগুলোতেও এই লকডাউনের অছিলায় সহিংসতাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে এখনও পুরুষেরাই অধিকাংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় সহিংসতাতেও তারাই এগিয়ে। উন্নত দেশগুলোতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই উপার্জনকারী হওয়ার পরও সহিংসতার কমতি হয়নি। জরিপে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে সবাই যার যার কাজ এবং জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পারিবারিক সহিংসতার মাত্রাটা কিছুটা কম ছিল, কিন্তু লকডাউনের কারণে বাসার সবাই ঘরবন্দী হয়ে পড়ার কারণেই সহিংসতার সূত্রপাত।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা এউএনএফপিএ এবং এভেনার হেলথ, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে,
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশে গত তিন মাসের লকডাউনে পারিবারিক সহিংসতা ২০-৭০ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি আরো জানায়, ‘চলতি বছরে বিশ্বে অন্তত দেড় কোটি পারিবারিক সহিংসতা ঘটতে পারে’। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের সময় বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে বহুগুণ’।

বিভিন্ন দেশে এই সহিংসতার হার নিচে দেয়া হলো।
চীন: শুধু হুবেই প্রদেশেই তিনগুণ বেড়ে গেছে এই সহিংসতার হার। গত বছর পরিসংখ্যানে এর সংখ্যা ছিলো ৪৭ টি, যা এই বছর ফেব্রুয়ারিতে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬২টিতে।
দেশটির একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং একটি বেসরকারি সহিংসতা বিরোধী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ওয়ান ফেই বলেছেন, চীনের ৯০% সহিংসতার জন্য দায়ী এই এই কোভিড ১৯ এর মহামারী।
স্পেন: ১৪% বেড়েছে
ফ্রান্স: ৩২ % বেড়েছে, এর মধ্যে প্যারিসে বেড়েছে ৩৬%।
অস্ট্রেলিয়া: ২০%
ভারতে বেড়েছে দু গুণ, তাছাড়া ভারতে থর ম্রুভূমি অঞ্চলে এই সহিংসতা সব থেকে বেশি।
তিউনিশিয়ায় পাঁচ গুণ।
ইতালিতে হেল্পলাইনে পারিবারিক সহিংসতার জন্য ফোন কল ৫৫.১% কমে গেছে। অর্থাৎ ঘরবন্দী থাকায় এবং নিপীড়কদের সামনাসামনি থাকায় তারা না পারছে ফোন কল করতে, না পারছে বাইরে গিয়ে খবর দিতে। অর্থাৎ প্রকৃত খবর উঠে আসছে না।
ইউক্রেইন: প্রথম দু সপ্তাহে বৃদ্ধির হার ছিলো ৩৬% ,যা পরবর্তিতে এপ্রিলে গিয়ে দাঁড়ায় ১১৩ % এ।
ব্রিটেন: হেল্পলাইনগুলোতে কল এসেছে স্বাভাবিকের চাইতে ৫০% বেশি। এমনকি খুনের সংখ্যা বেড়েছে দু গুণ।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বজুড়েই এই সহিংসতা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে।

আমাদের দেশে এই সহিংসতা শুরু থেকেই ছিলো, এখন তা আরও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এপ্রিল মাসে ২৭ টি জেলায় পারিবারিক সহিংসতার ওপর টেলিফোন জরিপ চালায়।
তাদের মধ্যে ৪,২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬ টি শিশু এই সহিংসতার শিকার। যেখানে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৮৪৮ জন, মানসিক নির্যাতনের শিকার ২,০০৮ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন, অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার ১,৩০৮ জন।
এদের মধ্যে ১,৬৭২ জন নারী এবং ৪২৪ টি শিশু আগে নির্যাতনের শিকার হয়নি। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই লকডাউন সহিংসতার বিশাল সুযোগ করে দিচ্ছে।

এখন আসি কেনো সহিংসতা বাড়ছে? যেখানে মানুষ এই বন্ধে তার পরিবারের সাথে সুন্দর একটি সময় পাচ্ছে একসাথে মিলেমিশে কাটানোর। সকল ব্যস্ততাকে দূরে রেখে পারিবারিক সম্পর্কের দড়িগুলো যখন আরও শক্ত, মজবুত হওয়ার কথা, তখন কেনো পরিবারের নারীরা বা শিশুরা এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে?

এর কারণ হিসেবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর অর্পিতা দাস জানান, ‘এই নির্যাতনে স্বামীরাই প্রধানত জড়িত কারণ তাদের কোন কাজ নেই, অধিকাংশের আয় নেই, খাবার নেই, তারা বাইরে যেতে পারছে না, আড্ডা দিতে পারছে না। আর এর জন্য নারীকেই দায়ী করছেন তারা। নারীকে দায়ী করার এই মানসিকতার পেছনে নির্যাতনের প্রচলিত ধারণাই কাজ করছে।‘

পারিবারিক সহিংসতার একটা খণ্ডাংশ হলো উপরের তথ্যগুলো। খণ্ডাংশ বলছি কারণ পারিবারিক সহিংসতার বৈশ্বিক পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও রিপোর্টগুলোতে বা গবেষণাগুলোতে ফুটে উঠছে না। কারণ অনেকেই তাদের নির্যাতনের খবর পৌঁছে দিতে পারছেন না, হোক সেটা যোগাযোগ সমস্যার জন্য, অথবা ভয়ে। বাইরে সাহায্য চাইলে বা প্রকাশ করলে তাদের ওপর আরও অমানবিক নির্যাতন আসতে পারে এই ভয়ে অনেকেই চুপ থেকে নীরবে সহ্য করে যান। সাধারণত অসহায় দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা তাদের খাদ্য বাসস্থান হারাবার ভয়ে চুপ থাকেন। আবার অনেকে পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে চুপ থাকেন। তারা মনে করেন, এগুলো পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার।

কিন্তু এই চুপ থাকা প্রকৃতপক্ষে কোনো সমাধান হতে পারে না। পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে চুপ থাকার মধ্যেও নেই কোনো বীরত্ব। শুধু যে নারী এবং শিশুই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে,তা নয়। এর ব্যতিক্রমও হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে এরকম ব্যতিক্রম একটি চিত্রই নজরে পড়ে। যেখানে স্ত্রী তার স্বামীকে শারীরিক নির্যাতন করছে।এইরকম ঘটনা খুব কম হলেও পুরুষেরাও নির্যাতিত হচ্ছে কোথাও কোথাও। কিন্তু লজ্জা বা মেল ইগোর কারণে হয়তো অতটুকুও সবার সামনে আসে না। আসতে দেয়া হয় না। কিন্তু অন্যায় তো অন্যায়ই। সে নারী হোক বা পুরুষ হোক বা হোক অন্য কেউ।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে যে কারো প্রতি নির্যাতন কখনোই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হতে পারে না। এটা নিঃসন্দেহে অন্যায় একটি কাজ। তাই এর প্রতিবাদ করতে হবে আমাদের সবাইকে। আমাদের মনে রাখতে হবে নারী –পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ, ট্রান্সজেন্ডার, শিশু যে কারো প্রতি নির্যাতন যেমন অন্যায়, তেমনি এর প্রতিবাদও আমাদের সবাইকেই করতে হবে। নয়তো এর মাত্রা বাড়তেই থাকবে। আর তখন এই পৃথিবীতে অজস্র প্রাণ ঝরবে শুধু মহামারী ও পারিবারিক সহিংসতার এই প্রতিযোগিতাতেই।

শেয়ার করুন:
  • 151
  •  
  •  
  •  
  •  
    151
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.