আমাদের একজন পুরুষ অভিভাবকই কেন দরকার!

মহুয়া ভট্টাচার্য:

ষোল বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এসে রেবেকা তাঁর চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী স্বামীর সংসার সামলেছেন দক্ষ হাতে। ননদ, দেবরদের লেখাপড়া, বিয়েশাদী থেকে শুরু করে তাদের সংসার গড়ে দিয়েছেন নিজ হাতে। বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির রোগশোক, ওষুধ পথ্য থেকে, নিজের সন্তানদের শরীর, স্বাস্থ্য, লেখাপড়া কোনখানেই রেবেকাকে আটকানো যায়নি কখনও। ছেলেমেয়েরা একটু বড় হতেই স্বামীর ব্যবসায়ের হাল ধরেন, সেখানেও তার স্কোর টেন আউট অব টেন! অথচ স্বামী চোখ বুঁজতেই আজ রেবেকা সমাজের চোখে কেবলই একজন বিধবা মাত্র! ননদ, দেবর, এমনকি মহল্লার মুরব্বিদেরও সতর্ক দৃষ্টি তার ওপর। কোথায় যায়? কার সাথে যায়? কখন ফেরে? রেবেকার এসব ব্যক্তিগত তথ্য জানার অধিকার যেনো এখন সকলের। তাছাড়া দু’দিন আগেও রেবেকার যে ছেলে হাতে মেখে ভাত খেতে জানতো না, আজ সে তার পিতার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী।
শুধু তাই নয়, সে তার মায়েরও অভিভাবক। ব্যবসায়িক, জমি জিরাত সংক্রান্ত সব বিষয়ে ছেলের সিদ্ধান্তই এখন চূড়ান্ত। রেবেকা কোনো পরামর্শ দিতে গিয়েও পিছিয়ে আসে, কারণ ছেলে বলে- “তুমি এসব বুঝবে না মা।”

ছেলের পাশে দাঁড়ালেই এখন তার নিজেকে একটি পরগাছা মনে হয়। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে তার ছেলেটি এমন বড় হয়ে গেলো হঠাৎ করে! তার কোনো মতামতই আর যুৎসই লাগে না সংসারের কোথাও! হঠাৎ বড় হয়ে গেলো ছেলে! নাকি রেবেকার বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে ক্রমে। তাই হবে হয়তো! যাই হোক, একা নারীর সমাজে চলতে একটি খুঁটির বড্ড দরকার হয়, পুত্রটি এখন সেই খুঁটি, অভিভাবক।

আমাদের নারীদের জীবনে এমন দফায় দফায় বদল হয় খুঁটির। নারী কখনো পিতার, কখনো স্বামীর, কখনো পুত্রের অধীন। এই অধীনস্হতা আমরা অভিভাবকত্ব বলে মেনে নিয়ে চলেছি যুগের পর যুগ। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এরচেয়ে বেশি কিছু বুঝতে শেখায়নি আমাদের। এই অভিভাবকত্বের মাপকাঠি যদি হয় ভরণপোষণের, লালন-পালনের, তাহলেও নারী যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অভিভাবকত্বের পদমর্যাদায় উন্নীত হতে পারে না কিছুতেই। কিন্তু এ সমাজে নারীর অভিভাবক অগুনতি। কন্যার বিয়ের পর কন্যার স্বামীটিও তার বিধবা শ্বাশুড়ির অভিভাবকত্বের অধিকার পেয়ে যান, সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভরশীল মা থাকা সত্ত্বেও পিতৃহারা কন্যার অভিভাবকত্ব ফলাতে কাকা জ্যেঠারা যেমন উদগ্রীব থাকে, তেমনি পাড়া মহল্লার চেনাজানা লোকজনকে চোখ রাঙাতে, নাক গলাতে দেখা যায়। কখনও কখনও নারী নিজেও এই অভিভাবকত্ব নামের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।

অথচ অভিভাবকত্বের যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হয় স্নেহ মমতা আর ভালোবাসায়। তারপর তা বিস্তৃত লাভ করে লালন-পালন ও ভরণ পোষণে। সেক্ষেত্রে মানব শিশুর প্রথম ও প্রধানতম অভিভাবক তার মা, যিনি একজন নারী। জন্মের পর মাতৃদুগ্ধ পান করতে করতে যে স্বর্গীয় মমতার আধারটি আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে তিনি আমাদের মা। মানব শিশুর ক্ষুধা নিবারণকারী, লালন-পালনের এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের যোগ্যতায় প্রথম অগ্রগামী কিন্তু একজন মা- ই হন। মানবশিশুর সমস্ত পৃথিবীর সাথে সখ্যতা তৈরিরও আগে তার মায়ের সাথেই নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হয়। নিরাপত্তা আর মমতাময় আশ্রয়ে মায়ের তুল্য আর কে?

কত প্রতিশ্রুতিশীল, স্বাবলম্বী তরুণী উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছেন অবলীলায়। সন্তানকে একটি সুস্থ পরিবেশ দিতে নিজের সমস্ত দাপ্তরিক এবং সৃষ্টিশীল কর্মক্ষমতা বিস্মৃত হয়ে সংগ্রাম করছেন সন্তানের মাথার ওপর ছাদ হয়ে ওঠার তাগিদে। অথচ নারীর এতো এতো শারীরিক ও মানসিক ত্যাগের পরও আমাদের সমাজে কেন নারী অভিভাবকত্বের মাপকাঠিতে পিছিয়ে থাকবেন একজন পুরুষের চেয়ে? যেখানে নারীটির সমান যোগ্যতা রয়েছে তার সন্তানের অভিভাবক হওয়ার!

এতো গেলো সন্তানের অভিভাবক নির্বাচনে বৈষম্যের কথা। কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক নারীও একা চলতে গেলে একটি পুরুষ খুঁটির প্রয়োজন হয়। একা নারী কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, এমনকি একটি নিরাপদ আশ্রয় কিংবা বাসা ভাড়া করে থাকতে গেলেও পুরুষ অভিভাবকহীন নারীকে হীনদৃষ্টিতে ভস্ম করা হয়। পারিবারিকভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে তলব করা হয় কনের পুরুষ অভিভাবকদের। যুগ যুগ ধরে এই মানসিকতা আমাদের সমাজে অবিকৃত।

আমরা এই মানসিকতার বদলে কাজ করছি না, ফলে তা আমাদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। আমাদের ধর্ম, আইন তাদের নিয়মের বেড়াজালের এই খাঁচাতেই আমাদের বন্দী করে রেখেছেন চিরকাল। এখনই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে, নারী এখনই নিজেই নিজের অভিভাবকত্বের দায় ছিনিয়ে নিতে না পারলে মূল চাবি সেই পুরুষতন্ত্রের হাতেই রয়ে যাবে আজীবন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.