পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া …

আলাউদ্দিন খোকন:

“মেয়েদের মা হওয়ার সুযোগ দাও” এই শিরোনামে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর নারী পাতায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন দিদি রমা চৌধুরী। সেই প্রবন্ধ লেখায় দিদিকে অনেকের কাছে জবাবদিহি করতে হয়েছিলো। দিদি তথাকথিত অনেক আধুনিক নারীদের চেয়েও বেশি আধুনিক ছিলেন। দিদি এই প্রবন্ধে লিখেছিলেন, একজন মেয়ে, একজন নারী শুধু মা হলেই তাঁর জীবন পূর্ণতায় ভরে যেতে পারে। সে যদি শুধু সিঙ্গেল মাদারও হয়, হোক। “‘বসন্তে অশান্ত ফুল পরিণতি পায় ফলে” রবীন্দ্রনাথের এই উদ্ধৃতি দিয়ে দিদি লিখেছেন, নারীত্বের সার্থকতা মাতৃত্বে। নারী নদীর মতো ছুটে চলে শান্ত সরল ছন্দে। নদী যেমন সমুদ্রে লীন হয়ে যায়, নারীও তেমনি মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে নিজের পরিণতিতে পৌঁছায়। এভাবেই দিদি সহজ ভাষায় বোঝাতে চেয়েছেন, মেয়েরা শুধু মা হলেই অশান্ত জীবনে শান্তির বারতা নিয়ে আসতে পারে। দিদি মেরি, কুন্তী, মাদ্রীসহ অনেক নারীকে কুমারী মায়ের মর্যাদা ও মহত্ত্ব দিয়ে বলেছেন, এদের সন্তানরা যদি মহামানব হতে পারে, এখনকার নারীরা কী দোষ করলো? এই নারীদেরও মা হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিৎ।

দিদির এই প্রবন্ধ ছাপা হলে আজাদী অফিসে অনেক ফোন আসতে থাকে। অনেক চিঠি আসতে থাকে, কেনো এই লেখা ছাপা হলো, কীভাবে ছাপা হলো? এইসব চিঠি ফোন এর অধিকাংশই আসে নারীদের কাছ থেকে, নারী লেখকদের কাছ থেকে। এসব কথা আমি পরে জানতে পারি সিদ্দিক ভাই এর কাছ থেকে। একজন নিরহংকারী সিদ্দিক আহমেদ ছিলেন আমার বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো। তিনি আজাদীতে অনেকগুলো বিভাগ দেখতেন। থাকতেন চেরাগী পাহাড়ে আমাদের পাশের বিল্ডিংএ একটা আপাদমস্তক বইয়ের গুদামে। কতদিন, কত রাত সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে কেটেছে গল্প আড্ডায় আমাদের। মাঝে মাঝে আমি ভালো কিছু রান্না করলে নিয়ে যেতাম সিদ্দিক ভাইয়ের জন্য, আবার মাঝে মাঝে তিনিই আসতেন আমাদের রুমে। জ্ঞানে, নিষ্ঠায়, প্রজ্ঞায় সিদ্দিক ভাইয়ের মতো একজন মানুষ আমি দ্বিতীয়টি আর দেখিনি। তিনি আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে কেনো যে এতো পছন্দ করতেন জানা হলো না কখনোই! তিনিও চলে গেলেন দিদির আগেই।

দিদির লেখা নিয়ে এইসব বিরূপ ঘটনাগুলো সিদ্দিক ভাইয়ের কাছ থেকে জানলাম। এরপর অনেকদিন দিদির লেখা আর ছাপেনি আজাদী। ওই লেখা ছাপা হওয়ায় বিভাগীয় সম্পাদক সানজিদা আপা দুঃখ প্রকাশ করে পরের সংখ্যায় নোটিশ দেন। এর অনেকদিন পরে দিদির লেখা “দ্রৌপদী কি সতী? সতী নয়?” লেখাটা ছাপতে দিয়েছিলাম। লেখাটা ছাপা হয়নি। আমি পরে খবর নেয়ায় লেখাটা ফেরত পাই, যার অর্ধেকের বেশি লাল কালি দিয়ে আন্ডার লাইন করা।

দিদি কখনোই কোন সংগঠনে নিজেকে জড়াতেন না। সাহিত্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন সংগঠনেই না। এমনকি অনেকের অনুরোধেও চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘেও না। লেখিকা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক সালমা চৌধুরী এবং ফাহমিদা আমিন এর সাথে দিদির অনেক ভালো সম্পর্ক ছিলো। আনোয়ারা আলম, জিনাত আজম, নীলুফার শামসুদ্দীনসহ আরো অনেকের সাথে ছিলো দিদির আরো ঘনিষ্ট সম্পর্ক। লেডিস ক্লাবে লেখিকা সংঘের প্রায় মিটিং এ দিদিকে কেউ না কেউ যেতে বলতেন। দিদিও আমাকে নিয়ে সময় সুযোগ মতো বই দিতে সেখানে যেতেন। আমি অনাহুতের মতো সেখানে গিয়ে এককোণে বসে থাকতাম। যদিও সেখানকার অনেকেই আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোও বাসতেন। অনেকে ভালোবেসে দিদির বই কিনতেন, আবার অনেক লেখিকাই বই নিতেন না, নাক সিঁটকাতেন দিদিকে নিয়ে। লেখিকা সংঘের অধিকাংশজনই দিদিকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁদের অনেকেই এখনো দিদিকে নিয়ে কষ্ট পান, দিদিকে নিয়ে ভাবেন, লেখেন। তাঁদের সবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা।

এই লেখিকা সংঘে দিদির যাওয়া বন্ধ হয় উপরিউক্ত লেখাটির কারণে। লেখাটি আজাদীতে প্রকাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে আমরা গিয়েছিলাম লেখিকা সংঘের মিটিং এ। সেদিন দিদিকে নিয়ে সেখানে হই চই শুরু হয়। অনেকেই দিদিকে দেখিয়ে একজন আরেকজনকে বলেন, এই সেই রমা চৌধুরী, উনিই মেয়েদের অবাধ যৌনাচার নিয়ে লিখেছেন। দিদি এসব ভালো করে শুনতে পাননি। দিদি কানে খাটো। (তখনও হিয়ারিং এইড কিনতে পারেননি।) আমি তো কানে খাটো নই, আমি শুনি আর আশ্চর্য হই! কয়েকজন আরও উৎসাহী হয়ে দিদিকে লেখিকা সংঘের ‘ঝিমিক’ নামের একটা ম্যাগাজিন ধরিয়ে দেন। সেই পত্রিকায় ছাপানো একটা বা দুইটা নারীর পর্দা, নারীর লেহাজ, নারীর ধর্ম, নারীর জীবনদর্শন এসব নিয়ে লেখাগুলো বের করে দিদিকে পড়তে বলেন। দিদি কানে কম শোনে, তাই কাছে গিয়ে দুই একজন জোরে চিৎকার করে দিদিকে সবক দেন। দিদিকে বোঝান দিদি যেনো ওইসব আর না লেখেন। দিদি যেনো নারীর আসল ধর্ম স্বামী-সংসার এসব নিয়ে লেখেন। দিদি বুঝতে পারেন, তাঁকে অপমান করেই এসব বলা হচ্ছে। সেদিন ফাহমিদা আপা এবং আরো কয়েকজন দিদির শুভাকাঙ্ক্ষীরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও বাকিদের হাত থেকে দিদিকে করা এই অপমান থেকে নিবৃত করতে পারেননি। তবে ফাহমিদা আপা অনেকবার বারণ করেছেন বাকিদের। তবে সেদিন আনোয়ারা আপা বা জিনাত আপা থাকলে এমনটা হতে দিতেন না বলে আমার বিশ্বাস। দিদি শুধু বলেন, আপনাদের ভালো না লাগলে লিখুন। আমি একটা লেখা লিখেছি, আপনারা তার সমালোচনা করে লিখুন। আমাকে এভাবে কথা শোনাচ্ছেন কেনো?

দিদি প্রচণ্ড মনঃকষ্ট পেয়ে সেখান থেকে আমাকে নিয়ে চলে আসেন। আর কখনো যাননি বই নিয়ে, বই বিক্রি করতে। তবে দুই হাজার তেরো সালে যখন দিদি আবার আলোচনায় আসেন, দিদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী দেখা করতে গণভবনে নিয়ে যান, তখন আবার টনক নড়ে চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের। তারা দিদিকে বুঝতে পারে কিংবা তেলে মাথায় তেল দিতে আসেন। সেই বছর লেখিকা সংঘ প্রবর্তিত অধ্যাপক সালমা চৌধুরী সাহিত্য সম্মাননায় ভূষিত করেন দিদিকে, যদিও দিদি যেতে চাননি পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ায়। আমি এবং ছড়াকার আবুল কালাম বেলাল ভাই বিশেষভাবে বুঝিয়ে দিদিকে রাজি করাই। আমি দিদিকে বলি, যে মাটিতে আছাড় খেয়েছো সেই মাটিই আঁকড়ে ধরো, একদিন যেখান থেকে কষ্ট নিয়ে, অপমান নিয়ে ফিরে এসেছো, আজ তাঁরাই তোমাকে মাথায় তুলছে, তাই সেখানে গিয়ে সম্মানটুকু নিয়ে কষ্ট ভোলার চেষ্টা করো। দিদি গিয়েছিলেন সেই সম্মাননা নিতে। যদিও সেই অনুষ্ঠানে অনেকে দিদিকে নিয়ে বাগাড়ম্বর করেছিলেন। অনেকের বক্তব্যেই ছিলো দিদিকে কে, কীভাবে দয়া দেখিছেন, কে কয়টা শাড়ি দিদিকে দিয়েছেন, কে একবেলা দিদিকে দুইটা ভাত ভিক্ষা দিয়েছেন সেসব কথা। দিদি তো একজন মহান ভিখারি! তাঁকে কে কী দান করেছেন সেটা ফলাও না করলে যে নিজেদের বড় করা যায় না!

অনেকেই বলতেন দিদি অন্তর্মুখী, দিদি মানুষের সাথে মিশেন না। কিন্তু কেউ ভেবে দেখেননি দিদি সারাজীবনে এতো এতো শোক, এতো কষ্ট সহ্য করেও শুধু মানুষদের ভালোবেসে, দেশকে ভালোবেসে হাসি মুখে পথ চলেছেন। শুধুমাত্র গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতে গিয়ে দিদিকে এতো অপমান, লাঞ্ছনা, দুঃখ সহ্য করতে হয়েছে। দিদি তখনই নিজের ভেতরে নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছেন। দিদির সেই একাকী জীবনে সঙ্গী শুধু কতগুলো বিড়াল।

আমিও যে দিদির সাথে থাকি, দিদির দেখভাল করি, এটা নিয়েও অনেকেরই ছিলো অন্তর্দাহ। অনেকেই দিদির কাছে গিয়ে আমার নামে এটা-সেটা বলতেন। আবার আমার সংসার জীবন শুরু হওয়ার পরে অনেকেই আমার স্ত্রী রিমঝিমের কাছে উল্টাপাল্টা বলতে শুরু করেন। অনেক লেখক-লেখিকাই আমাকে তাঁদের নিজেদের বই এর হকার বানাতে চেয়েছেন, না পেরে আমার ওপর খেপেছেন। এতোসব এর পরেও আমি দিদির পাশে আমৃত্যু থেকেছি। দিদির সেই মহিমান্বিত লড়াইয়ের আমি হয়েছি একজন যোদ্ধা।

দিদির লেখা মেয়েদের মা হওয়ার সুযোগ দাও এবং দ্রৌপদী কি সতী, সতী নয়? এই দুইটি প্রবন্ধসহ আরও অনেক অপ্রিয় সত্য-কথন নিয়ে অপ্রিয় বচন গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিলাম দুই হাজার পাঁচ সালে। এটি দিদির লেখা সেরা বইয়ের একটি।

লেখক:

আলাউদ্দিন খোকন, ০১৭১৬৮৮২৩১৯, [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 67
  •  
  •  
  •  
  •  
    67
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.