বুলবুলেরা যে কারণে পেত্নি হয়ে উঠে

দিনা ফেরদৌস:

১৮৮১ সনের বাংলার প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে “বুলবুল” মুভিটি। প্রযোজক আনুশকা শর্মা। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৃপ্তি দীমরি (বুলবুল), পাওলি দাম (বিনোদিনী), রাহুল বোস (মাহেন্দ্র), অভিনাশ তিওয়ারী (সাত্যিয়া), পরমব্রত চ্যাটার্জি (ডা. সুদীপ চরিত্রে)। নেটফ্লিক্সে রিলিজ হওয়া মুভি “বুলবুল” কে নিয়ে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়ে গেছে। সেইসব আলোচনা-সমালোচনার প্রতি সম্মান রেখেই আমি নিজের অভিব্যক্তিটুকু তুলে ধরছি।

কাহিনীতে তুলে ধরা হয়েছে জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের নারীদের না বলা কথা, বাল্যকালে বিবাহ, নিজের থেকে দশগুণ বড় বরের সঙ্গে মনের অমিল, আর যুগ যুগ ধরে চলে আসা রূপকথার পেত্নিদের গল্প বা নারীদের পেত্নি হয়ে উঠার গল্প।

চার/পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে বুলবুল পিসীমার কোল থেকে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করে একা অচেনা মানুষদের সঙ্গে পালকিতে। তার একাকিত্বকে ভুলিয়ে দিতে নিজের সমবয়সী দেবর সাত্যিয়া তাকে পেত্নির গল্প শোনায়। গল্প আর খেলাধুলা করতে করতেই বুলবুল হয়ে উঠে জমিদার বাড়ির বড় বউ।

অন্যদিকে জমিদার বাড়ির মেজো ছেলে, যে কিনা পাগল, সেই বরকে বিনোদিনী সবসময় আগলে রাখে। বর তাকে স্বামীর সুখ দিতে না পারলেও ভাসুর তাকে সেই সুখ দেন। ফলে বুলবুল তার কাছে সতীনের মতোই। বুলবুলের আছে বাড়ির বড় বউয়ের সম্মান ও দেবর সাত্যিয়ার সাথে গড়ে উঠা মধুর সম্পর্ক, যা বিনোদিনীর দুই চোখের বিষ। কারণ বিনোদিনী নিজে একজন নির্যাতিতা নারী। জমিদার বাড়িতে তার ক্ষমতা সীমিত। ফলে মাহেন্দ্রকে উসকে দেয় বুলবুলের বিরুদ্ধে। সাত্যিয়াকে পড়াশোনার উছিলায় লন্ডন পাঠিয়ে দেন মাহেন্দ্র। সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে বুলবুলের উপর। তাকে এতো বেশি নির্যাতন করেন মাহেন্দ্র যে দুই পায়ের গোড়ালি ভেঙ্গে যায়। ডা. সুদীপ বুলবুলের চিকিৎসা করেন, দুই পা বিছানার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন। সেই সুযোগে পাগল দেবর তাকে রেইপ করে। বুলবুলের চিৎকারে বিনোদিনী এসে তাকে বুঝায়, চুপ থাকতে হবে জমিদার বাড়ির সম্মানার্থে। চুপ থেকে দামী দামী শাড়ি, গহনা এইসব নিয়ে সুখে থাকতে। তার বর পাগল হলেও, অভিজাত। রাজকীয় আভিজাত্যের জন্য রাজকীয় মূল্য দিতে হয়।

বিনোদিনীর পাগল বর একদিন মারা যান পেত্নির আক্রমণে। এছাড়া গ্রামের আরও কিছু লোকের মৃত্যু পেত্নির আক্রমণে হয় বলে জানা যায়। একদিন পেত্নি শিকার করতে গিয়ে সাত্যিয়া আবিষ্কার করে এ কোনো অশরীরী পেত্নি নয়, বাড়ির বড় বউ বুলবুল, যার মৃত্যু হয় তার গুলিতে।

কাহিনীটা বলার কারণ হলো যারা মুভিটি দেখেননি তারা হয়তো আমার বক্তব্য বুঝতে পারবেন না। বুলবুলের সাথে যে অন্যায় হয়েছে আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে, তা কি এই আধুনিক যুগে হয় না? তর্কে যাওয়ার সাহস আমার নেই। ১৮৮১ সালে ফ্যাশন কেমন ছিল, পুরুষরা কলার দেয়া পাঞ্জাবি পরতো কি না, নারীরা ব্লাউজ বা ছায়া পরতো কি না, ওইসব নিয়ে আলোচনা করা জ্ঞানীদের কাজ।

আমি সাধারণ নারী হিসেবে দেখি এখনও লোকজন কথায় কথায় বলে, ভদ্র ঘরের মেয়েদের এইসব ওইসবে মানায় না। কিন্তু ভদ্রলোকের পোলাদের জন্য সব জায়েজ। নিজের বাপই বলেন, জোয়ান পোলা একটু আধটু তো করবেই। এই সমাজ আজও পাগল ছেলে দেখে রাখার জন্য বউ খোঁজে। অভিজাত ঘরের ছেলে হলে সুন্দরী কম বয়সি মেয়েও পাওয়া যায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত শুনেছেন কোনো পাগল মেয়ের জন্য কেউ পাত্র খুঁজতে বা জেনেশুনে পাগল মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে? কেন, পাগল মেয়েকে দেখে রাখার মানুষ লাগে না? বিয়ে করা বউ পাগল হয়ে গেলে বর আবার বিয়ে করে। অভিজাত পরিবার আভিজাত্যের ভেতরে সব করতে পারেন, বান্ধবী, প্রেমিকা, রক্ষিতা আর ঘরে সতী বউ। এইসব পরিবারেরর নারীরা জানে তাদের সীমাবদ্ধতা। শাড়ি, গহনা সবই এদের আছে, শুধু সম্মানটুকু নেই। তাদের কাজ একটাই, মানিয়ে চলা।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি, যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি আশেপাশে আমার বয়সি কোন মেয়ের বিয়ে হলেই কাছের মানুষজন নিজ দায়িত্বে সেই সংবাদ আমাদের বাসায় পৌঁছে দিতেন। গল্পের ধরন হচ্ছে, পাত্র কিছুই চায়নি, মাথা থেকে পা পর্যন্ত গহনা দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছে সেই মেয়েকে। মেয়েরা কম বয়সে দেখতে সুন্দর থাকে, তাই ভালো পাত্র সহজে পাওয়া যায়। আর প্রশংসার নামে আম্মার কানে তুলে দিতেন, ও আমাদের লক্ষী মেয়ে, যেই সংসারে যাবে ঠিক মানিয়ে নেবে।

আমি তখন কঠিন অপমানিত বোধ করতাম। পাত্রপক্ষ আমাকে আপাদমস্তক দেখে চৌদ্দ গোষ্ঠীর বায়োডাটা নিয়ে বিয়ে করবে, আর আমার কাজ হচ্ছে গরু/ ছাগল যাই আসুক লক্ষী মেয়ের মার্যাদা লাভের জন্য সারা জীবন মানিয়ে চলা, আমার কোন ডিমান্ড থাকবে না। তো, এই রকম এক লক্ষী মেয়ে, যাকে আপাদমস্তক গহনা দিয়ে সাজিয়ে বিদেশে নিয়ে অবশেষে বাসার কাজের লোকের মর্যাদা না পেয়ে পরে শুনেছি ডিভোর্স হয়েছে। ১৮৮১ সালের বুলবুল হলে হয়তো তিনিও ডাইনি বা পেত্নি হয়ে যেতেন এতোদিনে। বিকল্পও আছে , যারা সত্যিই বিনোদিনী চরিত্রের মতো মনে করেন বর যা ইচ্ছে তাই করুক, আমার চাই শোকেসে সাজানো স্ত্রীর মর্যাদা, দামী শাড়ি-গহনাতেই সুখ, পরে সুখ, দেখিয়ে সুখ, তাদের নিয়ে কিছু বলবো না। আমার এক বন্ধু বিয়ের রাতে তার বরের দেয়া ডায়মন্ড রিং আমাকে দেখিয়ে যে সুখ পেয়েছিল তাতেই আমি ধন্য হয়েছিলাম। কার সুখ কীসে তা মাপার সাধ্যি আমার নাই।

তবে খানদানি মার্কা সুখ দেখে আমি বিরক্ত হই। কাউকে মহান দেখাতে গিয়ে তার দোষগুলো বাদ দিয়ে সকলের সামনে তাকে ভালো বানিয়ে দেয়া। মা, বাবা দিবস এলে দেখা যায় সব খানদানি মহান বাবাদের, যাদের সন্তানেরা জানে এই বাবা মায়ের গায়ে হাত তোলেন, নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করেন। তবুও তিনি মহান পিতা। আবার নিজের মা যখন ভাইয়ের বউকে সহ্য করতে পারেন না, ছেলের সাথে ছেলে বউকে হাসি মুখে দেখলেই গায়ে জ্বালা ধরে, দিনরাত পরের মেয়েকে নির্যাতনের মধ্যে রাখেন, সেই মা’কেও আমরা মহিয়সী নারী বানিয়ে তুলি মা দিবসে। শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধায় ভরে যায় কমেন্ট আর আমরা লুকিয়ে রাখি খানদানি চরিত্র। আমাদের নানাভাবে শেখানো হয় কোন নির্যাতনের কথা বলতে নেই। এমনকি যেই পুত্রবধু নির্যাতিত হয় তাকেও শিখিয়ে দেয়া হয়, স্বামীর সংসারে এমন একটু আধটু হয়, মেনে নাও, বাইরে জানাজানি হলে নিজেরই ইজ্জত যাবে।

কথায় আছে না, “সব নির্যাতকই কোন না কোনভাবে নির্যাতিত”। জ্বী, ওই স্বামীর বাড়িতে নির্যাতিত হওয়ারাই যাদের বিয়ে হয়নি তাদের সামনে এসে বিয়ের ফজিলত আর দামী দামী শাড়ী- গহনার গল্প দেবে। শুনলে মনে হবে বিয়েটা কতো শান্তির, এক্ষুণি বিয়ে না করলে জীবনটাই বৃথা।

আজো নারীরা বিশ্বাস করে চুপ করে থাকাটাই মঙ্গলের। ভদ্র মেয়েরা নিজের ইজ্জত খোয়ানোর কথা কাউকে বলে না। আর না বললে ইজ্জতও যায় না। মানে এইটা হচ্ছে ইজ্জত, এইটাকে রক্ষা করে চলা তোমার দায়িত্ব, কেউ যদি লুকিয়ে নিয়েও যায় আর তুমি চুপ থাকো তো তোমার ইজ্জত তোমার কাছেই থাকলো। প্রতিবাদ করেছো তো তুমি ডাইনি, খুনি বা পেত্নি।

শেয়ার করুন:
  • 522
  •  
  •  
  •  
  •  
    522
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.