‘আমরা যা পারিনি’

দিলু দিলারা:

আমার ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ এলে আমি নিজেই বেনামে কনের বাড়িতে ফোন করে বিয়ে ভেঙ্গে দিতাম। জানি অবাক হচ্ছেন। হওয়ারই কথা। একজন মা কীভাবে এই কাজ করতে পারে! আমি নিজেও জীবনে কখনই ভাবিনি এমন কাজ আমাকে করতে হবে।

এই কাজটা আমি শুরু করেছি যখন আমার একমাত্র ছেলে ফয়সালের প্রথম বিয়ের প্রস্তাব এলো তখন থেকেই। প্রথমবার খুবই ভয় পেয়েছিলাম। এই বিয়ে ভাঙ্গার কাজটা সঠিকভাবে করতে পারবো কিনা! আমি এই কাজটা করেছিলাম আমার বাসা থেকে দুটি গলি পরে একটা মোবাইলের দোকান থেকে, কারণ আমার কোন মোবাইল নেই। আর থাকলেও সেই নাম্বার থেকে করতামও না।

আমার স্বামী, ছেলে যখন অফিসে, সেই সুযোগে আমি সেই দোকানে গিয়ে সিভিতে লেখা মোবাইল নাম্বারে কল করে বলেছিলাম, এখানে যেন বিয়ে না দেয়। ওরা আমাকে জেরা করেছিল। আমি ফয়সালের ফ্যামিলির ব্যাপারে যেসব কথা বলেছি তাতে কোন মেয়ের ফ্যামিলি এই বিয়েতে রাজি হবে না। কেউ চাইবে না তাদের মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিতা হোক। আমি পণ করেছি যতদিন এই দেহে প্রাণ থাকবে আমি একজন নারী হিসাবে আরেকজন নারীকে বাঁচানোর জন্যে এই কাজ করে যাবো।

বত্রিশ বছর আগে এই পরিবারে চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম। এসে শাশুড়ি-শ্বশুরকে পেয়েছিলাম। আমার স্বামী ছিল তাঁদের একমাত্র ছেলে। দুই মেয়ে বড়। তাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। শ্বশুর জুট মিলে একাউন্ট সেকশনে কাজ করতেন। আমার স্বামী তখন জনতা ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার। কী সুন্দর ছিমছাম পরিবার!

কিন্তু!

এক মাসের মাথায় দেখলাম আমার শ্বশুর আমার শাশুড়ির গায়ে হাত তুলছেন, আর তা আমাদের সবার সামনেই। শার্টের কলার কেন পরিস্কার হয়নি এই কথা বলতে বলতেই আলমারির উপরে রাখা জালি বেত নিয়ে আমার শাশুড়িকে শপাং শপাং করে বাড়ি দিয়ে উনি বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি দেখলাম এই দৃশ্য দেখেও আমার হাসবেন্ড এক মনে নাস্তা খেয়ে গেল যেন কিছুই হয়নি। প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না।

আমার শাশুড়ি কে দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে রান্না ঘরে ঢুকে গেলেন। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম আমার হাসবেন্ডের সেই নির্লিপ্ততায়। সে কীভাবে এটা মেনে নিল। ছিঃ এরা এতো খারাপ মানুষ!

সেদিন আমি আমার শাশুড়ির দিকে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। আমার শাশুড়ি আমাকে এক সময় কাছে ডেকে নিলেন।

মারে খুব অবাক হইছো জানি। আমার শ্বাশুড়ি বলতে শুরু করলেন, এ নতুন কিছু না মা। এটা এদের রক্তের ধারা। আমার শাশুড়িকে আমার শ্বশুর পিটাইতেন। এখন স্বামীর হাতে আমি মুখ বুঁজে মার খাই। যাওয়ার জায়গা নাই মা। মুখ বুইজা সব সহ্য করি। আমার পোলাও বাপের খাইসলত পাইছে। বদ রাগী! জানি না কী আছে তোমার কপালে! বলেই উনি আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন।

এর প্রমাণ আমিও পেতে থাকি কিছুদিনের ভিতর। নাই কথাতে আমার গায়ে ফয়সালের বাপ হাত তুলতে থাকে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত। আমার শাশুড়ি শ্বশুর ইতিমধ্যে মারাও গিয়েছে।

ফয়সালকেও আমি সঠিকভাবে মানুষ করতে পারিনি। পারিনি বললে ভুল হবে, চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু যে বাপ কথায় কথায় তার ছেলের সামনে মাকে অপমান করে সে আর কতটুকু মানুষ হবে! ফয়সালও বাপের ডুপ্লিকেট। এতো বদমেজাজি! একটুতেই ভাংচুর করে। আমাকে কথায় কথায় অপমান করতে এতোটুকু বাধে না। একটা সরকারি ব্যাংকে কাজ করে, তবে ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই। বাইরের লোক কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। এ যেন মাকাল ফল।

তাই আমি ঠিক করেছি আমার ছেলের কোন বিয়ের সম্বন্ধ এলে আমি তা যেকোনো উপায়ে হোক ভেঙ্গে দেবো। আমি কিছুতেই চাই না আমি বা আমার শাশুড়ি যেভাবে পদে পদে অপমনিত, নির্যাতিত হয়েছি, নতুন একটা মেয়ে এসে এইভাবে নির্যাতিত হোক।

পর পর কয়েকটা বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার পর দেখলাম বাপ-বেটা দুইজনই বেশ চিন্তিত, কিন্তু আমি মনে মনে প্রচণ্ড খুশি। কিন্তু ওদের বুঝতে দেই না। কিন্তু আমার খুশি বেশি দিন থাকলো না। আমি ফোন করে সাবধান করার পরও এবারের কনে পক্ষ আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। বাড়িতে বউ হয়ে এলো স্বপ্না। সে একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে।

বিয়ের পনের দিনের মাথায় এক সকালে সবাই অফিসে যাবে, একসাথে নাস্তা খেতে বসেছে। কীরে, তোর বাপের কি তেলের ফ্যাক্টরি আছে? আর এই আলু ভাজিতে এতো নুন দিছিস যে! মন কোনদিকে উড়ু উড়ু করতেছিল, বলেই ইদ্রিস আলি মানে আমার স্বামী থু থু করে মুখ থেকে রুটি ফেলে দিয়ে খাবারের টেবিল থেকে উঠে পড়লো। একই টেবিলে আমার ছেলে ফয়সাল বসা, সেও তার বাবার সাথে গলা মেলায়।

আমি নিচু হয়ে ফয়সালের বাবার মুখের ফেলে দেওয়া খাবার বেলচা দিয়ে তুলতে থাকি। সেই সময় আমার স্বামী রান্না ঘর থেকে কাঠের লাকড়ি এনে আমার পিঠে একটা বাড়ি দেওয়ার সাথে সাথে দেখলাম আমার বৌমা স্বপ্না দৌড়ে এসে ওর শ্বশুরের হাতটা খপ করে ধরে মুচড়ে দিল।

সবকিছুই ঘটে গেল খুব দ্রুত।

আপনার এতো বড় সাহস! খবরদার, আর একটা দিন যদি দেখি আপনি আমার শাশুড়ির সাথে তুই-তোকারি বা গায়ে হাত তুলেছেন আজ হাত মুচড়ে দিয়েছি সেদিন হাত ভেঙ্গে দেবো। সেদিন দেখবো না আপনি আমার কে হোন! আর এই যে বাপের গুণধর পুত্র, মায়ের এই অবস্থায় খাবার গিলছো, লজ্জা করে না?

স্বপ্নার চোখে কী ছিল জানি না।

আমি দেখলাম ঘরে বোমা পড়লেও বুঝি এমন হতো না। বাপ-বেটা দুইজনই কথা না বলে সুড় সুড় করে ঘরে ঢুকে গেল। যেন জোঁকের মুখে নুন পড়েছে। বাপবেটা দুইজনই অফিসে চলে গেলেও স্বপ্না সেদিন অফিসে গেল না। অফিসে ফোন করে বললো তার শরীর খারাপ।

স্বপ্না আমার মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলো। আজ আমার জয়ের দিন। আমি আনন্দে হু হু করে কাঁদতে লাগলাম। স্বপ্না আমাকে কাঁদতে দিল। একটা সময় শুধু বললো, আম্মা কেন কোনদিন ওদের কিছু বলেননি? প্রতিবাদ করেননি?
ভয়ে বৌমা! আমি যে আগের যুগের মানুষ! সংসারকে আঁকড়ে ধরেছিলাম।

সেদিন বাসায় রান্না হলো না।

আমার বৌমা আমার মন ভালো করার জন্যে আমাকে রিকশা করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরালো। দুপুরে আমাকে চাইনিজ খাওয়ালো। আমি কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে পারি না। স্বপ্না হাসতে হাসতে বললো, ধুর আম্মা হাত দিয়ে খান, কোনো সমস্যা নেই।

আচ্ছা আম্মা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
করো মা।
বিয়েটা যাতে না হয় সেইজন্যে আপনিই কি আমাদের বাসায় ফোন করেছিলেন?
আমি ইতস্তত করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলি।

জানেন আম্মা, এই ফোন পাওয়ার পর বাসার সবাই বিয়েটা ক্যান্সেল করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি নিজেই জিদ করেছিলাম এই বিয়ের জন্যে। ভাবছিলাম কে হতে পারে যে এই ফ্যামিলির এতো ভিতরের খবর জানে! নিশ্চয়ই সেই মহিলা এই ফ্যামিলির কাছের কেউ হবে। তবে ভাবিনি আপনি সেই জন। সেদিনই ঠিক করে রেখেছিলাম আমার শাশুড়ির সাথে এমন হলে শ্বশুর আর তার ছেলেকে শায়েস্তা তো করবোই, আমার শাশুড়িকে এই অন্ধকূপ থেকে উদ্ধারের দায়িত্বও আমার।

আজ রাতে দেখেন আম্মা আমি কী করি! আমাকে তো চিনে নাই! বলেই স্বপ্না মিটিমিটি হাসতে থাকে। আমি তো এই মেয়ের কথা শুনে ভয়ে বাঁচি না।

সন্ধ্যা লাগার আগে আগে আমরা বাসায় ফিরি। স্বপ্না চা বানিয়ে ওর শ্বশুর আর ফয়সালকে দেয়। চা খেতে খেতেই আব্বা, ফয়সাল আপনাদের একটা কথা বলি, এখন থেকে আমরা যা রান্না করবো তাই খেতে হবে। যদি রান্না নিয়ে কমপ্লেইন করেন, তাহলে নিজের রান্না নিজেই করে খাবেন। বসে বসে খান তো তাই বুঝতে পারেন না আগুনের সামনে কতো কষ্ট। প্রতিদিন খাওয়ার পর নিজেদের প্লেট নিজেরাই ধোবেন। এখন থেকে আপনারা অনুগ্রহ করে নিজেদের কাপড় নিজেরাই ধুবেন।

আর আব্বা আজ সকালের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! ফয়সাল তুমিও সাবধান। সরকারি চাকুরি করো। উল্টাপাল্টা আচরণ দেখলে সোজা মামলা করে দেবো। আপনাদের প্রতিবেশি সবার ঘরে ঘরে গিয়ে আপনাদের ভালো মানুষের কদাকার চেহারাটা দেখিয়ে দেবো। এতোদিন আপনারা আম্মার সাথে অনেক বেয়াদবি করেছেন। আর নয়। আমি আছি, দেখি এই পরিবারে আর কীভাবে এমন ঘটনা ঘটে! ফাইজলামি পাইছেন!

দেখলাম বাপছেলের মুখ কালো হয়ে ঝুলে পরেছে। হয়তো চাকরি হারানো বা মামলার ভয় পেয়েছে। ওরা ভাবতেও পারেনি এই পরিস্থিতি হবে। এ যেন খাল কেটে কুমির আনা।

আর আমি ভাবি, আমি আর আমার শাশুড়ি যা পারিনি, মাত্র পনের দিনে এই মেয়ে তা করে দেখিয়েছে। এমন কুমির যেন ঘরে ঘরে থাকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.