কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশের হতশ্রী

কৃষ্ণা দাস:

ভালো লাগা, প্রেম, ভালবাসা খুব কাছাকাছি কিছু অবস্থা। ভালো লাগাকে আমরা অনেক সময় প্রেমের নাম দেই কিংবা কখনও দুটোকে মিলিয়ে ফেলে প্রেমকে ভালবাসা বলি! খুব পরিষ্কার ধারণা না থাকলে এই সবগুলো গুলিয়ে বেশ একটা হ জ ব র ল অবস্থা তৈরি হয়। আর তা কেবল আপনার জন্যই না, অন্য অনেকের জন্যই বেশ বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কাজের ক্ষেত্রে প্রেম, ভালবাসা ইত্যাদি নিয়ে আলাপ আলোচনা কখনও কখনও তা যৌন হেনস্থার শামিল।

তেমনি দুটো ঘটনার কথা বলছি –

কর্মস্থলে সহকর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই কাজ করতে হয় ৷ এসময় কাছাকাছি আসার দরুণ অনেকের মধ্যে ভাললাগা আদান-প্রদান হয়ে যায়। ভাললাগা দোষের কিছু না। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরপক্ষ একে প্রেম কিংবা ভালবাসার নামে সম্বোধন করে বসে। ম্যাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাজ মানেই টিম ওযার্ক। টিম সদস্যদের মধ্যে থেকেই একজনকে দেখতাম একটু বেশি যত্নবান সায়মার প্রতি। সায়মা ব্যাপারটা আঁচ করতে না পারলেও অন্য অনেকের বিষয়টি চোখ এড়ায়নি। সায়মা বিবাহিত এবং একটি বাচ্চাও আছে। ওকে দেখতাম সারাক্ষণ হয় কাজ নিয়ে, না হয় বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। আশেপাশের আর কারো প্রতি বিশেষ নজর দিতে ওকে তেমন দেখতাম না। আমরা (কয়েকজন ফিমেল স্টাফ) চায়ের ফাঁকে কোন একসময় ব্যাপারটা ওর সাথে শেয়ার করি। ও বলে, না আমি খেয়াল করিনি, তবে আমি এখন থেকে সাবধানে থাকবো।

এর কিছুদিন পর সায়মা আমাদের বললো, সেই কলিগ ওকে রাতে টেক্সট পাঠায়। যদিও সায়মা কোনটার রিপ্লাই দেয় নাই। ব্যাপারটা এখন এমন অফিসের প্রায় সবাই ব্যাপারটা নিয়ে কানাঘুষা শুরু করেছে। সায়মা বেশ কিছুদিন অফিসে বসেই সেই কলিগকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, বারবার অনুরোধ করেছে যেন এমন আচরণ না করে।

অফিস, ক্যান্টিন যেখানেই যায়, সেখানেই ফিসফাস শোনা যেতো, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতো না ৷ যেন খুব মজার একটা বিষয়। আমরা পরে কর্তৃপক্ষের সাথে বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে বলি, যদিও জানতাম খুব একটা সমাধান পাওয়া যাবে না। কারণ এসবকে ব্যক্তিগত কারণ হিসেবে ধরা হয়, অফিসিয়ালি খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না।
যাই হোক, ডিরেক্টর বলেছেন, বিষয়টি দেখবেন। আদতে তা ওই পর্যন্তই ছিল। কলিগটি এখন শুধু টেক্সট পাঠায় না, রাত বিরাতে কলও করে। সায়মার স্বামী এই নিয়ে বিশাল ঝামেলা শুরু করেছে। আমরাও ওই কলিগকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। তার এক কথা, সে সায়মাকে ভালবেসে ফেলেছে।

একটা সময় পর সায়মা চাকরিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়। ঘর কিংবা অফিস, স্বামীর ওই শর্তে সে ঘরকে বেছে নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুবার আগেই বিয়ে হয় লিমার, স্বামী, সংসারের পাশাপাশি পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাচ্ছে। ওর স্বামী পড়াশোনার ব্যাপারে ভীষণ হেল্প ফুল, এই সহযোগিতায় যৌথ পরিবারের গৃহিণী হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে ৷ এবার স্বপ্ন ছোঁয়ার পালা।

ভালো একটা এনজিওতে বেশ ভালো পজিশনে চাকরিও হয়ে যায়। অফিস বসের লিমাকে কাজ শেখাতে দারুণ আগ্রহ। আদতে তাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে! যে কোন কাজে সবসময়, সবকিছুতে লিমার ডাক পড়ে। কেবিনে ঘন্টার পর ঘন্টা সামনে বসিয়ে রাখে। ছলে-বলে একটু-আধটু এদিক-সেদিক স্পর্শও করে। ফিল্ডের কাজেও অহেতুক নিয়ে যেতে চায়। নারীরা প্রকৃতিগতভাবেই অনেক কিছু আগে থেকে টের পায়, বসের সব কিছুতেই যে এক্সট্রা কেয়ার তার ইঙ্গিতটুকু ওর বুঝতে বাকি থাকে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই বস সব নতুন আসা ফিমেল স্টাফদের এইভাবেই হেনস্থা করে। কেউ এড়িয়ে টিকে যায়, বেশিরভাগই চাকরি ছেড়ে পালায়। একটা সময় লিমা তার স্বামীকে সবকিছু শেয়ার করে এবং তিনি ইস্তফা দেয়ার পরামর্শ দেন।

আমরা মেয়েরা প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত এরকম হাজারটা হ্যারাজমেন্টের শিকার হয়ে একসময় নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হই। বর্তমান সময়ে চাকরি পাওয়া যেখানে সোনার হরিণের সমতুল্য, সেখানে নিজ থেকে ইস্তফা মানুষ কোন অবস্থায় দেয়? একটু ভাবলেই হয়তো সহজেই আঁচ করা যায়। কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যায়, লজ্জায় আর মানসম্মানের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। আমরা স্যুটেড-বুটেড শিক্ষিত বাবু হয়েছি ঠিকই, কিন্তু নারী বলতে আমরা ভোগ্য পণ্যই ভাবি। একজন নারী শিক্ষায়, কাজের ক্ষেত্রে, অভিজ্ঞতায় যে সমযোগ্য অথচ কেবলমাত্র নারী বলে সমাজের মানুষরূপী অমানুষদের লালসার দরুণ স্বপ্নের বলিদান করে চলে প্রতিনিয়ত, থামতে বাধ্য হয়। সাথে স্বামী হোক কিংবা বাবা নামক পুরুষদের কর্তৃত্ব! ভাবে অধীনে রাখাটাই আসল কথা। ভুলে যায়, অধীনস্থ মানুষ হয় না, দায়িত্ব, কর্তব্য আর পিছুটানের কারণে এমন হাজারটা নারী অধীনস্থ হতে বাধ্য হয়।

এখানে ক্ষমতায়নের কথাটা চলে আসে, ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের বস্তুগত, দৈহিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যার সঙ্গে দক্ষতার প্রশ্নটি জড়িত। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন বলতে এমন একধরনের অবস্থাকে বোঝায়, যে অবস্থায় নারী তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন ও মর্যাদাকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারে। এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মানে হল- একদিনে হঠাৎ করে কারও ক্ষমতায়িত হয়ে ওঠার সুযোগ নেই। এজন্য দীর্ঘ ও অব্যাহত উদ্যোগ দরকার হয়। নারীর ক্ষমতায়নের আওতাকে প্রধানত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- এই তিন ভাগে দেখানো হয়।

মূল কথা হচ্ছে, মানসিকতার পরিবর্তন, নারীর কাজের পথের প্রতিবন্ধকতা দূর করা আর নারীবান্ধব কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া নারী স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন কোনভাবেই সম্ভব না। যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের কথা পুরো বিশ্ব আজ চিৎকার করে বলছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া নারী ক্ষমতায়ন অসম্ভব, সেখানে কেবল একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, যদি না নারীদের কাজের পরিবেশ যথেষ্ট সংবেদনশীল হয়! নারীর প্রতি এই বৈষম্য কেবল কোন এক প্রকার ব্যক্তির নয় বরং সমাজ এবং রাষ্ট্রও এর জন্য দায়ী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.