যৌন হয়রানি রোধে অপারগতা: এর দায়ভার আসলে কার?

ইশরাত জাহান প্রমি:

ঘটনা ১

আমার বেশ ঘনিষ্ঠ দুই বান্ধবীর সাথে ঘটনাটি ঘটেছিলো। দুজনেই একই ব্যক্তি দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে যৌন হয়রানির শিকার। তবে দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে যে সেই যৌন নিপীড়ক ব্যক্তিটি আমাদের বন্ধুমহলের সবারই বেশ ঘনিষ্ঠ এবং কাছের বন্ধু। বন্ধুমহলে তার বেশ সুখ্যাতি এবং বন্ধুত্বের তাগিদে কখনোই তাকে পিছপা হতে দেখা যায়নি। সেই ব্যাক্তিটিও অবশেষে সুযোগের অপব্যবহার না ঘটিয়ে বন্ধুত্বের তকমা থেকে বেরিয়ে একজন পুরুষ হয়ে তার পৌরুষ, পুরুষত্ব এবং যৌনতার ভয়াল পাশবিকতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে, যার শিকার আমারই বন্ধুমহলের অপর দুই বান্ধবী।

ঘটনা ২

এই ঘটনাটিও আমার পরিচিত অপর একজন নারীর সাথে ঘটেছিলো। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। তাকে আরবি শেখানোর জন্য ঠিক করে দেওয়া হলো বাড়ির পাশেরই একটি মসজিদের একজন হুজুরকে। প্রতিদিন হুজুর তাকে পড়াতে আসতেন এবং সেই মেয়েটিকে আড়ালে বিকৃত ভঙ্গিতে স্পর্শ করতেন। দিনের পর দিন এভাবেই ভয়ংকর ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছিলো মেয়েটিকে।

ঘটনা দুটি শোনার পর আমাদের সবার মাঝেই একটা প্রশ্ন জাগে। যারা এই অপকর্মের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো কি না। অতি দুঃখের সাথে আমাকে বলতে হচ্ছে, না, কোন শাস্তিই তারা পাননি এবং কোন পদক্ষেপই তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি। কেন নেয়া হলো না তাই এখন একটু আলোচনা করা যাক।

প্রথম ঘটনার সাথে জড়িত যেই ব্যক্তিটির কথা বলা হয়েছে তিনি একজন প্রথম সারির সরকারি কর্মকর্তা। ভুক্তভোগীরা তাদের সাথে এই হয়রানির ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার বেশ কয়েক বছর পর পরিচয় গোপন রেখে উক্ত ব্যক্তির এই অপকর্মের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ তারা নিতে চাননি এবং নেননি। বরং এতোটুকু করতেই তাদের বেশ সাহসিকতা এবং নির্ভীকতার পরিচয় দিতে হয়েছিলো।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় ঘটনাটিতে। প্রথমেই বলে রাখা যাক এখানে ভুক্তভোগী একজন শিশু। এবং সে ভয়ে বিষয়টি তার পরিবারকে জানাতে পারছিলো না। উল্টো হুজুরের কাছে পড়তে না চাওয়ার কারণে তাকে প্রহার করা হয়েছিলো এবং তাকে পড়তে যেতে বাধ্য করে হয়েছিলো। এভাবে সে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। একপর্যায়ে সে বিষয়টি তার বড় বোনের কাছে প্রকাশ করে এবং বড় বোনকেও নানা কৌশলে এই হুজুরকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করতে হয়েছিলো। তবে এখনো তার বাড়ির কেউ জানে না যে এই ছদ্মবেশি ঈমানধারী ব্যক্তিটি আসলে কতটা ভয়াবহ এবং পাশবিক ।

তবে একজন যৌন নিপীড়কের শাস্তি কি এতোটুকুই? তার বিরুদ্ধে কি আইনি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল না? এর মধ্যে কি এমন বিষয় রয়েছে যার কারণে অভিযুক্তরা উপযুক্ত বিচার পাওয়ার জন্য লড়াই করার সাহস পাচ্ছে না? এর পেছনে দায়ী আসলে কারা?

এর পেছনে দায়ী আমাদের মানসিকতা, আমাদের পরিবার এবং আমাদের সমাজ। পরিবারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও তাদের প্রতি হীন মনোভাব পোষণ করা; এইসবই তাদের পশ্চাৎপদতার জন্য দায়ী।

প্রথম ঘটনাটিতে ভুক্তভুগী দুই নারী অভিযুক্ত সেই যৌন নিপীড়কের বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ এরজন্যই নিতে যাননি। কারণ এতে তাদের পরিচয় প্রকাশ পাবে। ঘটনাটি পরিবারে জানাজানি হবে এবং মানুষ তখন আঙ্গুল তুলবে তার চরিত্রের দিকে। সমস্ত দোষ চাপানো হবে ঐ নারীর কাঁধেই। কেন এতো বন্ধুর সাথে মেলামেশা করতে গেলো কিংবা নিশ্চয়ই তাদের পোশাকে সমস্যা ছিলো অথবা নিশ্চয়ই রাত-বিরাতে ঘরের বাইরে বেরিয়েছিলো ইত্যাদি নানা দোষ-গুণ নিয়ে তখন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে ঐ নারীকেই। যৌনতা তো পুরুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, ওতে কি আর কারো হাত আছে। যা দোষ এই দুশ্চরিত্রা নারীরই বুঝি। কী নিষ্ঠুর আমাদের চিন্তাভাবনা!

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেন পুরুষের সব দোষ সুনিপুণভাবে নারীর কাঁধে চাপাতেই বেশ পারদর্শী। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা মায়েদের মাথায় যেন কন্যা দায়গ্রস্ততার ভার এতটাই প্রবল যে ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও তাদেরকে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে হয়। এভাবেই ভবিষ্যত হয়রানি বা সম্ভ্রম হানির কথা ভেবে চেপে যান হাজারো নারী। আর ফলশ্রুতিতে জন্ম নিচ্ছে হাজারও Potential rapist।

দ্বিতীয় ঘটনাটি যে শিশুটির সাথে ঘটেছিলো তার কথাই বলা যাক। তার পরিবারকে এতো বড় একটি ভয়াবহ বিষয় সে জানাতেই পারেনি কারণ শুধুমাত্র তার পরিবারের সাপোর্টের অভাবে। একজন হুজুর এতো বড় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সুতরাং তিনি এরকম কাজ করতেই পারে না এমন একটি মনোভাব পোষণ করে বসেছিলো তার পরিবার। তাই নিজের বাড়িতেই দিনের পর দিন যেই মেয়েটি নির্যাতিত হয়েছে তার কোন বিচারই হলো না। বরং এখনো সেই হুজুর নির্দ্বিধায়, নির্বিকারভাবে তার বাড়িতে আসেন এবং এলাকায় ঘুরে বেড়ান। না জানি এরকম আরো কত কত শিশু তার এই ভয়াবহ পাশবিক যৌনতার শিকার।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ৫০% শিশুই কোন না কোনভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার। এদের মধ্যে ৯১% শিশুই পরিবারের আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতজনদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও যৌনতার বিষয়টি আমাদের সমাজে একটি সামাজিক ট্যাবু ও এ যেন নিষিদ্ধ কোন বিষয়। তবে প্রতিটি পরিবার যদি তাদের শিশুকে এ বিষয়ে যথাযথ ধারণা দিয়ে থাকে এবং ওই শিশুটিকে যদি তার পরিবার ‘Good touch’ ও ‘Bad touch’ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা দিত তাহলে হয়তো তাকে এই করুণ অবস্থার শিকার হতে হত না। যৌন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট পদক্ষেপের অভাবের কারণেই হয়তো জন্ম নিচ্ছে আরো ভয়ংকর ও বিকৃত মস্তিষ্কের Potential rapist.

অথচ পরিস্থিতি হওয়ার উচিত ছিলো ঠিক উল্টোটা। নারীকে নয় বরং বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর উচিত ছিলো ঐ যৌন নিপীড়ককে। মুখ লুকিয়ে থাকার কথা নির্যাতনকারীকে। সামাজিকভাবে হেয় ও আইনি দৃষ্টিতে সাজা পাওয়ার কথা ঐ নিপীড়ককে। কিন্তু আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও উগ্র মানসিকতার কারণে আমরাই সমাজে জন্ম দিচ্ছি আরো শত শত ধর্ষক ও বিকৃত মস্তিষ্কের কিছু পশুরূপী মানুষ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটে যাওয়া মি টু মুভমেন্ট বিনোদন জগতে বেশ সাড়া ফেললেও এর স্পন্দন তেমন একটা জোরালোভাবে এসে পৌঁছায়নি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম রাষ্টগুলোতে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোতে। আমাদের দেশে একেবারেই যে আসেনি তা না। কয়েকজন মুখ খুলেছিল। কিন্তু যাদের নামে বলা হয়েছিলো তারা প্রভাব খাটিয়ে মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। আর সাধারণ মানুষও ভিকটিম ব্লেমিং করেছে বেশি। বলেছে ওইসব মেয়ে এটেনশন সিক করছে, উইমেন কার্ড প্লে করছে। এ কারণে আমাদের দেশে এটা বেশিদূর গড়াতে পারেনি।

এখনও এখানে ধর্মের নামে নারীদের স্বাধীন চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। তবে হোক সেটি নিজের ঘরে কিংবা বাইরে, কোথাও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি এবং তার পেছনে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারবো না আমরা কেউই। ফলে সমস্যাগুলোর মূল উৎপাটন করা সবচেয়ে প্রয়োজন। চুরির ভয়ে কি মানুষ ঘরে টাকা আনা বন্ধ করে দিবে? তেমনি যৌন নিপীড়কদের জন্য কেন নারীকেই ঘরের কোণে গুটিয়ে থাকতে হবে?

এখনই সময় আমাদের সকলের এই গ্লানি থেকে বেড়িয়ে আসার। সকলের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার। মনে রাখতে হবে, যৌন হয়রানিমূলক ঘটনা কোন নারীর জীবনে ঘটে যাওয়া বৃহৎ দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। ভুক্তভোগীকে নয় বরং নির্যাতককে উপযুক্ত সাজা দিয়ে ও সমাজে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তবেই ধীরে ধীরে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

লেখক পরিচিতি: শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 481
  •  
  •  
  •  
  •  
    481
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.