কেন নারীর স্বাবলম্বিতাকে এতো ভয় পুরুষতন্ত্রের?

শেহেরীন আমিন সুপ্তি:

একটি দেশের জনসংখ্যা তার জনশক্তি হয়ে উঠতে পারে সেই জনসংখ্যার যথাযথ কর্মদক্ষতায়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল উন্নয়নশীল দেশের উন্নতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে জনগণের কর্মমুখিতার হার। ২০১৮ সালের সরকারি জরিপ মতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৬.৬৯ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। তবে এই মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৪৫.৪৯ শতাংশই এখনো রয়ে গেছে জাতীয় উৎপাদন ক্ষেত্রের বাইরে। যাদের সিংহভাগই নারী।

দেশের প্রায় ৮১ শতাংশ নারী সরাসরি গৃহস্থালি কাজে অংশগ্রহণ করলেও তাদের নেই কোনো অর্থনৈতিক স্বীকৃতি। গৃহকাজে নারীর অবদানকে কোনো যুক্তিতেই খাটো করার সুযোগ নেই। তবুও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীনতাহীন এই নারীদের প্রতিনিয়ত নানা শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হলে অনেকক্ষেত্রেই এসব নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে পারে তারা। কিন্তু এই অর্থনৈতিক স্বাবলিম্বতার পথে প্রধান বাধা হয়ে আসে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর স্বাবলম্বিতাকে কখনোও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। আর এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অধিকারী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো জেন্ডারের ব্যক্তি হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নারীর স্বাবলম্বিতার বিরুদ্ধে তারা মূলত যেসব যুক্তি দাঁড় করান সেগুলো হলো, “নারী স্বাবলম্বী হলে সে সন্তান জন্মদানে অনাগ্রহী হয়ে যেতে পারে। আবার নারীর কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় লাগার ফলে সন্তান জন্মদানে সমস্যা হবে,“ অথবা “স্বাবলম্বী নারী সংসারের কাজে সময় দিতে পারবে না। বাবা-মা উভয়েই কর্মক্ষেত্রে থাকলে সন্তানের লালল-পালন ঠিকভাবে হবে না।“

প্রথমত, সন্তান জন্মদানই নারীর জীবনের একমাত্র সার্থকতা না। গর্ভধারণ করতে চাওয়ার ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা নারীর থাকা উচিত। আর কর্মক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হওয়ার মানেই কেবলই উচ্চবেতনের চাকরিতে অধিষ্ঠিত হওয়া না। নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যেকোনো ব্যক্তি তরুণ বয়স থেকেই পরের অধীনে চাকরি ছাড়াও নানা ধরনের কাজ করে উপার্জনক্ষম হতে পারে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অনেক নারীই আজকাল টিউশন, ক্ষুদ্র উদ্যোগসহ বিভিন্ন পার্টটাইম কাজ করে নিজের খরচ নিজেই চালাচ্ছে। তাই কারো স্বাবলম্বী হওয়ার সদিচ্ছা আর পারিবারিক সহায়তা থাকলে খুব বেশি বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।

দ্বিতীয়ত, সংসার চালানো ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব পরিবারের নারী-পুরুষ উভয়ের কাঁধেই বর্তায়। সংসারে বাবা-মা দুজনেই কর্মজীবী হলে সন্তানের ভরণপোষণের ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়। অভিভাবক এবং সন্তানের মধ্যে ভালো বোঝাবুঝি থাকলে সন্তানের লালন-পালনের ক্ষেত্রে তাদের কর্মক্ষেত্র বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আবার আজকাল ঘরে বসেই বিভিন্ন ধরনের অর্থ উপার্জনকারী কাজ করা যায়। বাবা-মা যেকোনো একজন সেরকম কোনো কাজ বেছে নিলে সন্তানের সাথে সময় কাটানোর অসুবিধাও আর থাকে না।

নারীর স্বাবলম্বিতার পথে এরকম বিভিন্ন ধরনের সমস্যার বিভিন্ন সমাধান নিয়ে প্রতিনিয়তই আলোচনা হচ্ছে নানা প্লাটফর্মে। তবুও কেন কট্টর পুরুষবাদীরা এখনো তাদের গোড়ামীতে আটকে আছেন? যেখানে নারীর স্বাবলম্বিতায় বদলে যেতে পারে পারিবারিক, সামাজিক, সর্বোপরি সমগ্র দেশের চালচিত্র সেখানে কেন এখনও এর পক্ষে আলোচনা দেখে কিছু মানুষের ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়? কেন নারী স্বাবলম্বিতা নিয়ে উৎসাহিত করতে গেলেই এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় কোনো ব্যক্তিকে?

এর কারণ জানতে হলে আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নিতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় পরিসংখ্যান বিভাগ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অংশগ্রহণে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারী তাদের স্বামী কর্তৃক কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এসব নির্যাতিত নারীর মাত্র ২.৪ শতাংশ তাদের বর্তমান স্বামীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন। আর ৮.৯ শতাংশ নির্যাতিত নারী তাদের প্রাক্তন স্বামীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন। তবে বাংলাদেশের নারী নির্যাতনের ঘটনায় যে কয়জন সাহস করে মামলা করেন তার প্রায় ৯৭ শতাংশই পান না কোনো বিচার।

নারী নির্যাতনের উচ্চ হারের বিভিন্ন কারণের একটি হলো বাল্য বিবাহ। এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন না থাকায় বাল্যবিবাহের হার কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। বরং কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বা অভিভাবকেরা অপরিণত বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চাচ্ছে। সেই মেয়েরা স্বামীর ঘরে গিয়ে একাধারে যেমন যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে, তেমনই গর্ভধারণ করতে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকির সম্মুখীনও হচ্ছে। অথচ সমাজে নারী স্বাবলম্বিতাকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা না করায় বাল্যবিবাহের প্রবণতায় রাশ টানা যাচ্ছে না।

তাছাড়া সামগ্রিকভাবেও, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারার নেপথ্যে প্রধানতম কারণ হলো নারীর স্বাবলম্বিতার অভাব। আর্থিকভাবে পরনির্ভরশীল নারীকে সব ক্ষেত্রে দাবিয়ে রাখা যেমন সহজ, তাকে নির্যাতন করে পার পেয়ে যাওয়াও অনেকটাই সুবিধাজনক। কারণ বিয়ের পর নারীর নিজের আয় না থাকলে তার প্রতিবাদ করার সাহসও থাকেনা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতিত নারী তার নিজের পরিবার থেকেও যথাযথ সমর্থন পান না। আপাতদৃষ্টিতে ভরণপোষণের নিরাপত্তা বজায় রাখতে ও সামাজিক লাঞ্ছনা থেকে রেহায় পেতে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় বলে মেনে নেন সেইসব নারীরা। পুরুষতান্ত্রিকদের দাম্ভিকতা বজায় রাখতে ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত সহযোগী ব্যবস্থা।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা চাইলেই সকল ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন। আবার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নারীরা অন্যান্য নির্যাতিত ব্যক্তিদের সহায়তাও করতে পারেন।
কর্মক্ষেত্রে নারী ব্যস্ত থাকলে পুরুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ইচ্ছা মতো হুকুম করার সুযোগটাও অনেক কমে যায়। তখন ঘরের কাজে নারীকে সর্বোচ্চ খাটানোর সুবিধাও ভোগ করা যায় না অনেকক্ষেত্রেই।

নারী স্বাবলম্বী হলে তার মত প্রকাশের সুযোগও বেড়ে যায়। যেটা সহজে মেনে নিতে পারেন না পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কোনো ব্যক্তি।

স্বাবলম্বী নারী তার অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সচেতন থাকেন। এজন্য জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাকে ঠকিয়ে চলার এবং নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে তার উপর চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায় পুরুষের জন্য। পুরুষতান্ত্রিকতার সবচেয়ে বড় ভীতি হলো নারী স্বাবলম্বী হলে পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষমতা আর আধিপত্যে ভাগ বসাবে নারী। এবং আরো ভয়, নারী-পুরুষ সমান হতে গিয়ে কোনদিন যেন আবার নারীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়তে হয়!

শেষ করার আগে একটি ব্যাপার পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেকেই বলে থাকেন, নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চায় কি না সেটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপার। কিন্তু ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার জন্য কোনো পুরুষকে তো অর্থনৈতিক দায়ভার থেকে মুক্তি দেয়া হয় না। তাহলে এই একটি ক্ষেত্রে কেন ইচ্ছা অনিচ্ছার ‘সুযোগ’ জোর করে নারীদের উপর চাপিয়ে দিতে চাওয়া?

আমার বিশ্বাস, এরকম দ্বিমুখী আচরণ থেকে বের হয়ে এসে যদি নারী-পুরুষ উভয়কেই ছোটবেলা থেকে তাদের দায়িত্ববোধের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া হয়, এ ধারণা তাদের মগজে গেঁথে দেয়া হয় যে নারী বা পুরুষ বলে কারো দায়িত্ব কম বা বেশি নয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তারা নিজেরাই কর্মক্ষেত্রে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।

আমরা তো এমনই একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন দেখি, যে প্রজন্মের মাঝে নারী-পুরুষ সমানাধিকারের বোধটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠবে, সেজন্য বর্তমান সময়ের মতো অবিরাম লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে না।

 

লেখক পরিচিতি:
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 329
  •  
  •  
  •  
  •  
    329
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.