‘সাহসী নারী’ বনাম ‘কেয়ারিং স্বামী’-এই বিতর্কের শেষ কোথায়?

সুমনা শারমিন শম্পা:

লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থাকার সময়টাতে ফেসবুকই আমার শ্বাস নেবার জানালা। এমনিতেও মানুষটা আমি ঘরকুনো। পেশাগত কাজের বাইরে ঘরে থেকে বাচ্চাদের সংগে সময় কাটাতেই পছন্দ করি। ফেসবুকে বেশকিছু গ্রুপে অ্যাড হয়েছি, কখনো নিজের আগ্রহে, কখনো বন্ধু বা পরিচিতদের ডাকে। আজ তেমনই এক গ্রপে একজন নারীর দেয়া পোস্ট পড়লাম,পড়ে ভাল লাগে নি,কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্বভাবমত এড়িয়েই গেছিলাম। খানিক পরেই দেখি ঐ পোস্টে লাইক, শেয়ার, লাভ রি্য্যাক্ট কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেল। এতেও আমার শীতনিদ্রা ভাঙ্গতো না যদি না সেখানে আমার খুবই কাছের, প্রিয় এবং অনলাইনে বেশ পরিচিত মুখের মেয়েরা থাকতেন।

যিনি লিখেছেন তিনি নিজে একজন নারী উদ্যোক্তা, ধরেই নেয়া যায় আর দশজন “সাধারণ” মেয়ের চাইতে তিনি বেশি সচেতন, নিজেকে এবং সমাজ ও সময়কে নিয়েও বেশি ভাবেন। যারা লাইক, শেয়ার বা লাভ দিয়েছেন তারাও যথেষ্টই সচেতন, চিন্তার দিক থেকেও আধুনিক এবং উদার মনষ্ক। লেখক(লেখিকা শব্দটি আমার ঠিক লাগে না)লিখেছেন তার বিবাহিত জীবনের গল্প, বলেছেন তার স্বামী(সংগী) বাবা মার এক ছেলে হওয়াতে কাজ করে বা দায়িত্ব নিয়ে অভ্যস্ত নন তাই তিনিই সব করেন,মাসের বাজার থেকে শুরু করে রান্না এবং ঘরের সব কাজ।এমনকি প্রেগন্যান্সিতেও এসব তিনিই করেছেন, ডেলিভারির আগের দিন বাড়িতে অতিথি এসেছে, তার স্বামী (সংগী)ও অতিথির মতই তাকে সে খবরটুকু পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব সেরেছেন। এবার সেই মহা শক্তিধর নারী একা হাতে বাজার করেছেন(অতিথি সৎকারের এবং মাসের), সেগুলো কেটেছেন, গুছিয়েছেন, রেঁধেছেন, অতিথিদের খাইয়েছেন। রাতে তার ব্যথা উঠেছে, স্বামী (লিখি খোকা বাবু) ভাববেন বলে তিনি ডাকেননি।

পরেরদিন সকালে অতিথি বিদায় হলে স্বামীকে জানিয়েছেন, তিনিও যথারীতি ডক্টরের ফি এর টাকা ধরিয়ে দিয়ে দায় সেরেছেন। তারপর বিরাট ইতিহাস করে তার বাচ্চা হয়েছে, কিন্তু সেই ইতিহাসে পরাজিত শেরশাহের মতোই স্বামীপ্রবরের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ঊনি সাহসী মানুষ সন্দেহ নেই, ওনার সাহস সম্মান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আমি ভাবছি, ওনার লেখা দিয়ে ঊনি যে অকর্মণ্য স্বামী ব্যক্তিটিকে কেয়ারিং, ভালো মানুষের তকমা দিয়ে গ্লোরিফাই করলেন এবং ওনার এই লেখা পড়ে যারা লাইক, শেয়ার, লাভ দিয়ে অশ্রুজলে সিক্ত হলেন, তাদের যে ভবিষ্যতটা উনি বরবাদ করলেন, তার কী হবে?

যেসব পুরুষেরা এটা পড়লেন তারা তো বুঝেই গেলেন এভাবেও জীবন চলবে এবং “শাবানা” রূপী কেউ না কেউ এসে হাত ধরে ওনাদের ভবতরী পার করাবেন। অনেক মেয়ে মেসেজ পেলো, এটাই সাহসী নারীর সংজ্ঞা। কেউ ভাববেও না, কী ভীষণ দায়িত্বজ্ঞানহীন একজন মানুষকে এখানে মহান “কেয়ারিং” বানানো হলো, একটা মানুষকে (মানে যদি সত্যিই মেয়েরা সেটা হয়) কী ভীষণ অবহেলা, অমানুষিক ব্যবহার আর অনাদরে ট্রিট করা হলো। লেখক একবারও কী সত্যিই ভাবেন নি যে, ওনার সংগীর আচরণ আদরনীয় তো নয়ই, কোনভাবেই গ্রহণযোগ্যও নয়?

তাহলে উনি এটাকে কী করে গ্লোরিফাই করছেন? তাহলে কী, আসলে আমরা যে যাই বলি, মেয়েদের মাথাতে এখনও সেট করা, পুরুষ মানুষ একটু খেয়ালী, বাউণ্ডুলে বা দায়িত্বজ্ঞানহীন হতেই পারে। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব এবং দায় আসলে মেয়েদেরই? এবং মুখ বুঁজে এই দায় এবং দায়িত্ব পালন করে যাওয়াই একজন মেয়ের মানে ভালো মেয়ের দায়িত্ব?
যারা লাইক, লাভ বা শেয়ার দিলেন তারাও তো তাই ভাবেন, তাই না? যে শিশুটি এলো পৃথিবীতে, সেও তো ওই বাবা এবং মাকে দেখেই শিখবে, সে কী শিখবে? তাহলে কোথায় এগোলাম আমরা? এগোনো তো দূর, আসলে কী আমরা কোথাও দাঁড়িয়েও আছি? নাকি সেই পাঁকেই পড়ে আছি? আমাদের মাথা, মন থেকে আর কবে যাবে এই জমে থাকা মরচে? তাহলে বছর বছর পার্পল শাড়ি পরে, কর্পোরেট অফিসের এসিরুমে বসে ফুলের বোকে পাওয়া আর একদিনের সংবাদপত্রের হেডলাইন? এই অর্জন? ব্যস, এটুকুই??

আমরা মেয়েরাই এখনো ভাবতে পারছি না যে সংসার নামের দায় বা দায়িত্বটা আমার একার নয়, সমান অংশীদার আরও একজন আছেন, তো অন্যরা ভাববে কী করে? মুখে অনেক কিছুই বলি, কিন্তু সত্যি সত্যি মন থেকে ভাবতে পারি না বলেই যেদিন ‘পতি’ শখ করে আধাপোড়া ওমলেট করে দেন, আহ্লাদে আটখানা হয়ে পোস্ট দিই, “সাতসকালে আমার হাবির বানানো ব্রেকফাস্ট ভালবেসে আমার জন্য!”

ভাইরে, থামেন। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত আপনি রান্নাঘর আর ডাইনিং এ রিলে রেস দৌড়ান, ওনাকেও সেটা বুঝতে দিন। বলছি না, প্রশংসা করবেন না, করবেন, ভালবাসবেন, কিন্তু প্লিজ মাথায় তুলে তার এবং তার উত্তরপুরুষের মাথাটি খারাপ করবেন না। আর পুরুষরা তারা তো এখনও ভেবে নেন, একদিন ভুনা খিচুড়ি রেঁধেছেন শখ করে তো সংসারের সিংহভাগ কাজ তো উনিই করেন। ভাই, সংসারটা উনি বাবার বাড়ি থেকে ট্যাকে পুড়ে আনেননি। আপনাকে বিয়ে করে দুজনে মিলে বানিয়েছেন, বাচ্চাগুলিও শিব স্বয়ম্ভু নয়, আপনাদের দুজনের বাই প্রোডাক্ট। তাই ঘরের কাজ করে বা বাচ্চার ন্যাপি পালটে আপনি বৌ এবং তার পূর্ব বা উত্তরপু্রুষের প্রতি কোন দয়া করছেন না। এই কাজগুলো যতটা ওনার, ততটাই আপনার। তাই দয়া করছেন না ভেবে বরং ভালবেসে ভাগ নিয়ে করুন, আপনারাও বাঁচুন, মেয়েগুলোকেও শান্তিতে বাঁচতে দিন। মন আর মাথায় জমে থাকা জন্মজন্মান্তরের জগদ্দল পাথরটাকে সরিয়ে একবার প্রাণ ভরে বাঁচুন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.