নারীর স্বাধীন ভাবনার মূল্য কতটুকু?

জান্নাতুল ফারহানা রুপা:

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিকতার ধারক, বাহক এবং ব্যবস্থাপনায় রয়েছে নারী নিজেই। একটু অন্যভাবে বললে, নারীকে পরাধীন এবং অবদমন করে রাখার জন্য পুরুষতন্ত্র যে সুবিশাল প্রাচীর দিয়ে নারীদের আটকে রেখেছে, সেই প্রাচীর তৈরিতে, যোগালির শ্রম দিয়েছে নারী নিজেই।
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি।

তা না হলে, বাড়ির পুত্রবধুর গায়ে কী করে তার শাশুড়ি কিংবা ননদ আগুন ধরিয়ে দেয়? অথবা বাসার কাজে সাহায্যকারী ছোট মেয়েশিশুটির গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়? অফিসে নারী কলিগদের দ্বারা হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বা হয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাটাও কিন্তু কম না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারীদের এই দীক্ষায় (!) দীক্ষিত করেছে, শুধু এই যুক্তি দিয়ে আমরা নারীরা, নিজেদের দোষগুলোকে নিজেরাই ধামাচাপা দিচ্ছি না তো? যারা নারীবাদ বুঝেন না বা জানেন না তাদের না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু যারা জানেন এবং বোঝেন, তারা কি পারছেন একজন নারী হয়ে অন্য নারীর মতামত কিংবা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকে সেই সম্মান জানাতে? মতামতের বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা এলেই আমরা সেই ভিন্ন মতপোষণকারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করি না। তখন আমরা বেমালুম ভুলে যাই দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা বা প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা বলেও কিছু ব্যাপার আছে।

ব্যক্তিগতভাবে আমিও কিছু ব্যক্তিকে এমন ভাবনার অংশ হিসেবে পেয়েছি, যারা নিজেদেরকে ফেমিনিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু নিজের মতের সাথে না মিললে, দৃষ্টিভঙ্গির সাথে না মিললে অথবা স্বার্থের হানি হলে, নারীবাদের মূলমন্ত্র থেকে সরে যেতে দ্বিধাবোধ করেন না। পাবলিক ফোরাম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন কথার পিঠে শুধু মুখের কথা দিয়ে একজন নারী আরেকজনের নারীর চরম অসম্মান করছেন, তখন বেমালুম ভুলে যান যে তারা দুজনেই আসলে নারী! অথচ একজন নারী হয়ে যদি অন্য এক নারীর মতামত, স্বাধীন ভাবনার বা সম্মানের মূল্য দিতে না পারি, তাহলে কীভাবে পুরুষের দিকে আঙ্গুল তুলি? আমরা নিজেরা কি পেরেছি অন্য নারীর প্রতি পুরোপুরিভাবে নিজেদের সহমর্মিতার হাত বাড়াতে বা নিজেদের চিন্তার মধ্যে সেই সহমর্মিতাকে ঠাঁই দিতে?

আবার অনেকেই বলে থাকেন যতদিন না পুরুষকে আমরা পাশে পাবো ততদিন পর্যন্ত নারীমুক্তি মিলবে না! কিন্তু পুরুষকে আমরা পাশে পাবো বা কতটুকু পাশে পেয়েছি সে কথা না হয় পরে হবে, নারীদের কতটুকু পাশে পেয়েছি বা পাচ্ছি? প্রমোশনের আনন্দে আমি যখন অন্যান্য কলিগদের শুভেচ্ছার আনন্দে ভাসছি, ঠিক তখনি আরেক নারী কলিগ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ বাঁকা করে অন্য নারী কলিগকে বলছেন – “খাতির লাগালে সবাই প্রমোশন পায়”। এই হলো আমাদের সৈন্যদল, যাদের নিয়ে আমরা পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করবো!

প্রতিটি জায়গায় নারীতে নারীতে দলাদলি। যেসব নারী বাইরে কাজ করেন না, তারা কর্মজীবী নারীদের নিয়ে টিপ্পনি কেটে থাকেন। যেমন, চাকরি করে, সংসারে কোন মন নাই, বাচ্চার যত্ন নেয় না, ইত্যাদি। আবার যারা বাইরে কাজ করেন, গৃহিনীদের নিয়ে তাদের মন্তব্য – ওরা কী বোঝে? সারাদিন তো স্টারপ্লাসে নাটক দেখে, আর কুটনামি শিখে! এসব দেখে কিংবা শুনে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের পিছিয়ে থাকার মীল কারণে আমাদের নিজেদের অবদানই বা কম কীসে? কেন আমরা কোন কিছুতেই একমত হতে পারি না?

আমাদের মনে রাখতে হবে তর্ক কিংবা নেতিবাচক সমালোচনা কখনো কোন সমাধান দিতে পারে না। যে মেয়ে জিন্স পরছে, বোরখা পরিহিতরা তাকে বেশরম বা ধর্মের দোহাই দিয়ে ছোট করছেন। আবার যিনি জিন্স পরছে তিনি বোরখা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। এই কথা ছোঁড়াছুড়িতে আমরা বেমালুম ভুলে যাই পোশাক, ধর্ম এবং পোশাকীয় স্বাছন্দ্য মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ বা চয়েস। নেতিবাচক শব্দ দিয়ে ধর্মের ইতিবাচক দিককে উন্মোচিত করা যাবে না। ঠিক একইভাবে অন্যজন বোরখা পরছে না বলেই সে অন্ধকারে ডুবে গেল বা গেছে এমন ভেবে নেয়াটা নেহাতই বোকামি। অন্যজনের পোষাকীয় স্বাছন্দ্য নির্ধারণ করার আমি আপনি কেউ না। সেটা জিন্সই হোক বা বোরখাই হোক।

আমি এমন একজনকে জানি, যে কিনা সদ্য মা হওয়ার পরে আর চাকরিতে জয়েন করতে চাচ্ছেন না। বাচ্চা সামলিয়ে রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে সকালে অফিসে আসেন মলিন চেহারা নিয়ে। সারাক্ষণ দু:শ্চিন্তা বাচ্চা গৃহকর্মীর কাছে রাখায়। এদিকে অফিসে তার মন নেই। দিন দিন ডিপ্রেশনে ডুবে যাচ্ছেন এবং ভুগছেন অপরাধবোধেও। তিনি নিজেই চাকরিটা করতে চাচ্ছেন না, এই সময়টা তিনি তার বাচ্চাকে দিতে চাচ্ছেন, নিজে বিশ্রাম নিতে চাচ্ছেন। কিন্ত তার অভিভাবকরা (!) তাকে কিছুতেই চাকরি ছাড়তে দিবেন না। এতো ভালো ছাত্রী, এতো ভালো রেজাল্ট, চাকরি না করে বাচ্চা পালবে, এটা কেমন কথা! পাশাপাশি বাড়তি চাপ, বিসিএস-এর প্রস্তুতিও নিতে হবে!

এবার ভিন্ন চিত্রটা বলি, অন্য আর একজন তিনি চাকরি করতে চান, কিন্ত তার স্বামী কিছুতেই চাকরি করতে দিবেন না, এই নিয়ে প্রতিদিন সংসারে অশান্তি। কিন্তু দেখুন, দুইটা ভিন্ন চিত্র, সমস্যা কিন্তো একটাই। সমস্যা আসলে চাকরি করা বা না করা না। সমস্যা হচ্ছে দুইজনের কেউই স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে পারছে না, তার পছন্দের কোন মূল্য নেই।
আর যতদিন একজন নারীর মাঝে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা জন্মাবে না এবং অন্য নারীরাও সেই স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে পারবেন না, ততদিন নারী কখনোই স্বাধীনতার মুখ দেখবে না। শুধু চাকরি করলে কিংবা অর্থ উপার্জন করলেই নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসবে, বিষয়টা আসলেই কি তাই?

টাকা কোথা থেকে আসছে সেটা বিষয় না, বিষয় হচ্ছে সেই টাকার উপর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নারীর আছে কি না? আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন অনেককেই চিনি যারা সারা বছর চাকরি করে যে বেতন পান সেই টাকা কোথায় খরচ হবে, কোথায় কতটুকু জমা হবে, সেই টাকার কতটুকু সেই নারী নিজের সাজপোষাকে ব্যয় করবেন, তা নির্ধারণ করে দেন তার স্বামী। আবার এমন অনেক গৃহবধুদেরও চিনি যাদের এক টাকাও উপার্জন না থাকা সত্ত্বেও স্বামীর বেতনের বা সংসারের টাকা কোথায়, কীভাবে/কোথায় খরচ হবে, কীভাবে জমা/সঞ্চয় হবে বা এসেট করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয় সে নিজেই।

তাহলে এই নারীদের মধ্যে কে স্বাধীন? কে স্বনির্ভর?
যতদিন পর্যন্ত একজন নারী অন্য একজন নারীর স্বাধীন চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং পছন্দ/চয়েসকে সম্মান দিতে না পারবে ততদিন পরিস্থিতির কোন উন্নতি হবে না।

লেখক: এডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান (সহকারী অধ্যাপক), আইন বিভাগ, অতীশ দীপংকর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.