‘পুরুষদের নারীবাদী হওয়া নাকি নারীদের সাথে শোয়ার ধান্দা’!

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

এদেশে একজন নারীর নারীবাদী হওয়াটা অনেকটা আত্মহত্যার শামিল। সমাজের কিছু মানুষ সেই নারীকে সাধুবাদ জানাবে, তার বক্তব্যকে সমর্থন করবে ঠিকই, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠই মেতে উঠবে সেই নারীর চরিত্র নিয়ে কাটাছেঁড়ায়। একজন নারী হয়তো বললো সে তার প্রাপ্য অধিকারটুকু বুঝে নিতে চায়, স্বাবলম্বী হতে চায় কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা মেনে নিয়ে গৃহবন্দি হয়ে থাকতে চায় না, তাতেই বেশিরভাগ মানুষ তার দিকে তেড়ে আসবে। তাকে রাস্তার মেয়ে, চামড়া ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পতিতা, বেশ্যা সব ধরনের শব্দ/শব্দগুচ্ছ দ্বারা আক্রমণ করা হবে।

স্রেফ মানুষ হিসেবে নিজের সমানাধিকার দাবি করার ফলেই একজন নারীকে যখন এ ধরনের প্রতিক্রিয়া পেতে হয়, তখন তার যে ঠিক কেমন লাগে, আমি একজন পুরুষ হিসেবে হয়তো ঠিকমতো কল্পনাও করতে পারি না। কেননা যতই নারীদের প্রতি সমব্যথী, সহমর্মী হওয়ার চেষ্টা করে যাই না কেন, পুরুষ হিসেবে আমারও তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আসলেই হয়তো আমার পক্ষে কোনোদিন পুরোপুরি বুঝে ওঠা সম্ভব হবে না যে একজন স্বীয় অধিকার সচেতন নারীকে প্রতিনিয়ত কী ভীষণ মানসিক চাপ সহ্য করে যেতে হয়।

তবে নিজের অনুভূতির কথাটুকু অন্তত আমি বলতে পারি, যখন একজন পুরুষ হয়েও নারীদের অধিকার নিয়ে কিছু বলতে হিয়ে অচিন্ত্যনীয়, অভাবনীয় সব অভিযোগে অভিযুক্ত হই।

সর্বপ্রথম যে কথাটা শুনতে হয় তা হলো, “এই যে এসে গেছে নারীবাদী!” এবং বলাই বাহুল্য, আমাদের সমাজে ‘নারীবাদী’ শব্দটা সাধারণত প্রশংসাসূচক নয়। এটি ব্যবহৃত হয় ব্যাঙ্গাত্মক অর্থে। অনেকে আবার এটিকে দিন দিন গালির পর্যায়েও নিয়ে যাচ্ছে। তারপরও নিজে যেহেতু জানি ‘নারীবাদী’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী, তাই এই বিষয়টিও হাসিমুখে মেনে নেয়া যায়। বলা যায়, “হ্যাঁ ভাই, আমি আসলেই নারীবাদী।”

কিন্তু একটি কথা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না, বরং প্রচণ্ড অফেন্ডেড হতে হয়। সেটি হলো, নারী অধিকার নিয়ে যে পুরুষরা কথা বলে, তাদের সবারই নাকি “নারীদের সাথে শোয়ার ধান্দা।” মানে নারী অধিকার নিয়ে যদি কখনও কোনো কথা বলে থাকি, এগুলো কোনোটাই আসলে মন থেকে বলি না, সব বলি নারীদের মন জয় করতে বা তাদের ইমপ্রেস করতে, যাতে তাদের সাথে “শুতে” পারি!

এখানে প্রথমেই সাফ জানিয়ে দেয়া দরকার: না ভাই, নারী অধিকার নিয়ে কোনো পুরুষের কথা বলার মোটিভেশন নারীদেরকে পটিয়ে তাদের সাথে প্রেম বা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া বলে আমি মনে করি না। অন্তত আমার সুস্থ-স্বাভাবিক মস্তিষ্কে এ ধরনের মোটিভেশন কাজ করে না। অবশ্যই সব ক্ষেত্রে কিছু সাধুবেশী ভণ্ড থাকে; ফলে নিজেদের ‘নারীবাদী’ হিসেবে পরিচয় দেয়া কোনো কোনো পুরুষও এমন হতেই পারে। তাই বলে ঢালাওভাবে সবার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়াটা কোনো কাজের কথা না।

তাহলে ফের প্রশ্ন আসতে পারে, একজন পুরুষ কেন নারীবাদী? এটি খুবই যুক্তিসঙ্গত একটি প্রশ্ন। এবং এটি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

কোনো পুরুষ নারীবাদী হতে পারে এ কারণেও যে, সে একজন মানুষ, তার মাঝে মনুষ্যত্ববোধ আছে, এবং সে অন্য অধিকাংশ পুরুষের মতো সুবিধাবাদী নয়। ‘সুবিধাবাদী’ শব্দটি ব্যবহার করছি, কেননা আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থা তো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সব সুযোগ-সুবিধা পুরুষদের জন্যই দিয়ে রেখেছে। পুরুষদেরকে আলাদা করে আর সেসব সুযোগ-সুবিধার জন্য আন্দোলন বা লড়াই করতে হয় না। বিষয়টি অনেকটা এমন যে পুরুষদের জন্য টেবিল জুড়ে থরে থরে খাবার সাজানো আছে, তারা শুধু বসে পড়ে খেয়ে নিলেই হয়। অর্থাৎ এভাবেই ‘সুবিধাবাদী’ প্রবৃত্তিকে কাজে লাগানো যায়।

কিন্তু সব পুরুষ তো এমন সুবিধাবাদী নয়। অনেক পুরুষের মধ্যে এই বিবেকবোধও আছে যে তারা সব অধিকার শুধু নিজেরাই ভোগ করে যাবে না, আর বঞ্চিত রেখে দেবে না তাদের আশেপাশের নারীদের।

এই আশেপাশের নারী কারা? অন্য সব নারীদের কথা না হয় বাদই দিই। প্রথমেই তো আসে ঘরের মা-বোনদের কথা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা ছোটবেলা থেকে তাদের মা, বোনদেরকেই নিপীড়িত অথবা ‘নিয়ন্ত্রিত’ হয়ে আসতে দেখে। তারা দেখে, কীভাবে তাদের মা-বোনদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখা হচ্ছে, কীভাবে তাদের জীবনে নিজস্বতা, স্বকীয়তা বলে কোনো ধারণার অস্তিত্ব থাকছে না। আর এমন দৃষ্টান্ত চোখের সামনে দেখে বেশিরভাগ পুরুষই নিজেরাও নারীদের সাথে এমন করতেই শেখে, অভ্যস্ত হয়।

কিন্তু কিছু কিছু পুরুষের মধ্যে তো এমপ্যাথি নামক জিনিসটাও থাকে। তারা তাদের মা-বোনকে অন্যায়-অবিচারের শিকার হতে দেখে নিজেরাও একই কাজের পুনরাবৃত্তি করতে শেখে না, বরং তারা তাদের মা-বোনদের কষ্টটাকে অনুভব করতে পারে। মূলত মা-বোনদের কষ্টই (এমনকি তা অস্ফূট, অব্যক্ত হলেও) তাদেরকে নাড়া দেয়, তাদের মনোজগতে তোলপাড় সৃষ্টি করে। তারা নিজেরাও নারী অধিকার হরণ করার বদলে, চেষ্টা করতে শুরু করে যেন আর কোনো নারীর সাথে এমন না ঘটে, যা তাদের মা-বোনদের সাথে ঘটেছে।

সুতরাং, মূল কথা হলো ওই এমপ্যাথিটাই। এমপ্যাথি না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। হয় অসভ্য, বর্বর, পাশবিক। তারা চোখের সামনে যা দেখে সেটিকেই গ্রহণ করে। অন্য কারো আবেগ, অনুভূতিকে মূল্য দেয় না। ঠিক সে কারণেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেশিরভাগ পুরুষই নিজেরাও হয়ে ওঠে নারীবিদ্বেষী, নারী নির্যাতনকারী। তারপরও হাতে গোনা কিছু পুরুষ অবশ্যই থাকে, যারা নারীদের বেদনাকে উপলব্ধি করে তাদের হয়ে মুখ খোলে, সরব হয়, হয়ে ওঠে নারীবাদী।

এখন সেইসব নারীবাদী পুরুষদের কাজের নেপথ্য কারণ হিসেবে যারা “অনেক নারীর সাথে শুতে চাওয়া”-কে নির্দেশ করে, তারা আসলে পরোক্ষভাবে নিজেদের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এসব এমপ্যাথি, অন্যের কষ্ট অনুভব করা জাতীয় গভীর জিনিস তাদের মাথায় আসবে কেন! তাদের মতে নারী-পুরুষ সম্পর্ক মানেই হলো খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। পুরুষদের কাজ শুধুই নারীদের শরীর নিয়ে খেলা করা! নারীদের ব্যাপারে পুরুষদের মনে এই শরীরী চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তাই কাজ করতে পারে না!

যারা এমন মানসিকতার অধিকারী, এই লেখা পড়েও তাদের মানসিকতার যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হবে না, তা খুব ভালো করেই জানি। তারপরও বলতেই হবে বলে বলছি। দয়া করে সব পুরুষকে নিজেদের মতো করে ভাববেন না, নিজেদের সাথে এক পাল্লায় মাপবেন না। তাছাড়া জীবন মানেও যে কেবল যৌনতাই নয়, এটুকুও বোঝার চেষ্টা করবেন। নিজেদের জীবনটাকে কেবল যৌনতাময় করে তুলবেন না।

যৌনতা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বটে, কিন্তু সেটিই যে জীবনের একমাত্র আলোচ্য বিষয় নয়, যৌনতার মতোই মানুষের জীবনে আরো অসংখ্য উল্লেখযোগ্য বিষয় রয়েছে, সেটি একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আর যদি তা বুঝতে না পারেন, তাহলে জেনে রাখুন, আপনাদের মানসিকতা যেমন বিকৃত, তেমনই আপনারা মানুষ হয়েও অমানুষ।

আর সবশেষে যে কথাটি না বললেই নয়: নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিকে খাটো করে দেখাটা এবার বন্ধ করুন। নারীরা মোটেই বোকা না যে কোনো একজন পুরুষ তাদের অধিকার নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বললেই তারা মুগ্ধ হয়ে যাবে, তার প্রেমে পড়ে যাবে। প্রায় সব নারীরই সেই ছোটবেলা থেকে অভিজ্ঞতা রয়েছে আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হওয়া পুরুষদের মুখোশের আড়ালে থাকা বীভৎস রূপের সাথে পরিচিত হওয়ার। তাই তাদেরকে এত সহজে বিভ্রান্ত করা সম্ভব না।

সুতরাং শুধুমাত্র কোনো পুরুষকে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখেই যে তারা একেবারে গলে যাবে, সে প্রশ্নই আসে না। অন্তত আমার সাথে কোনোদিন এমন হয়নি যে আমি নারী অধিকার নিয়ে কোথাও লিখেছি বলে নিতান্ত অপরিচিত কোনো নারী আমার সাথে ভাব জমাতে এসেছে। এবং সেজন্য আমি সত্যিই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি, এবং নারীদেরকে আমি ধন্যবাদও জানাই।

যে দিনকাল পড়েছে, তাতে শুধু কারো বাহ্যিক কথাবার্তা বা বেশভূষা দেখে তাকে ভালো মানুষ বলে মেনে নেয়া খুবই হাস্যকর ব্যাপার। আমি সবসময়ই মনে করি, একজন মানুষ সত্যিকারের ভালো মানুষ কি না, সে হদিস রয়েছে তার অন্তরে। সেই অন্তরের নাগাল পেলেই কেবল কাউকে ভালো বলে মেনে নেয়া, এবং তার সাথে যেকোনো ধরনের সম্পর্কে এগোনো উচিৎ। তার আগে কখনোই নয়। কারণ সত্যিই, দুনিয়াটা ভণ্ড, কপট, মুনাফিকে ভরে গেছে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 587
  •  
  •  
  •  
  •  
    587
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.