নারীর চাকরি বা যোগ্যতা কেন অন্তরায়!

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

একটা মেয়েকে মেরে ফেললো, মেরে ফেলার কারণ হলো মেয়েটা পড়তে চেয়েছিলো। পড়াশোনা করে মস্ত চাকরি করার স্বপ্ন দেখেছিলো। নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত –যেকোনো জীবন যাপনেই মেয়েদের জীবনের গণ্ডি বা সীমাবদ্ধতা বিয়ে পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। বিয়ে হলেই মেয়েটার মুক্তি।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা ভাবি রান্না আর ঘর সামলানোর দায়িত্ব শুধুই মেয়েদের। পুরুষের দায়িত্ব টাকা উপার্জন করার। এই রান্না আর ঘর সামলানোরটা অনেকটা বুয়ার পর্যায়ের। বুয়াও আজকাল মাসে বা পনেরদিন অন্তর একদিন ছুটি পায়। কিন্তু ঘরের বউয়ের সেই অধিকারটুকুও নেই।
একটা মেয়েশিশু জন্ম নেয়ার পর পরিবার তাকে অনেক যত্ন করে বড় করলেও ওই পরিবার ভাবে, “একটা ভালো ঘরে” মেয়েটাকে বিয়ে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভালো ঘর বলতে কী বোঝায়? অবস্থাপন্ন ঘর? মানে যে সংসারের পুরুষের ৩০/৩৫ হাজার টাকা উপার্জন আছে? হয়তো সেই ঘরের সদস্য সংখ্যা কম? যে ঘরের ছেলের মা-বাবা অনেক বড় অংক কাবিননামায় লিখতে রাজী হয়? বর্তমানে ছেলেমেয়ে সবাইকে পড়াশোনা করার জন্য মা-বাবা প্রস্তুত থাকে। গ্রামের দিকে তো এক কাঠি সরস। মেয়ে সন্তানকে স্কুলে পাঠালেই টাকা দিচ্ছে সরকার। মা বাবারা টাকার জন্য শেষ পর্যন্ত মেয়ে বাচ্চাকে স্কুলে তো পাঠাচ্ছে, কিন্তু যখনই টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায়, ব্যস তখনই তার জীবন এর দায়িত্ব চলে যায় অন্য সংসারের এক পুরুষের উপর।
আমদের অভিভাবকগণ আমাদের জন্য জীবনসঙ্গী কীভাবে পছন্দ করেন? সুন্দর চেহারার মেয়েদের বেলায় আর ছেলেদের জন্য ৫/৬ ডিজিটের বেতনের চাকরি হচ্ছে যোগ্যতার মাপকাঠি।

আমার নানী গোত্রের নারীরা প্রায়ই বলতেন, যতোই পড়াশোনা করো, রান্নাঘরের চুলা ঠেলতেই হবে। রান্নাটা ভালো করে শেখো।
আপনাদের একটা গল্প বলি, “শাশুড়ি তার বড় ছেলের বউকে বলছে, বুঝলে বৌমা, মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত। বউ শাশুড়ির পা টিপতে টিপতে বললো, তাহলে তো মা, মেঝো বউয়ের বেহেশত নিশ্চিত। শাশুড়ি রেগে বললো, কেন? বড় বউ বললো, মেঝো বউ চাকরি করে তার বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসা করছে, সেবা করছে, তার দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে, আমি তো তার কিছুই করতে পারলাম না, আমার কী হবে মা? শাশুড়ি বললো, এই যে তুমি আমার পা টিপে দিচ্ছো, আমার সেবা করছো, তোমার কি পূণ্য হচ্ছে না? আমি তো তোমার জন্য মন থেকে দোয়া করছি, তুমিও নিশ্চয়ই বেহেশতে যাবা। শোনো, শাশুড়ির সেবা করলেও বেহেশতে যায়। বড় বউ মুচকি হেসে বললো, ঠিক বলেছেন মা, আপনার বড় ছেলেকে একটু বোঝাবেন, কেমন!

আচ্ছা, আরেকটা গল্প বলি। এক ভদ্রলোকের মেয়ের জামাই আর ছেলের বউ রোড এক্সিডেন্ট এ মারা গেছে। তো সেই ভদ্রলোক বুক চাপড়ে চাপড়ে কান্না করছেন। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “কপাল ভালো আমার, যা যাওয়ার পরের উপর দিয়ে গেছে।”
এই হলো আমাদের পরিবার!

জোকস এপার্ট। ছেলের বউয়ের ভুল কাজে যদি শ্বশুরবাড়ির লোকের বদনাম হয়, তাহলে ভালো কাজে শ্বশুরবাড়ির লোকের সুনাম হওয়ার কথা!! তাহলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বউয়ের সাফল্যতে এতো ভয় পায় কেন? কেন একবারও ভাবলো না, ওই মেয়েটা যদি বিসিএস ক্যাডার হয়েই যেতো তাহলে তার শ্বশুরবাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলতো, ওই যে বিসিএস ক্যাডারের স্বামী বা শ্বশুর বা শাশুড়ি যায়! এতে কি প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যেতো? বউয়ের পরিচয়ে পরিচিত হতে হতো, এটা কি আত্মসম্মানে বাঁধতো? আচ্ছা, বউ যদি বেতন পেয়ে শ্বশুর শাশুড়ির হাতে বেতনটা তুলে দিতো, তাহলে তো তাদের মান-সম্মানে বাঁধতো, বউয়ের টাকায় সংসার চলে, ছেঃ ছেঃ ছেঃ! নাহলে এটা হয়তো ভেবেছে, “যদি মেয়েটা পাশ না করতো, তাহলে তো শ্বশুরবাড়ির মান-সম্মান নষ্ট হয়ে যেতো! ভালোই করেছে তাহলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা! কত বড় সাহস, সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।
না রাহেগা বাঁশ, না বাজেগা বাঁশরি!

আসলে আমাদের সমাজের পুরুষরা তাদের চেয়ে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন মেয়েদের পছন্দ করেন না। কারণ একটাই, ওইসব মেয়েদের সহজে বশে আনা যায় না। নিষ্পেষিত করা যায় না। জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ এই অভাগী মেয়েটাই।
যেখানে নিজের মায়ের কাছে মেয়েটা তার অত্যাচার এর কথা বলতে পারে না, বাপের বাড়ির লোকের কাছে শুনতে হয়, ওইটাই এখন তোর নিজের বাড়ি, একটু সহ্য করে থাকতে হবে বা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজের পরিবারের কাছে বিয়ের পর ফিরে আসার অধিকার থাকে না, সেখানে শ্বশুরবাড়ির লোকের কাছে আর কী আশা করবে!

আরেক প্রহসনের নাম হলো — গিফটের নাম করে যৌতুক/মোটা অংকের কাবিন। কোনটাই কি ভালো মানসিকতার পরিচয় বহন করে? মেয়েটার হত্যার পিছনে মা-বাবাও সমান অপরাধী। আমরা আমাদের মেয়েদের এখনো স্বাবলম্বী হতে শেখাই না। আমরাই নির্ধারণ করে দেই, মেয়েদের গন্তব্য ওই শ্বশুরবাড়ি আর রান্নাবান্না পর্যন্ত।

আমার ছেলে ব্যাচমেটদের সাথে আমার প্রায়ই তর্ক হয়, মা-বাবার সেবা করা নিয়ে। নিজের ছেলে পা টিপে দিবে এটা অভিভাবকরা আশা করেন না, তারা আশা করেন, ছেলের বউ এসে তাদের পা টিপে দিবে! এজন্য নাকি বউ স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী! নিজের মেয়ে সকালে উঠে নাস্তা বানাবে বা চা বানাবে, এটা তারা আশা করেন না, ছেলের বউ সকালে উঠে গরম গরম নাস্তা পরিবেশন করবে, এটা আশা করেন। আর এজন্যই নিজের মেয়ে যখন অন্য বাড়িতে গিয়ে অত্যাচারিত হয়, তখন “ওইটাই তোর বাড়ি, একটু এডজাস্ট করে নে” বলা ছাড়া আর উপায় থাকে না। শুধু কি লেখাপড়া করলেই আর মাস্টার্স পাশ করে একটা চাকরি করলেই স্বাবলম্বী হয়? মেরুদণ্ডটাও যে থাকতে হয়। মাস্টার্স পাশওয়ালাদের সবার মেরুদণ্ড থাকে না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না শেখানোও একটা অন্যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাও অন্যায়। হোক সেটা শ্বশুর বাড়ির বা বাপের বাড়ির।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃনসম দহে!!

শেয়ার করুন:
  • 877
  •  
  •  
  •  
  •  
    877
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.