নারীর আশ্রয়ের ভিতটা যখন দুর্বল!

ফাহমিদা খানম:

দুর্বল, নিরুপায় হয়েই অনেক নারী জীবনটা পার করে দেয়, তার আশ্রয়ের জায়গাটা সঠিক না জেনেও নড়বড়ে খুঁটির উপরে কাটিয়ে দিতে এক প্রকার বাধ্যই হয়। এই সমাজ মেয়েদের ভুল কিংবা ডিভোর্সি মেয়েদের উদার চোখে দেখে না বলেই মেয়েরা ছকের বাইরে পা ফেলতে ভুলেই যায় বা একবার না দশবার ভাবে। বেশিরভাগই পড়ে পড়ে মার খায়, কেউ কেউ মরে যায়, পত্রিকার সংবাদ হয়, তবুও সাহসী হতে পারে না।

চিত্রনাট্য আর প্রেক্ষাপট শুধু আলাদা হয় – কিছু চাওয়ার পাওয়াটা এতো ভয়ংকর হয় যে সেটার বিদীর্ণ শব্দ পাশের মানুষেরাও টের পায় না, যদি পেতো তাহলে নারী নির্যাতন অবশ্যই কমে যেতো। কেন আজও পরিবার একটা মেয়ের পাশে দাঁড়ায় না? সামাজিকতা, লোকলজ্জার ভয়ে? নিজের সন্তানের চাইতে সেসব কেন বড় হয়?

এই সংসার জায়গাটা বড় অদ্ভুত – সবাই মুখোশ পরে পারিপাট্য করে নিজেকে আড়াল করে রাখে, তবুও সাহসী হয়ে সত্যের সাথে মোকাবেলা করতে ভয় পায় – জীবন অক্টোপাসের মতো সব সুধাটুকু কেড়ে নিয়ে নিঃশেষ করে দিলেও আমরা ছকের বাইরে পা রাখতে ভয় পাই, সংসারের খাঁজে খাঁজে এমনভাবে সেঁটে যাই যে যতোই হাঁসফাঁস লাগুক, দমবন্ধ লাগুক – মৃত্যু ছাড়া মুক্তি আর কই!

অসহায়ত্বের মুখে লম্বা জীবন সামাজিকতার ভারী পোশাকটা বয়ে বেড়াই অনেকেই। আমরা যাদের আপন মনে করে সংসার করতে আসি, প্রায় সময়ই তারা আপন আর হয় না, নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েও আমরা পরই থেকে যাই। যারা বিয়ে করেন, তারা স্ত্রীদের কতটুকু আপন ভাবেন? কবুল পড়ে স্বামী- স্ত্রী হওয়া সহজ, কিন্তু মনের ভেতর থেকে তাকে বোঝার চেষ্টা করেন কয়জন? আজও কিছু হলেই আঙ্গুল উঠে নারীর দিকেই – ধর্মান্ধতার দোহাই দেখলে মনে হয় নারী জীবন কেবল স্বামী আর তার বাড়ির জন্যে নিঃশেষ করে দেবার জন্যেই। এতোই তুচ্ছ একটা জীবন? হাতের কাছে পাওয়াই যে পাওয়া নয়, এই বোধ আছে কতজন পুরুষের?

শিক্ষিত হলেই তাকে মানুষ বলতেও পারি না, সেটা শুধুই একটা সনদ মাত্র, যেটা দিয়ে মনের ভেতরবাড়ি কখনোই আলোকিত করা সম্ভব না – পরিবার যে কতবড় শিক্ষালয় আমাদের এখনও বোধে, চিন্তা চেতনায় আসেনি। আমরা সার্টিফিকেট দেখে কন্যা সন্তানের নিরাপত্তায় যার কাছে বিয়ে দেই তারা রক্ষকের বদলে নিজেদের স্বার্থে সামান্য ঘা লাগলেই মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না –সুমাইয়া মেয়েটির ভালো ঘর, ভালো বর দেখেই তো পরিবার বিয়ে দিয়েছিল আজ কেন সে পত্রিকার শিরোনাম? একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায় কারা? কতজনের সাথে ফাইট করে ভালো রেজাল্ট করে যে মেয়েটা তাকে কেনো শিরোনাম হতে হয়? যেখানে নিয়ম করে একটা মেয়েকে লাঞ্ছিত করা হয় আর মেয়েটার ইচ্ছের দুই আনা মূল্য যেখানে নেই সেটা কেমন পরিবার? বুঝতে পারার পর কেনো সে সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে? কীসের এতো দায়বদ্ধতা? সংসার মানে দুজনের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস আর ভরসার জায়গা, আর বিয়ের পর একটা মেয়ের দায়িত্ব অবশ্যই একজন স্বামীর — কেনো কন্যার বাবা মেয়ের পড়ার খরচ দিতেন? এই অসম সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কেনো চাইছিলেন? ভেবেছেন এরা একদিন নিজেদের করা ভুল বুঝবে সেই আশায়!

এটা রূপকথার যুগ নয় যে অবশেষে তাহারা সুখে -শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো! ভুলের প্রায়:শ্চিত্ত দিলো সুমাইয়া নিজের জীবন দিয়ে, সেজন্যে বাবার বাড়ির লোকেদেরকেও আইনের আওতায় আনা উচিত। এই দেশে অধিকাংশ পাত্রপক্ষের চিত্র একই – ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় অবস্থা ! মায়েরা পুত্র সন্তানদের প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে ভুলেই যান যে – পুত্রবধুও কারো না কারো আদরের সন্তান।

আর মেয়েদের মায়েদের বলি, যেখানে মেয়ে ভালো নেই সেই নরকে কেনো ঠেলে পাঠান? সন্তান পেটে ধরেছেন কি পত্রিকার সংবাদ করার জন্যে? মেয়েরা যতোই আত্মত্যাগ করুক সম্মানিত শ্বশুরবাড়ি আর স্বামীদের মন কখনও ভরাতে পারবে না – এরা বিয়ে করে স্ত্রী আনে না – বিনা পয়সায় রাঁধুনি, নার্স নিয়ে আসে — বাবাদের রাজকন্যারা বিয়ের পর স্রেফ অন্যের বাড়ির কেয়ারটেকার হয়ে যায়।

তোতাপাখির মতো না চললে কপালে কী জোটে সুমাইয়া তার জলজ্ব্যান্ত প্রমাণ। এদেশের মায়েরা ছেলেদের মানুষ বানালে অনেক সমস্যা কমে যেতো, কিন্তু তারা সেসবে আদৌ আগ্রহী না, মানুষ হতে গেলে মন আর হুঁশের দরকার যেটা এদেশের অনেকেরই পছন্দ না, তাই হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাইকারীদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে, একটা মেয়ের হত্যাকাণ্ডের পর তাদের মনে হয় দোষ নারীরই। এ কোন যুগ, এ কোন সভ্যতা? এক সময় এই দেশের মানুষ সালেহা আর শারমিনের পক্ষে কঠোর ভূমিকা নিলেও কাদের কাছে মনে হয় যে মেয়ে স্বামীর কথা না শুনে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় এটা তার জন্যে সঠিক! ভাবতে পারছেন দেশে কতটা পেছনের দিকে যাচ্ছে?

অন্যায়কারীর পক্ষে কারা কথা বলে বুঝতে কষ্ট হয় না, এরাই ধর্মের নাম দিয়ে অন্যায়কে জায়েজ করতে চায়, অথচ ধর্মে এসব বেহুদা কথা নাই বরং বনিবনা না হলে আলাদা হবার বিধানই আছে। এসব মানুষেরা নিজেদের স্বার্থে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েই যাচ্ছে। আসলে এখন শিক্ষার হার বাড়লেও গোঁড়ামির হার আরও বেশিই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এদের কী চিকিৎসা দিবেন? আমার মনে হয় এদেরকে ধরে আমাজনের গহীন জংগলে ছেড়ে আসাই উচিত যারা সমব্যথী না হয়ে বরং উল্টো বলছে স্বামীর কথামতো কেনো চলেনি, এরা স্রেফ অমানবিক আর অমানুষ এবং পুরুষতন্ত্রের বাহক!

হত্যাকাণ্ডের স্বপক্ষে সাফাই গাইছে যারা, তারাই নারী শিক্ষা কিংবা নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিপক্ষে, কারণ তাতে নারী নিজের ব্যাপারে সচেতন হলে হাজার বছরের লালিত সংস্কারে ধাক্কা পড়বে, বইয়ের পাতায় পড়ে খাতায় উগরে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করা আর সেটা মনেপ্রাণে ধারণ করে মানুষ হবার মাঝে দূরত্ব অনেক বেশিই, কতটা অসভ্য হলে হত্যাকারীর পক্ষে সাফাই গায়? কতটা নিচে নেমেছি আমরা! ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি একটা জাতিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, তবুও আমরা অসহায়ের মতো দেখছি! বিশ্ব যখন মহামারীর সাথে যুদ্ধ করছে তখনও নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রটা যাদের পাল্টাতে পারেনি তাদের ভেতরে কিছুই সভ্যতা, মানবিকতা কিছুই আর বেঁচে নাই – এমন সময়েও মানবিকতার বর্ম খুলে যারা পাশবিকতার পোশাক গায়ে চড়ায় তারা দ্বি-পেয়ে জীব মাত্র , মানুষ হতে পারেনি ।

যেসব নারীরা এই হত্যায় ছিলো তাদেরকে স্বজাতীয় ভাবতে ঘৃণা লাগে, ছোটবেলায় মুরুব্বিদের মুখেই শুনেছিলাম —
“আটা গুণে রুটি, মা -গুণে ব্যাটা, বেটি”
অর্থাৎ মায়ের শিক্ষা কতটা সন্তানের উপরে প্রভাব বিস্তার করে সেটাই বুঝানো হয়েছে।

নারীদের পক্ষে লিখলেই একদল চেতনাবাজদের চুলকানি শুরু হয়ে যায়, তাদের কাছে নারীবাদী মানেই তাদের ছকের বাইরে গিয়ে নিজের প্রাপ্যতা নিয়ে কথা বলা তাই নারীর পক্ষে কথা বললেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন এরা, আমারতো মনে হয় যেসব নারীরা নারীর পক্ষে কথা বলেন তারা বেশিরভাগই এসব চেতনাবাজদের কাছেই ধাক্কা খেয়েছে, এখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কিছু নাই। শিক্ষিত পরিবারগুলো অনেক অন্যায় করে কিন্তু চক্ষুলজ্জায় মেয়েরা চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়।

সম্মানিত শ্বশুরবাড়ি আর স্বামী নামক জীবের কারণেই অনেক নারীর নারীবাদী হওয়া। তাই নারীর দিকে আঙ্গুল না তুলে আয়নায় নিজেদের দেখতে শিখুন। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা আসলে দরকার মেয়েদের পড়ালেখা শেষ করে নিজের ভাবনাটুকু নিজেকে ভাবতে দেয়া – বিয়ে জীবনের একটা অংশ, তবে সেজন্যে নিজের জীবন বিকিয়ে দেবার জন্যে হলে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে, আর মেয়েদের অভিভাবকদের বলি বিয়ে দেবার আগে ছেলের আর্থিক অবস্থান, পদবীর চাইতে মানসিকতা দেখুন, আমরা কন্যাদের আর শিরোনাম হতে দেখতে চাই না, শরীর, মন এমনিতেই ক্লান্ত হয়ে গেছে এসব দেখতে দেখতে। আর সেসব পুরুষেরা বউদের শুধু রান্নাবান্না আর নিজের পরিবারের সবার দেখাশোনার জন্যেই বিয়ে করেন, দয়া করে আপনারা শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করবেন না আপনাদের জন্যে বুয়াই সঠিক – আপনারা ডিজার্ভ করেন সেরকম পাত্রী।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.