হীনমন্যতা নয়, চাই দৃঢ়তা

শাহরিয়া দিনা:

কন্যা শিশুর জন্ম নিয়ে হীনমন্যতা এবং দুঃখ পাওয়া চিরায়ত চিত্র এ সমাজে। অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, তবুও এখনও পরপর দুটি ছেলে সন্তান জন্মালে পরিবার অতটা অখুশি হয় না, যতটা হয় পরপর দুটি মেয়ে জন্মালে।

কন্যাশিশু মানুষ করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র শারীরিক গঠনের জন্যই লোলুপ দৃষ্টির সীমানায় থাকে সে। বছর তো দূর, ৬/৭ মাসের বাচ্চাও বিকৃত কামুকতার শিকার হয়। বাচ্চা ধর্ষণের খবরগুলো এতো অহরহ হয়ে গেছে, এগুলো এখন আর অত আলোচিত হয় না। মূলত ধর্ষণের খবরগুলোই কেন জানি গুরুত্ব হারাচ্ছে দিন দিন।

প্রতিটি পদে পদে কন্যা সন্তানের জন্য থাকে নিয়মের ভিন্নতা। জোরে কথা বলা, উচ্চস্বরে হাসা, দুষ্টামি করা, দৌড়-লাফ দেয়া অর্থাৎ একটা স্বাভাবিক শিশুসুলভ আচরণেও তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয়, তুমি মেয়ে! তোমার এভাবে করা উচিৎ না। এভাবে বলা ঠিক না। এমনকি চুলের কাট ছোট হলে, হাঁটার স্টাইল একটু ভিন্ন হলেও অভিযোগ। ছেলেদের মতো কেন? একে কে বিয়ে করবে?

আমরা সভ্যতার কথা বলি, যুগ এগিয়েছে মানুষের চিন্তা পরিবর্তন হয়েছে ধরে নেই। কিন্তু যখন দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী পড়াশোনা এবং চাকরি করার ইচ্ছের কারণে শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের শিকার হয় এবং মারা যায় বা খুন হয়, তখন ভাবতে হয় কোন সমাজে আছি! কীভাবে আমরা মেয়েদের বড় করছি?

মেয়েটির পরিবার বলেছেন, মেয়েকে নির্যাতন করা হতো। আচ্ছা তারা জানছেন তাদের মেয়ে নির্যাতিত হচ্ছে, তবু কেন তারা কোন সুরাহা করলো না কিংবা মেয়েটা কেন চলে এলো না সম্পর্ক ছিন্ন করে? – এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এবং উত্তরগুলোও আমাদের জানা। লোকে কী বলবে? চুপচাপ সয়ে যাও, এরকম ভাবনাই এর কারণ।

এই সমাজে বিধবার সম্মান থাকে, নির্যাতনে শিকার হয়ে মৃতের জন্য শোক, ডিভোর্সির জন্য থাকে বিদ্রুপ আর অসম্মান। সুতরাং দুই-চারটা চড়-আঘাত, স্বামী মদ্যপ-মাতাল, পরনারীতে আসক্ত, এইসব ছোটখাটো ব্যাপার মেনে নেবার পক্ষে থাকে মেয়ের পরিবার। মেয়ে ততক্ষণ আদরের যতক্ষণ সে স্বামীর বাড়িতে রানীর মতো থাকে। সেই রানীটা চাকরানি বা রাজরানী যাই হোক তা ব্যাপার না। যখন ফিরে আসে তখন সে বোঝার সমতুল্য। না পারে গিলতে, না পারে ফেলতে অবস্থা বেশিরভাগ পরিবারের।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমার মেয়ে কেন বোঝা হবার মতো করে মানুষ করবো আমি? আমি কেন তাকে মানুষের মতো মানুষ করবো না? কেন তাকে পরমুখাপেক্ষী অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো তৈরি করি? মেয়ে কোনো বিষয় অভিযোগ করলে থামিয়ে দেবার আগে শুনুন সে কী বলতে চায়! মুখের উপর কথা বললে বেয়াদব বলার আগে যাচাই করুন সে সত্যি বলছে কিনা। সে যে স্পোর্টসে আগ্রহী তাকে সেটা করতে দিন। আপনি যদি নাচ-গান শেখার জন্য খরচ করার সামর্থ্য রাখেন তবে তাকে কুংফু-ক্যারাটে, মার্শাল আর্ট শিখতেও ভর্তি করে দিন।

ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া মেয়ে স্কুলের ‘কন্যাশিশু’র আত্মরক্ষা’র কর্মশালায় কী শিখলো জিজ্ঞেস করলাম। বললো, কেউ আক্রমণ করলে শক্তি দিয়ে তার হাত ধরে মোচড় দিতে হবে ক্রমাগত। তারপর দুই পায়ের মাঝখানে সজোরে লাথি। চেষ্টা করতে হবে চোখ-নাকে আঘাত করার আর চিল্লাতে হবে যত জোরে সম্ভব। হ্যাঁ চিল্লানো বা চিৎকার জরুরি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ বন্ধ রাখা মানে আপনি তাকে সুযোগ দিচ্ছেন। মেয়েকে প্রতিবাদ করতে শেখান। পথে-ঘাটে চলার পথে পাশে থেকে খেয়াল রাখুন, কিন্তু তার সাথে দৈবক্রমে ঘটা কোন অসঙ্গতির প্রতিবাদ-প্রতিকার তাকেই করতে দিন।

মেয়েকে হীনমন্য নয়, আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে। নিজের উপস্থিতি এবং পারিবারিক বিষয়ে নিজের মতামত জানান দিতে শিখুক ছোটবেলা থেকে। সে মেয়ে বলেই তাকে সহ্য করে যেতে হবে এবং ভাই ছেলে বলেই একটু বেশি পাবে, এই ধারণা দেয়া যাবে না। বরং দুজনেই আপনাদের সন্তান দুজনেই সমান সমান বুঝিয়ে দিন প্রতিটি আচরণে।

একটা মেয়ে যখন শিক্ষিত স্বাবলম্বী হয় তখন তার জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য কারও দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। অন্যের নির্যাতনে মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই সে তার নিজ গন্তব্য ঠিক করার সামর্থ্য রাখে। পড়ালেখা এবং অর্থ-উপার্জন ছেলেমেয়ে সবার জন্য আবশ্যিক ভাবনার বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা অনেক অন্যায়কে মেনে নেবার সূতিকাগার।

মেয়ে! জীবন তোমার একলার। বিপদে পড়ে দেখো কেউ নেই পাশে তোমার। আজ যাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব মেনে নিচ্ছো, ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে একসময় বেরিয়ে ফিরে এলে শুনবে আরও আগে কেন এলে না, কিংবা মানিয়ে কেন চললে না! তোমার পরিস্থিতি তুমিই ভুক্তভোগী, আর কেউ না। একসময় বাবা-মা’য়ের বয়স বাড়ে, তারা মারা যান। ভাই-বোন কে কার খবর রাখে! আর সন্তান? তারও জগৎ হয়ে যায়। স্বাবলম্বী নাহলে তুমি থাকো প্রয়োজনে কিছুটা অবহেলায়। সন্তানের ভবিষ্যৎ সিদ্বান্তে পারিবারিক মতামতে পিছিয়ে।

প্রয়োজন না প্রিয়জন ছিলাম, বৃদ্ধ বয়সে এই হিসাব মেলানোর অশ্রুসিক্ত চশমার ঝাপসা কাঁচ পরিস্কার করতে করতে আবছা আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাসে কাটে দিন। অথচ এইসব দিনেও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দিতে পারে একঘেঁয়ে থেকে জীবনের আনন্দ। আপনি বিপদগ্রস্ত কারো দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন৷ দাতব্য সংস্থার সাথে কাজ করে মানুষের কল্যাণেঁ আসতে পারেন। কারও জন্য কিছু করতে পারায় মানসিক প্রাশান্তি আসে।

কন্যা শিশুকে মানুষ করুন মানুষের মতোই। একটু বেয়াদব, একটু ছেলেদের মতো, যে যাই বলুক তাকে গড়ে তুলুন শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান, মানসিকভাবে দৃঢ় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। সে কারও প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে হোক কারো আশ্রয়। জীবন একটাই, সে জীবন হোক মানুষের। বৈষম্যহীন বেঁচে থাকার আনন্দের।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.