পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার

রাফিয়া মাহমুদ প্রাত:

আমাদের দেশে নারীদের প্রতি বৈষম্য তো নতুন কিছু না। ধর্মের দিক থেকে নারীর পৈতৃক সম্পত্তি পাবার অধিকার কোন ধর্মে কেমন দেয়া আছে সেই তর্কে না গিয়ে লিখছি আমাদের সমাজে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া একটি বিষয়।

‘অমুকের বোন তো বাপের বাড়ি থেকে কিছুই নেয়নি’
‘মেয়েরা সাধারণত বাপের সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে আসে না-এটাই নিয়ম’
‘অমুকের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলো না, তাও সে তার অংশটুকু ভাইকে দিয়ে দিয়েছে। ‘

এই কথাগুলো কিন্তু আমাদের কাছে খুব একটা অচেনা কোনো কথা নয়। আমরা অনেকেই নিজ পরিবারে হোক বা অন্য কোথাও হোক এরকম কথার সম্মুখীন হই কমবেশি।
যদি রাষ্ট্রীয় আইনের কথা বলি তো আইন অনুযায়ী পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলে মেয়ের সমান অধিকারই দেয়া আছে। কিন্তু তারপরও সম্পত্তি ভাগের সময় এই আইন কিন্তু মানা হয় না।কারণ আমরা তো আমাদের সুযোগ বা সুবিধা মতো আইনগুলো মেনে চলি। সবটুকু না জেনে অর্ধেক নিয়ম মেনে চলি। আর সেজন্য কখনো ধর্মের, কখনো বা আইনের আশ্রয় নিতে হয় আমাদের। আমাদের যখন যেটা সুবিধা হয় সেটুকুই মেনে চলি। আর এর একটি বাস্তব প্রতিফলন হলো পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকা্র।

পিতার সম্পত্তিতে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের অধিকার সমান থাকার পরও বাবার সম্পত্তি থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করা এই সমাজে খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা ।

কিন্তু আইন অনুযায়ী একজন বাবার সকল টাকা-পয়সা,জমি-বাড়ি,শেয়ার অর্থাৎ স্থাবর –অস্থাবর সম্পত্তির উপর তার ছেলের যেই অধিকার তার মেয়েরও ঠিক একই অধিকার।কিন্তু তা সত্ত্বেও এরকম পরিবার আছে যেখানে ভাই আশায় থাকে হয়তো তার বোন নিজের জায়গাটুকু ভাইকেই দিয়ে দিবে।ভাগ বসাতে আসবেনা।
আমাদের মাঝে কিন্তু এমন অনেককেই পাওয়া যাবে যারা হয়তো চক্ষুলজ্জায় মুখ ফুটে চাইতে পারছেনা ,কিন্তু মনে মনে ঠিকই এই ইচ্ছে লালিত পালিত হচ্ছে তাদের।

আর এই বিষয়গুলোকে আমাদের সমাজ এতোটাই স্বাভাবিক করে নিয়েছে যে যদি কোনো বিবাহিত বোন তার জায়গাটুকু ছেড়ে দেয় তাহলে যেনো এতে আপনজনদের কাছে তার উদারতা, মহানুভবতার পরিচয় প্রকাশ পায়। এমনকি বাপের বাড়িতে তার সম্মান, তার প্রতি তার ভাইদের ভালোবাসা আরো বেড়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্যও দেখা যায়।

আর এই সুযোগটাকেই খুব ভালোভাবে কাজে লাগায় অন্যরা। তারা মনে করে এটিই স্বাভাবিক। অমুক তো একটা কিছুও নেয়নি বাপের বাড়ি থেকে, কিন্তু আমার বোন তো ঠিকই নিচ্ছে। আর তখনই শুরু হয়ে যায় নিজের অধিকার দাবি করে বসা বোনটির প্রতি ক্ষোভ, অসন্তোষ। এমনকি সেই বোনকে তখন স্বার্থপর, লোভী বানিয়ে ফেলতেও কোনো দ্বিধা কাজ করে না। হোক সেটা সামনাসামনি বলা বা পেছন থেকে বলা।

আর এই সুযোগটা করে দিচ্ছি কিন্তু আমরা মেয়েরাই!! আমরা হয়তো লাগবে না ভেবে নিজের অংশটুকু ছেড়ে দিচ্ছি। হয়তো পেছনে এরকম যুক্তিই থাকে আমাদের যে, কোনো অভাব না থাকার পরও যদি আমি ভাইদের না দিয়ে নিজে ভোগ করি তবে সেটা হবে দৃষ্টিকটু। লোকে আমায় স্বার্থপর, লোভী বলবে। আর এরকম ভাবনা কেনো মাথায় আসে আমাদের? কারণ আমরা দেখেছি বাস্তবে তাই-ই হয়। তাই অনেক সময় এমনও হয় যে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজের সুনাম ধরে রাখতে বা ভালো সাজতে আমরা নিজ জায়গাটুকু ছেড়ে দিই।

কিন্তু ভুলটা আমাদের এখান থেকেই শুরু হয়। কারণ এটি কোনো বিলাসিতার কিছু নয়। এটি আমাদের অধিকার। আমি যখন আমার দুর্নাম রটবার ভয়ে আমার নিজের অধিকারটুকু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে ভাইদের সুযোগ দিচ্ছি ; তাদের সুযোগ দিচ্ছি যাতে তারা আমার প্রাপ্য, আমার অধিকারকে পরোক্ষভাবে ছিনিয়ে নিয়ে ভোগ করতে পারে , তার মানে আমি আমার সাথে সাথে আরও অনেকের অধিকার খর্ব করছি। তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করছি।

কারণ আমার এই উদারতাকে পুঁজি ধরেই অন্যান্য পরিবারের মেয়েদের কথা শোনানো হবে। আমার ছেড়ে আসার এই উদারতা হবে অন্য একটি মেয়ের দিকে আঙ্গুল তোলার কারণ।

আমি হয়তো প্রচণ্ড বিত্তশালী হওয়ায় চাইবো আমার তুলনামূলক খারাপ অবস্থাসম্পন্ন ভাইটিকে দান করে যেতে। সেখানে দোষের কিছু নেই। আমরা তো একে অপরকেই সাহায্য করবো। কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা এখানেই ভুলটা বোঝেন।
তখন তাদের উল্টো ইচ্ছে হয়, ‘যদি আমাদের বোনও ছেড়ে দিতো!’ কিন্তু এটাই অন্যায়। কারণ আপনার এমন ইচ্ছে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে।

এখনও এমন ঘটনা ঘটে যেখানে বোনদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই মনে করে না ভাইয়েরা। বোনের বিবাহিত সচ্ছল জীবন দেখে তারা মনে করে বসে তাদের বোনটি তার অধিকারটুকু ভাইদের দিয়ে যাবে। এবং দেখা যায় এমনটা ভেবে বোনের অস্তিত্বকে বিন্দুমাত্র সম্মানও না দেখিয়েই সবকিছু ভাগ করে ফেলে। আর এজন্য আমরাই দায়ী। আমরা লোকসম্মান বাড়াতে গিয়ে নিজেদের অধিকার নিজেরাই নষ্ট করি। আর এজন্যই এরকম ঘটনা গুলো ঘটবার সুযোগ ঠিকই রয়ে তাই দোষটা আমাদেরই আমরা যারা নিজেরা ভালো সাজতে গিয়ে অন্যদের অধিকার খর্ব করছি।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.