বিচ্ছেদ হলেই প্রাক্তনের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটাতে হবে?

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

আজকালকার প্রেমিক-প্রেমিকাদের একটা কাজ করতে প্রায়ই দেখি। নিজেদের মধ্যে যেকোনো কারণে মনোমালিন্য কিংবা সাময়িক ব্রেকআপ হলেই, পরিচিত মহলে পরস্পরের নামে যাচ্ছেতাই কথা ছড়াতে শুরু করে দেয় তারা। হয়তো বলে, “জানিস, ও কত বড় চিটার! আমাকে রেখে অমুকের সাথে, তমুকের সাথে ফ্লার্ট করে বেড়ায়।” কিংবা হয়তো শুধু মুখের কথাতেই থেমে না গিয়ে, নিজেদের একান্ত গোপন চ্যাট কনভারসেশনের স্ক্রিনশটও জনে জনে বিলি করতে থাকে। প্রমাণ করে দেয়, তাদের প্রেমিক/প্রেমিকা আসলেই কত খারাপ।

তবে মজার ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন প্রেমিক-প্রেমিকারা কদিনের মধ্যেই আবার এক হয়ে যায়। পুরনো সব বিভেদ ভুলে গিয়ে, তারা আবার চুটিয়ে প্রেম করতে শুরু করে দেয়। সবখানে ফের তাদেরকে একসাথে দেখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অন্যকে ট্যাগ করে বিভিন্ন রোমান্টিক ছবি কিংবা স্ট্যাটাসও তারা পোস্ট করতে থাকে।

এই জায়গাটায় এসেই আমার বড় একটা খটকা লাগে। এরাই না মাত্র কিছুদিন আগে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রকাশ্যে একে অন্যের চরিত্রকে উলঙ্গ করে দেয়ার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল? এরাই না হেন বাজে কথা নেই যা একে অন্যের নামে বলেনি? তাহলে আজ এরাই কীভাবে আবার প্যাচআপ করে ফেললো, এমন ভাব দেখাতে শুরু করে দিল যে কোনোকালে এদের মাঝে কিছু হয়ইনি!

না, একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে সকল মান-অভিমান পিছনে ফেলে নতুন করে সম্পর্ক শুরু করতে দেখে আমার হিংসা হয় না। বরং ভালোই লাগে। কিন্তু যে জিনিসটা খারাপ লাগে, কিংবা বলা যায় যে জিনিসটা দেখে প্রচণ্ড ঘেন্না হয়, বিবমিষার ভাব হয়, সেটা হলো তাদের সম্পর্কের হিপোক্রেসি। তাদের সম্পর্কের ভিত কি এতটাই ঠুনকো যে, কিছু একটা হলেই তারা আশেপাশের সবার কাছে নিজেদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-বিবাদের কথা অতিরঞ্জিত করে বলে বেড়াতে পারে! আবার তাদের এই অতিরঞ্জনও কি এতটাই ক্ষণস্থায়ী যে, দুদিন পরেই পুনরায় তারা সেই দুই দেহে এক প্রাণ হয়ে যেতে পারে!

এ ধরনের সম্পর্ক দেখলে বাস্তবিকই আমার গা গুলোয়। এ ধরনের সম্পর্কের সততা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে। কেননা সত্যিই কি একটা সম্পর্কে কোনো গভীরতা থাকে, যদি সাময়িক মান-অভিমানের ফলেই ভালোবাসার আবেগ ভুলে গিয়ে সবার কাছে একে অপরের বিরুদ্ধে অকথা-কুকথা ছড়ানোর ইচ্ছা জাগে? তাহলে কি এই প্রেমিক-প্রেমিকাদের মাঝে আদৌ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বলতে কিছু আছে? কিংবা এই প্রেমিক-প্রেমিকারা কি আদৌ নিজেদের সম্পর্ককে খুব একটা মূল্য দেয়, যখন তারা নিজেদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতার কথাও জনে জনে উন্মুক্ত করে দিতে দ্বিধাবোধ করে না?

একটা রোমান্টিক সম্পর্ক প্রকাশ্যে হোক, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। প্রেমিক-প্রেমিকা রোজ রোজ ডেটে যাক কী ক্যাম্পাসে সবার সামনে হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াক অথবা ফেসবুকে “আই লাভ ইউ বেবি” ক্যাপশন দিয়ে ছবি আপলোড করুক… এমন যা খুশি তারা করুক। এগুলো তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা। তারা তো প্রেমই করছে, কোনো অপরাধ নয় যে এসব কাজ লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হবে। আমার আপত্তি হলো, তাদের যখন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ইচ্ছা আছেই, তাহলে একটু কিছু হলেই কেন তারা তাদের ব্যক্তিগত সব হিসাব-নিকাশ সবার সামনে ফাঁস করে দেবে! একটা ওপেন রিলেশনশিপে থাকা মানেই কি তাতে কোনো প্রাইভেসিই থাকবে না? সম্পর্কের উত্থান-পতনের সবটাই সবাইকে দেখিয়ে বেড়াতে হবে?

আরো খারাপ লাগে যখন দেখি, গতকাল আমার কাছে এসে নিজের প্রেমিক/প্রেমিকার নামে হাজারটা গালমন্দ করা মানুষটাই আজ আবার সেই প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে ফের মিলে যাচ্ছে। মিলুক, সমস্যা নেই তাতে। কিন্তু আমার মনে তো সে ইতোমধ্যেই তার প্রেমিক/প্রেমিকার নামে খুবই নেতিবাচক কিছু ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমার কাছে কি তার আবার ব্যাপারটা পরিষ্কার করা দরকার না? কিংবা আরো যাদের যাদের কাছে গিয়ে সে এগুলো বলেছে, তাদের কাছে গিয়ে ভুলগুলো ভাঙানো দরকার না?

এটা অবশ্যই একটা অনেক বড় সমস্যা, যদি কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা নিজেদের মাঝে সমঝোতা করে আগের মতো এক হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু মাঝের সময়টায় তারা পরস্পরের ব্যাপারে যাদের কাছে গিয়ে গীবত গেয়েছে, আবার তাদের কাছে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝিগুলো পরিষ্কার করে না নেয়। কেননা তাহলে ওই বাইরের মানুষগুলোর মনে তাদের ব্যাপারে খারাপ ধারণাটা রয়েই যায়। পুনরায় তাদের প্রেম করে বেড়াতে দেখলেও বাইরের মানুষরা আড়ালে আবডালে তীর্যক হাসিই শুধু হাসে, আর নিজেরা নিজেরা মজা নিতে থাকে।

আমার কাছে এটা কখনোই কোনো সুস্থ সম্পর্কের নিদর্শন মনে হয় না যে আমি আমার প্রেমিকার সাথে যখন খুশি ভাব করব কিংবা আড়ি করব; অথচ বাইরের একজনের কাছে তার ব্যাপারে খারাপ খারাপ কথা বলে তার মানহানি করব, কিন্তু পরে আর সেই মান পুনরুদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেব না।

ইন ফ্যাক্ট, আমি তো কখনো আমার প্রেমিকার ব্যাপারে বাইরের মানুষের সামনে কোনো নেতিবাচক কথাই বলব না। আমাদের দুজনের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা হয়েও থাকে, এমনকি সেই সমস্যা যদি সমাধানের অযোগ্য কিছুও হয়, তবু তার সাথে আমার এতদিন একটা সম্পর্ক তো ছিলই। সেই সম্পর্কের খাতিরেই আমরা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে, পরস্পরকে যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে, আলাদা হয়ে যাব। এতদিন যাকে আমি ভালোবাসতাম, আজ ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে বলেই আমি কেন সবার সামনে তাকে অপমান করব, তার চরিত্রে কালি লাগাব? যদি এগুলো করি, তাহলে যে এটাও দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে, এতদিন তার সাথে আমার সম্পর্কটাও একদমই খাঁটি ছিল না, পুরোটাই ছিল লোক-দেখানো অভিনয়!

হ্যাঁ, একটা সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটার পর অবশ্যই মানসিকভাবে আমি অনেক দুর্বল, অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারি। তখন যন্ত্রণা কমানোর জন্য কারো সাথে আমার মনের কথা ভাগ করে নেয়ার বাসনা জাগতেই পারে। কিন্তু সেই কেউটা হবে আমার একেবারেই কাছের কেউ, যে শুধু আমার কথাগুলো শুনবে, আমাকে বা আমার প্রেমিকাকে জাজ করবে না, কিংবা আমি আমার প্রেমিকার ব্যাপারে কী কী নেতিবাচক কথা বলেছি, সেগুলো ভাইরাল করে দেবে না। সেই কেউটা হবে আমার খুব কাছের এক-দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিংবা পরিবারের সদস্য। এর বাইরে আর কেউই না।

জানি না আমার এই চিন্তাধারার সাথে অন্যদের চিন্তাধারা মিলবে কি না। বেশিরভাগ মানুষেরই না মেলা স্বাভাবিক। কেননা আমার দেখা আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষগুলোকেও দেখেছি, সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটার পর (হোক তা সাময়িক অথবা চিরস্থায়ী) তারা এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়ে যে, তাদের মাথায় আর কোনো যুক্তি-বুদ্ধি কাজ করে না। প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার ব্যাপারে জনে জনে খারাপ কথা ছড়িয়ে, তার ইমেজের বারোটা বাজানোই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের একটাবারও মনে হয় না, প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার নামে এসব কথা ছড়িয়ে তারা আসলে নিজেদের এতদিনের সম্পর্কটাকেই সবার সামনে খেলো করে তুলছে, হাসি-ঠাট্টার বিষয় বানিয়ে তুলছে।

যা-ই হোক, সব কথার শেষ কথা হলো, নিজেদের প্রেমিক/প্রেমিকা এবং নিজেদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে ন্যূনতম সম্মান করতে পারার মতো ম্যাচিউরিটি যাদের নেই, তাদের কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোই উচিৎ না।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 747
  •  
  •  
  •  
  •  
    747
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.