কষ্টের খোলা চিঠি ‘বেতন চাই আমার’

মালেকা আক্তার:

টেবিলে একটা চিরকুট লিখে রেখে এসেছি। ১, ২, ৩ তারিখের খাবার। এর মধ্যে আর রান্না হবে না। কেউ যেন রান্নার জন্য রান্নাঘরে না ঢোকে। আর সব খাবার আমার জন্য অর্ধেক রাখতে হবে।

‘আমি এখন এমনই হতে চাই’- এতো বছর সংসার করার পর এই উপলব্ধি হয়েছে। হ্যাঁ, পাওনাগুলো কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিতে হবে। এতোদিন তো শুধু হিসাব দিয়েই গিয়েছি। এবার আমিও আমার হিসাবগুলো বুঝে নিতে চাই। যেখানে শ্রম, ভালোবাসা, ত্যাগের কোনো মূল্য নেই, যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা নাই, সেখানে ভালোবাসা মানে আসলে কী?

ভালোবেসেই আমরা বিয়ে করেছিলাম। কী পাগলটাই না ছিলাম আমি তোমার জন্য! আমার কাছে তোমার কোন দোষ ছিল না। তুমি তো এমনই। এই আমি কী কখনো তোমাকে বুঝতে পেরেছি? না, পারিনি। যে তার জীবনসঙ্গীকে মনের কথা বলে না, কিছু বললেও না বোঝার ভান করে থাকে, তার কাছে কী ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা আছে?

দুজন দুজনের পারস্পরিক ভালো লাগা মন্দ লাগাকে সম্মান করতে হবে। পাশের মানুষটিকে সময় দিতে হবে। অন্তত মৌলিক চাহিদাগুলো বুঝতে হবে। এটুকু প্রত্যাশা করাও ভুল? তোমার ভেতরে কী কোন আবেগ আছে? ভালোবেসে একটি নাম দিয়েছিলে “সুতপা”। কই, কোনদিন তো আর আদর করে নামটি ধরে ডাকোনি? জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘সুতপা’ নামের অর্থ কী? বলেছিলে, অনেক তপস্যায় যা পাওয়া যায়। এই বুঝি তোমার তপস্যায় পাওয়া ধনের মূল্যায়ন?

এসব কিছু তো আগে মনে হয়নি আমার! আমি তোমার জগতে এতোটাই বিভোর ছিলাম! তুমি আমার কাছে যতটা বিশ্বস্ত ছিলে, ঠিক ততটাই অবিশ্বস্ত হলে কিছুদিন পর! প্রথম তুমি আমায় কষ্ট দিলে, আহা কী কষ্ট! তখন জেনেছি- আমার এই কচি বুকে শুধু তোমার বাস আর তোমার ওই বুকে শুধুই আমি আছি। মাত্র ক’টা দিন গেলো। তুমি আর একটা সম্পর্কে জড়ালে। তাও আমারই চোখের সামনে।

তুমি ওর জন্য পাগল হয়ে যেতে। সারা রাত জেগে তাস খেলা, গল্প করার ছলে সময় কাটাতে। সবাই যখম একসঙ্গে বেড়াতে যেতাম, আমাদের পেছনে ফেলে তোমরা দুজন একসঙ্গে হাঁটতে। শপিংয়ে যাওয়া থেকে একসাথে সিনেমা দেখা, সে কী মুগ্ধতা তোমাদের মাঝে। আমার কী সব চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো, নাকি এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিলো?

তুমি ঢাকায় পড়তে গিয়েছিলে। ময়মনসিংহে বাবার বাসায় থাকতাম। প্রতি শনিবার আমাদের কন্যা তার বাবার অপেক্ষায় জানালার শিক গলিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতো। তুমি কী পাষাণ হৃদয়ের বাবা হয়ে উঠেছিলে, শুধু রাতটা কোনমতে থেকে রোববার খুব ভোরে চলে আসতে। কত ব্যস্ততা ছিলো তোমার! আহা আমার লক্ষ্মী শান্ত মেয়েটা, হয়তো বাবাকে বলতে চাইতো- ‘বাবা, আজ তো তোমার ক্লাশ নেই। আমার সঙ্গে আজকের দিনটা থেকে যাও না!’ হ্যাঁ, আমি কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলাম কেন এবং কার আকর্ষণে তুমি চলে যেতে!

কত কেঁদেছি তোমার পা দুটো ধরে! কই, তোমার মন এতোটুকুও গলেনি! একটা ডায়েরি ভরে তুমিওকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছো। বিশ্বাস করো, এই বুকে তোমার দেওয়া অপমানের জ্বালা এখনো দাউ দাউ করে জ্বলছে। তখন লজ্জায় কাউকে বলতাম না। রাতে বিছানায় এসে তোমাকে চুপিচুপি বলতাম, বোঝাতে চাইতাম। কিছু বললেই তুমি প্রচণ্ড রেগে বলতে- ‘ও তোমার বোন।’ কথা আরেকটু বাড়াতেই তুমি আমাকে বিছানা থেকে ধাক্কা দিয়ে চলে যেতে বলেছিলে। কী অপমান, কী অপমান!

এই কী আমার ত্যাগের মূল্য? এই তোমাকে ভালোবেসে বাবা-মার অনুমতি না নিয়েই বিয়ে করেছিলাম। আমাকে বিদায় দিয়ে সেদিন আমার বাবা সারারাত কেঁদেছিলেন। কেনো? আমার পরীক্ষা চলছিল, এর মধ্যে তোমার আম্মা আমাদের সম্পর্কের বিষয় জেনে আমাকে যা-তা ভাষায় বকে আসলো। আমার পরীক্ষাই গোল্লায় গেলো। এই দুঃখে আমরা নিজেরাই বিয়ে করে ফেললাম। আজও ভাবি, তুমি কেন আমাকে বিয়ে করেছিলে? তুমি একটা লোভী, মিথ্যুক। তুমি আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে মোহে পড়েছিলে। বিবাহিত জীবনে আমার প্রতি, সংসারের প্রতি, সন্তানের প্রতি তোমার কোন দায়িত্বজ্ঞান ছিলো না। তারপর আবার নতুন নারীর প্রতি মোহ জন্ম নিয়েছে এবং অসংখ্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক করেছো। তুমি আসলে ফুলে ফুলে মধু খাওয়া ভ্রমর।

বিয়ের পর তখনও আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। তুমি আমাদের বাড়িতে যেয়ে খুব গর্ব করে উঁচু গলায় বললে- ‘ও তো এখন আমার বৌ!’ কী দায়িত্ব পালন করেছিলে বৌয়ের প্রতি? তুমি শুধু সুযোগ নিয়েছিলে। তখন আমার কাছে প্রেগনেন্সি কাঙ্ক্ষিত ছিল না। তারপর কী হয়েছিলো সে খোঁজ রেখেছিলে? অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রী কী খায়, তার বিশ্রাম দরকার কীনা! তোমার মা ভাতে সেদ্ধ করা আলু ছিলে দিতেন, তা দিয়ে দু’মুঠো ভাত খেতাম। তোমার মা যা দিতেন, যতটুকু দিতেন, ততটুকুই বরাদ্দ ছিলো। আমার চেহারা কী হয়েছিল তোমার মনে আছে? চুলগুলো সব ঝরে গেল, চেহারা লাবণ্যহীন। সন্তান জন্ম দিয়ে ক’দিন সোজা হয়ে হাঁটতে পারিনি। তারপর কী হলো? মেয়ের জন্মের আগের দিন দুই মাসের বেতন পেয়েছিলে। তোমার কী কোনো চিন্তাই ছিল না বৌয়ের সন্তান হবে এ নিয়ে? তার আগের রাতে সমস্ত বেতনের টাকা দিয়ে নিজের ও ভাই-বোনদের কাপড় কিনে চলে এলে। সেই রাতেই তোমার স্ত্রীর ডেলিভারির ব্যথা উঠলো। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে, একশত পঞ্চাশ টাকা হাতে নিয়ে। কী করতে পেরেছিলে এই টাকা দিয়ে? হাসপাতালে গিয়ে সে কী বঞ্চনা!

এসব আমার কিছুই মনে থাকতো না যদি তুমি ও তোমার পরিবারের লোক আমাকে উপযুক্ত সম্মান দিতে! তুমি ও তোমার পরিবারের প্রতি কোন কর্তব্যটা পালন করিনি, বলতে পারবে? তুমি আমাকে প্রতিটা কাছে বাধা দিয়েছো। আমার নিজস্ব কোনো ভালো লাগা মন্দ লাগার কোন দাম দাওনি। আমি তোমার কাছে একটা মানুষ ছিলাম না, বস্তু ছিলাম। আজ আমি এই পরাধীনতার শিকল খুলে, আমার ছোট ছোট স্বপ্নের কাছে চলে যেতে চাই।

এই কষ্টের জীবন ফেলে আমি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। আমার এই পরাধীন জীবন আর সহ্য হয় না। তোমার হুকুমের চাকর আর থাকতে চাই না। আমি নীল আকাশের নিচে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চাই, পাখির মত ডানা মেলে আমি উড়তে চাই, সবুজ খোলা মাঠে দু’ হাত মেলে দৌঁড়াতে চাই। তোমার সংসারে আমার শ্রমের বকেয়াগুলো ফেরত চাই।

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.