ধীরে ধীরে পুরুষতন্ত্রের বলি হয়ে যায় একজন পিতা

কানিজ আকলিমা সুলতানা:

তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন দরজার বাইরে। শোবারঘর, লেবার রুম বা অপারশন থিয়েটারের বাইরে রাজ্যের উৎকণ্ঠা নিয়ে। দাঁড়িয়ে থাকেন আর যে যা বলে আনতে দৌঁড়ে যান। একটু পর পর মুখটা দরজার কাছে নিয়ে যান। কী হলো! সব ঠিক আছে তো!

সময় হয়। নবজাতকের ভুবন ছড়ানো কান্নায় তিনি কেঁপে ওঠেন। ভোলানাথের মতো হাসেন। আবার সবার চোখের দিকে তাকিয়ে ঘোষণাকারীর কাছে আকুল হয়ে জানতে চান, বাচ্চার মা ঠিক আছে তো? বাচ্চার মা! বাচ্চার মা তার সঙ্গী। তাদের ভুবন গড়ার দুই কারিগরের একজন। মিশ্র অনুভূতি! আনন্দ উৎকণ্ঠায় কী অবস্থা তার মনের মধ্যে চলে কে জানে!

সবাই চলে গেলে মা-বাবা একসাথে বাচ্চাকে দেখে। তাদের মেলবন্ধনে তাদের নিজেদের সন্তান! কার মত দেখতে হয়েছে, কার মুখের আদলের সাথে মিল আছে খুঁজে বের করে। বাবার সাথে মিল তো বাবার হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে সন্তানের আচরণে, বুদ্ধিমত্তায়, পছন্দে তারা নিজেদের ছায়া, নিজের নিজের মা বাবার ছায়া খোঁজে!

তারপর দিনের রঙ একটু একটু করে ভিন্ন হয়ে থাকে। পুরুষতন্ত্রের বলি হয়ে বাবা আলাদা হতে থাকে। সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়টার তার যত্নের পুরোটা দায়িত্ব দিয়ে দেয়া হয় মাকে। আর বাবা প্রায় একাই নেয় অর্থকড়ি উপার্জনের দায়িত্ব। নাওয়া খাওয়া ধোওয়া মোছায় শিশু পায়না বাবার স্পর্শ। তার খাবার তৈরি, তার খেলনা গুছিয়ে রাখায়ও বাবা থাকেনা। বাবার ঘাড়ে ওঠার সময়টায়, আঙ্গুল ধরে হেঁটে বেড়াবার সময়টায় সন্তান দেখে বাবার অনুপস্থিতি, দেখে নির্লিপ্ত বা ব্যস্ত বিরক্ত মুখ। স্কুলের প্রয়োজনে, প্যারেন্টস মিটিং এ মা যায়, বাবা নয়। বাবা থাকে জীবনের গতি, নিশ্চয়তা এবং পরিচয় তৈরির জগতে। বাবা লড়তে থাকে সন্তানের স্বাচ্ছন্দ্য ও পাথেয় তৈরির কাজে। সে জগতটা বাইরের, সন্তানের কাছে অপরিচিত। তাই সন্তানের সাথে বাবার ঘনিষ্ঠতা ঘন হয়ে ওঠে না। আবার টিকে থাকার, টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে নিতে বাবা কখনও কখনও হয়ে ওঠে প্রবল পুরুষ। শিশু কুন্ঠিত থাকে বাবার প্রবলতায়। মায়ের বিশ্রামহীন জীবন, অভিমান, ফুঁসতে থাকা বা ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে চোখ মোছার দৃশ্যের জন্যও দায়ী হতে থাকে বাবা।

দিন যায়। বাবার কাজ ও দায়িত্ব কমে আসে, আর বাবা একা হতে থাকে। বয়স জমতে জমতে বয়সী বাবা শিশু হতে থাকে। তখন আঁকড়ে ধরতে চায় সন্তানদের। ভালোবাসা আর সহনশীলতা চায়। বিকেলের চায়ের কাপে, জীবনের অভিজ্ঞতার গল্পে, চলে যাওয়া দিনের জন্য তুমুল হাহাকারের সময় সন্তানকে কাছে চায়। অন্দরে ঢুকতে চায়। অংশ নিতে চায় কেন্দ্রবিন্দুতে। যারা আগে থেকে ঘরে বাইরে ছিল, তারা পেরে যায়। বাকিরা বুভুক্ষ হৃদয়ে চেয়ে থাকে বাইরের মানুষদের মতো। নিজেকে গুটিয়ে নেয় বা চাইতে চাইতে সময় ফুরিয়ে যায়।

বাবা চলে গেলে সন্তানরা তার পরিচয় আর অর্জনের কথা বলে, বলে আত্মত্যাগ আর বটবৃক্ষ হয়ে থাকার কথা, বাবাকে বুঝতে না পারার ব্যর্থতার কথা, বাবাকে ভালোবাসার কথা বলতে না পারার আক্ষেপের কথা।
সেসব শোনে অন্য মানুষ। বাবা শুনে যেতে পারে না সন্তানের কাছে তার প্রিয় থাকার গল্প। ব্যস্ত সন্তানের কাছ থেকে নিতে পারে না প্রাপ্য সেবাটুকু।

স্পর্শ, সেবা, ভালোবাসা সময় থাকতেই দিতে হয়। মেপে হিসেব করে নয়, পাওয়ার বিপরীতে দেয়ার যুক্তিতে নয়, নিঃশর্ত ভাবে দিতে হয়। বাবাকে ফর গ্র্যান্টেড ধরে নিয়ে নয়, আছে, থাকবে, হাসবে খাবে বেড়াবে, জোগাবে, ভরসা হবে বলে নয়, লেবার রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার অনুভবের কথা, আনন্দে, আগ্রহে, আশঙ্কায় কেঁপে ওঠা, দৌঁড়ে যেতে হোঁচট খেয়ে উল্টে পড়তে পড়তেও জরুরি ওষুধ কিনে আনা মানুষটার কথা মনে করেই দিতে হয়।

বাবাদেরও যশ ও অর্থের সাথে শেষ জীবনের জন্য সম্পর্ক সঞ্চয় করতে হয়। পরিবারের মানুষদের মুখের দিকে তাকানোর সময় বের করতে হয়। বাইরের জগতের সাথে অন্তর, অন্দরের মিলন ঘটাতে হয়। সন্তান ও তাদের মায়ের সাথে গহন গভীরে থাকতে হয় লেবার রুমের বাইরের সেই দিনটার কথা মনে করেই।

বাবা দিবসে সব বাবাদের শুভেচ্ছা।

শেয়ার করুন:
  • 624
  •  
  •  
  •  
  •  
    624
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.