‘বাবা দিবস’ – আমিই বাবা, আমিই মা!

নাসরীন রহমান:

‘পরিবার’ বলতে সবার মনে প্রথমেই যে ছবিই ভেসে উঠবে সেখানে বাবা, মা, সন্তানের মেলবন্ধনের সুন্দর একটি সংসার। যেখানে বাবা-মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা, দায়িত্ব, কর্তব্য থাকে, থাকে সন্তানেরও ভূমিকা। এই সুন্দর নিয়মের ছন্দপতন ঘটে যখন পরিবার থেকে বাবা অথবা মা কেউ একজন চলে যান। সেটা জাগতিক নিয়মেও বিদায় হতে পারে, আবার নানামুখী সমস্যা থেকেও হতে পারে। এরকম পরিবারগুলোকে সমাজবিজ্ঞানে ‘সিঙ্গেল প্যারেন্টিং ফ্যামিলি’ বা ‘একক অভিভাকত্বের সংসার’ বলা হয়।

‘একক অভিভাবকত্ব’ শব্দের মধ্যেই যেন রয়েছে বিষন্ন এক সুর! মন খারাপের বেদনা! একক অভিভাবকত্বে সঙ্গীর অনুপস্থিতিতে (মৃত্যু, ডিভোর্স) সন্তান পালনের কঠিন দায়িত্বটা যেকোনো একজনের কাঁধে এসে পড়ে। তবে সামাজিক বাস্তবতায় পুরুষের চাইতে নারীর জন্য ‘একক অভিভাবকত্ব’ অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং! যখন কোনো নারীকে একক অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিতে হয়, তখন তাঁকে বোঝাপড়া করতে হয় এই সমাজ, পরিবার, সন্তান সর্বোপরি নিজের সাথে!

সন্তানের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পুরো ও দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার দায়িত্ব এককভাবে নেওয়া ছাড়াও নিঃসঙ্গ জীবনের ক্লান্তি, হতাশা তো আছেই!
আছে অর্থনৈতিক চাপ!

নাজমা বেগম, তিন সন্তান নিয়ে থাকেন। স্বামীর মৃত্যুর পর হঠাৎ করে ঝড় নেমে আসে তার জীবনে! তিন সন্তানকে কী করে মানুষ করবেন, তাদের লেখাপড়ার খরব চালাবেন ভেবে চোখে সর্ষে ফুল দেখেন। স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজনেরা যৎ সামান্য সাহায্য করলেও তেমনভাবে, দীর্ঘমেয়াদে সাহায্যে আসতে পারে এমন কোনো উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেনি কেউ!

কিন্তু বলা হয় না যে নারী সর্বংসহা, তেমনি তিনিও জীবনের এই কঠিন সময়ে মনোবল হারাননি এতোটুকু, শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামলেছেন। প্রথমেই সন্তানদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে নিয়েছেন, কীভাবে সংসার চলবে? কত আয়? কত ব্যয় ইত্যাদি। তার সন্তানেরা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। নাজমা বেগমকে কি বিরুপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি? হয়েছে। একটি পরিবারে ‘কর্তা’ না থাকার অভাব পদে পদে বুঝেছেন তিনি। এক একটি সমস্যা এসে সামনে দাঁড়িয়েছে, আর বার বার স্বামীর কথা ভেবেছেন, ভেবেছেন তিনি থাকলে হয়তো জীবনটা আরও একটু সহজ হতো!

একা মা হিসেবে দায়িত্বের চাপ অবশ্যই অনেক বেশি ছিলো তার জন্য, একসঙ্গে ‘বাবা-মা’ দুই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁকে। সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিলো সন্তানেরা যাতে বাবার অভাব অনুভব না করে, অথবা বাবার শাসন ছাড়া বিগড়ে না যায় তা নিশ্চিত করা। তা করতে যেয়ে কখনও হয়েছেন কঠোর, কখনো কোমল!

নাজমা বেগমই নন শুধু, এমন অনেক ‘মা’ই আছেন যারা একক অভিভাবকত্বের দায়িত্বে। একক অভিভাবকত্বের ভূমিকায় যখন আসতে হয় একজন ‘মা’ কে, তখন তাঁকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল এবং মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী হতে হয়। কখনও কখনও হতে হয় কৌশলীও। তবে সন্তান লালন-পালনে একক অভিভাবকত্বের কিছু সমস্যাও দেখা যায়। যেমন,

কখনও কখনও একক অভিভাবকদের সন্তানকে নিয়ে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, অতিরিক্ত শাসন, অতিরিক্ত উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে একক অভিভাবক যদি হন নারী, তবে তাঁকে বাড়তি মানসিক চাপ বয়ে বেড়াতে হয় সামাজিক বাস্তবতার কারণেই!

এক্ষেত্রে একক অভিভাবক হিসেবে একজন ‘মা’কে প্রায়শই সন্তানকে অতিরিক্ত আগলে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখা, ভাবেন সন্তানেরা বাবা না থাকার কারণে হয়তো বিগড়ে যেতে পারে! শাসন নাও মানতে পারে এই আশংকায় আরও বেশি বেশি শাসন করেন!
যা সন্তানের জন্য সুফল এর চাইতে কুফলই বয়ে আনে।

অনেক সময় আবার সন্তান মায়ের শাসন মানতেও চায় না, একটু বড় হওয়ার পর নিজের মতামত গজায়!

সেক্ষেত্রে ‘মা’কে হতে হয় কৌশলী বা নিতে হয় আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য! মনে রাখতে হবে শাসনের কড়াকড়ি সন্তানকে বিগড়ে দিতে পারে তাই শুরু থেকেই সন্তানের সাথে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলাই উচিত; একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে সন্তানকে কিছু কিছু দায়িত্ব দেওয়া উচিত, সংসারের ব্যাপারে মতামত নেওয়া উচিত যাতে করে সে নিজেকে সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শিখে। আর এতে করে সন্তানের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয় জন্মে যা তার পরবর্তী জীবনে পথ চলায় সাহায্য করে।

শেষ কথা হচ্ছে, একক অভিভাবক হিসেবে সন্তানকে কতটুকু সময় দেবেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে কীভাবে সময়টা দিচ্ছেন। একসঙ্গে গল্প করা, মুভি দেখা, সন্তানের বন্ধুবান্ধব নিয়ে কথা বলা, সন্তানকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, -এ সবই গুণগত সময়ের অংশ। সন্তানের সাথে সেভাবেই সময় কাটানো উচিত একক অভিভাবকদের।

সর্বোপরি নিজের মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখা উচিত, একাকিত্ব যেন অভিভাবকদের গ্রাস না করে ফেলে সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.