বাবা দিবস ও বাবার প্রয়াণ দিবস যখন পাশাপাশি

মনিজা রহমান:

তখন আমি খুব ছোট। হামাগুড়ি দেই কিংবা বালিশে হেলান দিয়ে রাখলে কোনক্রমে বসে থাকতে পারি। ঘরের সামনে বিরাট বারান্দায় রাখা চকিতে বসে, মুখের লোল দিয়ে বল বানানো ছিল তখন আমার প্রিয় খেলা। উঠানের কোনায় রান্না ঘরে চেয়ারে আম্মা আর কুলসুম খালা ইফতার নিয়ে বসে আছেন। দুজনের চোখ উঠানের ওপাশে কাঠের দরজার দিকে। কখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হবে। আব্বা ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে খেলা শেষে বাড়িতে ফিরবেন! ওদিকে মাগরেবের আজানের সময় হয়ে গেছে!

কখনও ভোর রাতের স্বপ্নের মধ্যে আমি ঘটনাটা দেখতে পাই। স্বপ্ন, বাস্তব কিংবা কল্পনা সব মিলে কেমন একটা অনির্বচনীয় অনুভূতি হয়, ঠিক যেন অচেতন মনের সঙ্গে অবচেতন মন সংযোগ স্থাপন করে। পাঁচ-ছয় মাস বয়সের স্মৃতি কোন মানুষেরই থাকে না। কিন্তু বহুবার ভাবতে ভাবতে আমি যেন হাল্কা আবছায়ার মতো সবকিছু দেখতে পাই। এই যে আমি লিখছি কিংবা যে এই লেখাটি পড়ছেন, এক মুহূর্তের মধ্যে সেটা অতীত হয়ে যাবে। এভাবে যেতে যেতে কত দিন চলে গেল। দীর্ঘ ধূসর অতীতের স্মৃতি বাতায়নে বেশীরভাগ জায়গাই ধুলায় আচ্ছন্ন। অথচ এমন সব ঘটনা মনে পড়ে যেটা আমার মনে থাকার কথা নয়! বিশেষ দিবস এলে ধুলার আস্তরণ সরিয়ে সেই দিনগুলিকে ফিরে পাবার আকুল ইচ্ছা জাগে মনে।

আমার বাবা ২০০৪ সালের ২২ জুন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সেই হিসেবে এবার বাবা দিবস আর বাবার মৃত্যুবার্ষিকী একদম পাশাপাশি। আমার বাবা জীবিত থাকা অবস্থাতে বাবা দিবসের চল সেভাবে শুরু হয়নি। তবে আমরা যদি তখন উদযাপন করতাম, উনি খুব খুশী হতেন। কারণ সেই ছোটবেলা দেখেছি, অতি সামান্য আয়োজন হলেও আব্বা আমাদের সব ভাইবোনদের জন্মদিন পালন করতেন। যত সাধারণই হোক একটা কেক আনা হতো। মসজিদের ইমাম সাহেব এসে মিলাদ পড়াতেন। এভাবেই দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখা হতো।

উদার-প্রগতিশীল শব্দগুলো তখন সেভাবে ভাবিনি, তবে আমার আব্বা কখনও কোনদিন বলেননি- মাথায় কাপড় দাও, পূজা দেখতে যেও না, গরীব বলে ওর সঙ্গে মিশবে না। বরং এরকম কোন কথা যে থাকতে পারে সেটাই তখন ভাবিনি। শৈশব থেকে আমাদের মধ্যে উদারনৈতিক মনোভাবটা গড়ে দিয়েছিলেন। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়েই মুখে মুখে শিখে নিয়েছিলাম- রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী- দুই বিঘা জমি কিংবা জসীমউদ্দীনের কবর কবিতাটি। বাসার রাস্তা লাগোয়া বারান্দায় আমাদের দিয়ে অভিনয় করাতেন শেক্সপীয়ারের মার্চেন্ট অব ভেনিস।

আব্বার জীবনের একটাই ইচ্ছা ছিল তাঁর মেয়েরা সবাই চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। শুধু মেয়ে নয়, ভাগ্নী ও ভাইঝিদের জন্যেও তিনি ছিলেন সমান আন্তরিক। কেউ নাচতো কিংবা গাইতো, সবাইকে আব্বা উৎসাহ দিতেন। এখনও টেক্সাসে কিংবা ঢাকার ফরিদাবাদে বোনদের সঙ্গে যখন কথা বলি, সিংহভাগ কথাতেই থাকে তাদের মামার কথা, তাদের কাক্কুর কথা। আব্বার সমসাময়িক ক্রীড়া সংগঠক আনিসুর রহমান আমার সঙ্গে ফেসবুকে যুক্ত আছেন, তিনি সব কথার শেষে বলেন- ‘তোমার বাবা বলে বলছি না, মহিত ভাইয়ের মতো ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি।’

গর্ব করার মতো অনেক কিছু ছিল আব্বার জীবনে। ষাটের দশকে বাগেরহাটের বিখ্যাত পিসি কলেজের ভিপি ছিলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুর মহকুমা আওয়ামী লিগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, গেন্ডারিয়া ধুপখোলা মাঠে অবস্থিত পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইস্ট এন্ড ক্লাবের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এতোকিছুর পরেও আব্বা ছিলেন অতি সাদামাটা, সাধারণ। গেন্ডারিয়ায় তখন বাস কিংবা টেম্পু সার্ভিস ছিল না। কয়েক টাকা বাঁচানোর জন্য তপ্ত রোদের মধ্যে রেললাইন ধরে হেঁটে সায়েদাবাদ গিয়ে সেখান থেকে বাসে চড়তেন। দুইটা প্যান্ট কিংবা তিন/চারটা শার্ট দিয়ে চলতেন। অথচ আমার দাদাজান ছিলেন ওনার সময়ে পিরোজপুর শহরের সবচেয়ে ধনী মানুষ। ওনার ছেলেরা ছিল সবাই কৃপণ ধরনের, শৌখিনতা ছিল না তাদের জীবনে। আমার আব্বা তাঁর ৭২ বছরের জীবনে কখনও কক্সবাজার যাননি, বিয়ের পরে আমি কয়েক মাস মিরপুরে ছিলাম, তখন তিনি আমার সঙ্গে প্রথম চিড়িয়াখানা গিয়েছিলেন।

জীবনে বহুবার নানা ধরনের ব্যবসা করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন। যে কারণে নিজেকে মনে করতেন ব্যর্থ মানুষ। আর সেটাই নিয়তি মনে করতেন। সফল কেউ ওনার ঈর্ষার কারণ হয়নি। আব্বার ভাষায় ওনার জীবনের ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার এন্ড গাইড ছিলেন নসরুল্লাহ চাচা, উনি ইংল্যান্ডের কোন ছোট শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন, ঢাকায় এলে আমাদের বাসায় এসে দীর্ঘ সময় থাকতেন। আব্বাকে খুব স্নেহ করতেন। আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমেরিকার মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি জহুরুল হক কিংবা বাংলাদেশের আরেক লেখক আল কামাল আবদুল ওহাব চাচা আসতেন আমাদের বাসায়। আব্বা সব সময় বন্ধুদের সাফল্যে গর্বিত হতেন, সব সময় বড় মুখে তাদের কথা বলতেন, তাদের সাফল্যকে নিজের মনে করতেন। তরুণ বয়সে কলেজের দর্শনের হিন্দু অধ্যাপকের কথাকে আব্বা জীবনের ধ্যানজ্ঞান করেছিলেন- ‘প্লেইন লিভিং ও হাই থিংকিং।’

আমার দাদীজান বাগেরহাটের মেয়ে ছিলেন, অতি সুন্দরী বলে ওনার নাম ছিল ডালিম, কম বয়সে মারা যান। আব্বা ছিলেন ওনার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। দাদাজান পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তরুণ বয়সে মাকে হারানোর কারণে ছন্নছাড়া ভাবে বড় হয়ে ওঠেন আব্বা, রাজনীতি করেছেন, সমাজসেবা করেছেন, ক্রীড়া সংগঠকের কাজ করেছেন- অর্থাৎ সারাজীবন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন। দেরীতে বিয়ে করেছেন বলে বড় কন্যা ছিল তাঁর দুই চোখের মনি। দুই-তিন বছর বয়স থেকে আব্বার হাত ধরে সব জায়গায় যেতাম। এভাবে একদিন ক্রীড়া সংগঠক বাবার কন্যা ক্রীড়া সাংবাদিক হলো।

একদিকে মাগরেবের আজান দিচ্ছে, আব্বা তখন দরজায় কড়া নাড়ছেন। আব্বা যে এসেছে তাঁর পাঁচ/ছয় মাসের সেই শিশু কন্যাটি বুঝে ফেলতো। তার মুখের বল বানানোর আনন্দ তখন বেড়ে যেত। সেই বছর রোজার মাসে একদিন দুধওয়ালা আসতে দেরী করলো। আমি তখন মায়ের দুধের পাশাপাশি গরুর দুধ খেতাম। রোজা রাখার কারণে আম্মার দুধ পাচ্ছিলাম না। ওদিকে প্রায় দুপুর হয়ে যাচ্ছে। অথচ দুধওয়ালা আসছে না। ক্ষুধার কারণে আমার তখন কী কান্না! আব্বা বার বার দরজা খুলে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন। কোন কারণে সেদিন দুধওয়ালার আসতে দেরী হচ্ছিল। অবশেষে বেলা গড়িয়ে যখন সে আসলো, আব্বার তখন সেকি অগ্নিমূর্তি, রাগের চোটে এক ধাক্কা দিলেন দুধওয়ালাকে, সেই ধাক্কা খেয়ে লোকটা বাসার পাশে ড্রেনের ময়লা পানিতে গিয়ে পড়লো! আমার আব্বাকে কেউ কোনদিন এতো রাগ করতে দেখেনি। যে কারণে দুধওয়ালার চোখে ব্যথার চেয়ে বেশি ছিল বিস্ময়।

আমি দুধওয়ালার ড্রেনে পড়ে যাবার ঘটনা আমার বড় ছেলেকে জীবনে কতবার যে বলেছি, তার কোনো হিসেব নেই। আমাকে খুশি করার জন্য প্রতিবার সে হাসি মুখে শোনে। আর প্রতিবার বলার পরে আমি চোখের কোনে জমে থাকা পানি মুছি।

শেয়ার করুন:
  • 543
  •  
  •  
  •  
  •  
    543
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.