ডিজিটাল নিরাপত্তা, নাকি জননিপীড়ন?

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

বিদেশ বিভূঁইয়ে থেকেও ঘুম ভেঙে চোখ থাকে দেশের সংবাদ চ্যানেলে। কোথায় কতজন করোনায় আক্রান্ত হলো, কতজন মারা গেলো, কত লাশ বিনা জানাজায় দাফন হলো, কত বস্তা চাল চুরি গেলো, কত শিশু ধর্ষিত হলো এই করোনাকালেও! প্রতিদিনের এতো এতো খারাপ খবরকে ছাপিয়ে একটা খবর সত্যিই এতো হতাশা, এতো ক্ষোভ ছড়িয়ে গেল যে চুপ করে থাকা গেলো না। ‘সিরাজুম মুনিরা এবার বরখাস্ত হলেন চাকরি থেকে।’

তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাঁর চাকরি থাকা-যাওয়া নিঃসন্দেহে নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিবিধির ওপর। সে বিষয়ে জনসাধারণের কিছুই বলার নেই। কিন্তু তাঁকে কেনো চাকরি হারাতে হলো? তাঁর বিরুদ্ধে মামলা কেনো হবে? তিনি শিক্ষক হলেও এই দেশেরই জনগণ। তাঁর কি মত প্রকাশের অধিকার নেই? মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কেনো আইন দ্বারা বন্ধ করে দেওয়া হবে? কোনো সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় এহেন সংস্কৃতি নেই, যেখানে রাষ্ট্রচালকেরা সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে।

এই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক বলেই আমাদের শাসকেরা দাবি করেন। আমাদের রাষ্ট্রনেতাকে আমরা বলি গণতন্ত্রের মানসকন্যা। এমনই গণতন্ত্র আমাদের, যেখানে মানুষের কথা বলার অধিকার নেই। এই রাষ্ট্রের কিতাবি নাম –The Peoples Republic of Bangladesh। অথচ কাজীর গরুর মতো এই মালিকানা আমাদের নয়, এর প্রকৃত মালিক অন্য কেউ। আমরা প্রতিদিনই প্রত্যক্ষ করছি কীভাবে রাষ্ট্রের ‘প্রকৃত মালিকে’র কাছে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ‘কিতাবি মালিক’ নামের নীরিহ জনসাধারণ। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রাষ্ট্রের সেই ধর্ষণের এক আধুনিক হাতিয়ার।

ডিজিটাল নিরাপত্তার বহুল বিতর্কিত, আলোচিত ধারা ৫৭ অবলুপ্ত হলেও ২০১৮ এ সংশোধিত আইনে অন্যান্য ধারায় ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা সীমিত করেই রাখা হয়েছে। নতুন আইনের ধারা ২৫ (১) এ বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জ্ঞাতসারে এমন তথ্য প্রচার করেন যা কোনো ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন, অপদস্থ, অসম্মান করে, তা অপরাধ বলিয়া বিবেচিত হইবে। এবং যথারীতি বর্ণিত শাস্তির বিধানে তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন’।

একথা বলাই বাহুল্য, উপরোক্ত আইনের আলোকে সিরাজুম মুনিরা অপরাধ করেছেন বললে ভুল হবে, পাপ(!) করে ফেলেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে মহাপাতক! তিনি রাজন্যবর্গের মহান মন্ত্রীর নিন্দামন্দ করেছেন! হিরক রাজার দেশে কেনো এই বিরুদ্ধবাদ? এই দেশ শুধু গাইবে মহারাজের জয়গান। সকলে শুধু বলবে –‘জয়, রাজন্যবর্গের জয়’। আমাদের রাজরাজারা তো কোনো পাপ করেন না। তাঁরা সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে। যতো অপরাধই করুক, তাঁরা অপাপবিদ্ধ!

প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হচ্ছে, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এরশাদের মৃত্যুর পরেও আমাদের ফেসবুক সয়লাব হয়ে গিয়েছিল নিন্দার তাণ্ডবে। বিষোদগারের ভাষা আর শব্দচয়নও এহেন সীমা ছাড়িয়েছিল যে আমি ফেসবুকে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এ জাতীয় চর্চা আমাদের চারপাশে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলের মাঝেই দেখতে পাই। নিকট অতীতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীই যার বড় প্রমাণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ জাতীয় আচরণ যদি আইন দ্বারা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সে কি কেবলই শাসকগোষ্ঠীর সম্মান রক্ষার্থে নাকি রাষ্ট্রের অন্যান্য গুণীজন, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গও সেই আইনের সুফল পেতে পারেন? যদি আইন সকলের জন্য সমান হয়, সেক্ষেত্রে এরশাদের মৃত্যুর পরে যারা গালিগালাজ করেছিল তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত। তিনি যত খারাপ লোকই হোন, মৃত্যুবধি ক্ষমতাসীন দলের সাথেই থেকেছিলেন। একথা ভুলে গেলে চলবে কেন?

সমালোচনা এবং নেতিবাচক সমালোচনা অনেকাংশে আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক বৈশিষ্ট্য। কোনো ব্যক্তিকে আমার অপছন্দ হলেই আমি তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করবো কিনা এটা আমার ব্যক্তিগত অভিরুচি এবং পছন্দ-অপছন্দের বিষয়। একজন রাজনৈতিক নেতা, কিংবা একজন মন্ত্রীকে অনেক বেশি সমালোচনা সহ্য করতে হয়। সেটি নেতিবাচক হবার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা জনগণের প্রত্যাশা তাঁদের কাছে বিশাল, সেই প্রত্যাশায় ঘাটতি হলে ক্ষোভ জমবে, সেটা যেমন স্বাভাবিক, ক্ষোভ প্রকাশও স্বাভাবিক। আমাদের রাজনীতিকেরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন সমালোচনাযোগ্য কোনো কাজই তাঁরা করেন না? সেখানেই তাঁদের দ্বিধা। আইন করে, উৎপীড়ন করে মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা যায়, ক্ষমতা করায়ত্ত করা যায়, তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না মহারাজ!

অতীতেও অনেকেই এই আইসিটি অ্যাক্টের নির্দয় শিকার হয়েছেন, ভবিষ্যতেও হবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। সময়ের প্রবাহে আমাদের জীবনযাপনে পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রযুক্তি ছাড়া জীবন অচল। সুতরাং আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনিবার্যভাবেই দরকারী। তবে এই আইন আদতেই কি জনগণের নিরাপত্তা বিধান করছে সেইদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা ৩৯(১) এর সাথে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২৫(১)(ক) সরাসরি সাংঘর্ষিক। মানুষের বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রেই মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কঠাক্ষ করায় ব্যক্তিকে মামলার শিকার হতে হয়, চাকরি খোয়াতে হয়? স্বৈরতন্ত্রের মোড়কে এ কেমন গণতন্ত্র? নিজেদের সুরক্ষাকে আরও একটু পোক্ত করার লক্ষ্যে আপনারা আরও কিছু কাজ করতে পারেন হে মাননীয় নীতিনির্মাতাগণ। যেমন-

১। আপনাদের মানহানি ধারণার চৌহদ্দিটা একটু বাড়াতে হবে। আরও একটু দৃষ্টি প্রসারিত করে মগজ খরচ করে ঠিক কী কী হলে মানহানি হয় সেটার ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। কচু পাতায় সম্মান নিয়ে চলাফেরাটা খানিক বালখিল্যই মনে হয়।
২। ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে জনগণকে উৎপীড়ন না করে এই আইনের পুনঃ সংশোধনী এনে, ২৫ (১) ধারায় ‘কোনো ব্যক্তি’র স্থলে লিখুন ‘শাসক গোষ্ঠীর অতি সম্মানীয় ব্যক্তি’।
৩। সংবিধান থেকে ধারা ৩৯ (১) অবলুপ্ত করুন। নইলে এটি সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে।

এই লেখা লিখতে লিখতে আরও একটি নিউজ দেখলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী জাহিদুর রহমান একই অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এবং তাঁরও জামিন নামঞ্জুর হয়েছে।

‘বড় দুঃখে বলি, শোনো হে মহারাজ! রাষ্ট্রের মালিকানা তোমার আর মোরা দাসী হলেম আজ।‘

পরিশেষে বলি, কথা আমরা বলবোই, যতোই আইনের খাড়া মাথার ওপরে ঝুলুক। অন্যায়ের প্রতিবাদ হবেই। যে আঙুল আজ আমাদের দিকে তাক, বদলে গেলে সময় ঘুরেও যেতে পারে তা বিপরীতে! ধিক্কার জানাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। অবিলম্বে এই জননিপীড়নমূলক আইন বাতিল হোক, এর আওতায় সকল গ্রেফতারি পরোয়ানা তুলে নেওয়া হোক, সিরাজুম মুনিরা চাকরি ফিরে পাক। মুক্তি পাক মানুষের শাশ্বত চিন্তার স্বাধীনতা! প্রতিষ্ঠা পাক বিরুদ্ধবাদ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.