আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না এতো সহজে

সুপ্রীতি ধর:

দেশে বরাবরের মতোনই তুঘলকি কাণ্ডকারখানা চলছে। ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই সময়ে গত আড়াই মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দেশে অর্ধশত মামলা হয়েছে। গত তিন মাসে দুই শতাধিক আইডি বন্ধ এবং শতাধিক আইডি নজরদারিতে নেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। সতর্ক করা হয়েছে শতাধিক ব্যক্তিকে। করোনা বা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সমালোচনা করেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামি হয়েছেন অনেকে’। তো, এই হলো মোটামুটি তথ্য।

একদিকে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী আকার নেয়ার সময়ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল, প্রয়োজনীয় সময় হাতে পাওয়ার পরও কোনোরকম ব্যবস্থা নেয়নি, আবার যখন চারদিক থেকে চাপ সৃষ্টি হলো, তখন বলা হলো যে সবদিক থেকে প্রস্তুত আছে সরকার। করোনার চেয়েও শক্তিশালী এই সরকার, তাই ভয় নেই। ভয় যে নেই তা তো আমরা এখন প্রতিদিনই দেখছি। কী ভয়াবহ সব খেলা চললো সাধারণ মানুষকে নিয়ে। সরকার ধরেই নিয়েছিল এই করোনা ভাইরাস তাদের পুচ্ছটির নাগাল পাবে না, প্রয়োজনে তারা বিদেশে চলে যাবে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু বিধিবাম! একে একে সরকারের ‘তারকা’রা খসে পড়ছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে। দেশের বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার নগ্নরূপ উন্মোচিত হয়ে গেছে। এবং গত তিন মেয়াদে থেকেও সরকারের এতোটুকু হেলদোল নেই, জবাবদিহিতা নেই এই ভয়ংকর অব্যবস্থাপনা নিয়ে। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির যে মহোৎসব চালিয়েছে সরকারি দল, তারই কর্মফল ভোগ করছে এখন সবাই। একটা হাসপাতালও ওয়েল-ইকুইপড না, যেগুলো আছে তাও সাধারণের সাধ্যের বাইরে।

কিন্তু তাহলে কী হবে, এ নিয়ে রা করার উপায়টিও নেই। করলেই ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট দিয়ে একেকজনের টুঁটি চেপে ধরছে। কী প্রহসনটাই না হলো সাংবাদিক কাজলকে নিয়ে। প্রথমে তাকে গুম করা হলো, পরে হঠাত তাকে আবিষ্কার করা হলো সীমান্তে। নাটকের পর নাটক। করোনা মোকাবিলায় যখন সমস্ত দেশ ভারাক্রান্ত, যে যার মতোন কাজ করে যাচ্ছে, দাঁড়াচ্ছে একে অন্যের পাশে, তখনই আবার রাষ্ট্রচিন্তার দিদারকে, কার্টুনিস্ট কিশোরসহ তিনজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা সরকারের সমালোচনা করেছে। কার্টুনিস্ট কিশোর এমন কিছুই আঁকেনি, তার চেয়ে ঢের বেশি এঁকেছেস শিশির ভট্টাচার্যসহ আরও অনেকে। কিন্তু সেইসব আগের কথা, এখন আঁকলে খবর ছিল। আবার যারাই এসময় সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, খুবই নিয়ম মেনে সবার ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছানো হচ্ছিল, তাদের কাজের ওপরও আঘাত এসেছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন তার প্রমাণ। কেউ কোন ভালো কাজ করতে পারবে না, দেশের জন্য কিছু করতে পারবে না, সব করবে আওয়ামী লীগের লোকজন। তারা কতোটা কী করছে তাতো আমরা দেখছিই।

তোমরা বলবে সরকার গণতান্ত্রিক, দেশে বাক স্বাধীনতার সুবাতাস বইছে, আর মুখ বন্ধ করে রাখার সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখবে, এই তো গণতন্ত্র? প্রতিদিন যখন মানুষ স্বজনহারা হচ্ছে, একে একে করোনা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন সৈনিকদের যখন আমরা হারাচ্ছি, হাসপাতালের বেড, আইসিইউ’র অভাবে যখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে, তখন সরকারের এই দমন-পীড়ন আগেকার সময়গুলোকেও হার মানিয়েছে। আর আজকের এই পরিস্থিতির দায়ভার আমাদের সোকলড প্রগতিশীল গোষ্ঠীর ওপরও বর্তায়। এদের প্রশ্রয়েই সরকার এতো লাগামহীন হয়ে উঠেছে। সবাই যেন কেনা গোলাম হয়ে আছে, স্পিকটি নট হয়ে আছে সবাই। কী আশ্চর্য, দেশে কোনো বিবেকবান, প্রজ্ঞাবান কেউ আদৌ আছে এখন, যারা সরকারকে অন্তত ধমক দিয়ে বলতে পারে কিছু?

বিশ্বের কোনো দেশ এরকম সংকটময় মুহূর্তে জোচ্চুরি, দুর্নীতি করার কথা ভাবতেও পারছে না, অথচ নকল মাস্ক, পিপিই কেলেংকারির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতকে আরও পোক্ত করার অভিপ্রায় নিয়ে বিশাল বড় বাজেট পেশ করা হলো। এসময় যখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতকে বড়বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত ছিল, তখন কাদের এই গোবর মস্তিষ্ক থেকে এরকম বাজেট উপস্থাপন করা হলো? শুধু তাই না, এমন সময়ে যখন সাধারণ মানুষের ভিতরে হাহাকার ছড়িয়ে যাচ্ছে, চাকরিচ্যুতি হচ্ছে হাজার হাজার, আর কদিন পরই যখন এর ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়বে পুরো দেশ, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন বাড়ানোর নির্দেশ এলো। এটা কি বেতন বাড়ানোর সময়? বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো যখন অন্যান্য খাত থেকে কৃচ্ছ্রতাসাধন করে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে সবাইকে বাঁচানোর তাগিদে, সেখানে বাংলাদেশ ভাবছে গুটিকয় মানুষের কথা। সাবাশ, এই না হলে উন্নয়নের জোয়ার?

ব্যাংকে দীর্ঘদিনের কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে একজন বন্ধু বলছিল, ব্যাংকিং খাতে যারা তুলনামূলক কম টাকা বেতন পায়, তাদের বেতনই আরও হ্রাস করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অথচ একেবারে মাথার দিকের শ’দেড়েক মানুষের লাখ লাখ টাকার বেতন থেকে করোনা সংকটের কারণে হ্রাস করলে মন কিছুই যায় আসতো না কারও, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাও এ যাত্রায় বেঁচে যেতো। তো, এসবকে তুঘলকি বলবো না তো কাকে বলবো?

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজুম মুনিরা প্রয়াত রাজনীতিক ও মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টের কারণে কেবল গ্রেফতারই হননি, বরখাস্তও হয়েছেন চাকরি থেকে। একই অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক কাজী জাহিদুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য একজন শিক্ষার্থী একটি জনপ্রিয় গানের একটি লাইন লেখায় তাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও খবর আসছে একইরকম, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে, কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে, মামলা তো হচ্ছেই। আবার আরেক কাঠি সরেস হয়ে ফেসবুকে, ইনবক্সে মামলা-হামলার হুমকি-ধামকিও আছে। এমনকি বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ‘দেশে ফিরতে দেয়া হবে না’ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেয়া হচ্ছে। একেবারেই কিছু করা না গেলে পোস্টদাতাদের ব্যক্তিগত নাজুক ইস্যু নিয়ে অপমান করা হচ্ছে।

এই হচ্ছে মোটামুটি আজকের ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশের অবস্থা।

মূলত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তার’ নামে আইনের যে খড়গ জনগণের মাথায় ঝুলানো হয়েছে, এবং যার বলে যখন তখন লোকজনকে গ্রেফতার করে হয়রানি করা হচ্ছে, চাকরি থেকে, ছাত্রত্ব থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, তাতে খুব শিগগিরই এমন সময় আসবে যে দলে দলে লোকজন এই আইন অমান্য করতে শুরু করবে। তখন কী করবে সরকার? সবাইকে ধরে ধরে গরাদে ভরবে? সবাইকে সব জায়গা থেকে বহিষ্কার করবে? বিদেশে অবস্থানরতদের দুতাবাসের মাধ্যমে হয়রানি করবে? মোট কথা, কী কী করবে তা জানতে চাই।

বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী এই আইন যদি বাতিল করা না হয় তাহলে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। সরকার নিজেই এর গর্তে পড়ে নিজের মরণ ডেকে আনবে, আমি নিশ্চিত। গণতন্ত্রের মূল উপাদানগুলোই যে সরকার চেনে না, সেখানে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক বলা ধৃষ্টতার নামান্তর।

আমরা কথা বলবো, প্রতিবাদের ভাষা হবে আমাদের পছন্দমতো, সরকারের পছন্দমতোন বা প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নয়, আমরা আমাদের এক্টিভিস্ট বন্ধু, যাদের জেলে পোরা হয়েছে অন্যায়ভাবে, তাদের পক্ষ হয়ে লড়েই যাবো। তাতে কার কী অবমাননা হবে বা মানহানি হবে, সেই ধার ধারবো না বলে দিচ্ছি। এটাই আমার বাকস্বাধীনতা, যা মোটেও স্বেচ্ছাচারিতা নয়। রাষ্ট্র নাকি গণতান্ত্রিক, অথচ মানুষের মুখে, কলমে ঠেসে ধরছে পান থেকে চুন খসতে না খসতেই, এ কেমন কথা! এ অন্যায় বেশিদিন চলতে দেয়া যায় না। বিচারবহির্ভুত হত্যা, গুম, অপহরণ অনেক সহ্য করা হয়েছে। সরকারে আসীন থেকে কারা এ কাজটি করছে সেটা তো খালি চোখেই সব পরিষ্কার, তো সেখানে অন্ধ সেজে থাকার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছি না।

কে কোন বিষয়ে কথা, কতটুকু বলবে রাষ্ট্র কোনো আইনের বলেই জনগণের কণ্ঠ রোধ করতে পারেন না। তীব্র নিন্দা জানিয়ে গেলাম সিরাজুম মুনিরাসহ
বিভিন্নজনকে কে গ্রেফতার এবং বরখাস্তের বিষয়ে। অবিলম্বে এই জননিপীড়নমূলক আইন বাতিল হোক, এবং চাকরি পুনর্বহাল হোক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.