কী পাইনি তার হিসাব মেলাতে চাই না

শান্তা মারিয়া:

আমার রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’। কিন্তু আমি নিজেকে সব সময় বলি ‘বি পজিটিভ’। মানে ‘ইতিবাচক চিন্তা করো’। বিশেষ করে এই কোভিড ১৯ মহামারীতে যখন জীবনটা একেবারে স্থবির হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ভীষণ রকম মানসিক চাপে ভুগছেন। কখন কার ঘাড়ে মৃত্যুর ভয়াল থাবা এসে পড়ে কে জানে।

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার পর তো বিষণ্ণতা নিয়ে একেবারে হুড়োহুড়ি চলছে। সকলেই বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যা এক্সপার্ট হয়ে গেছেন। এখানে একটা কথা বলে রাখি clinical depression যাদের আছে তাদের বেলায় কিন্তু উপদেশ, মোটিভেশনাল পোস্ট ইত্যাদি কোন কাজে আসবে না। তাদের উপদেশ দেয়া আর ক্যান্সারের রোগীকে চিকিৎসা না করে মনের জোরে ক্যান্সার ঝেড়ে ফেলতে বলা একই কথা। তাদের দরকার যথাযথ চিকিৎসা। clinical depression এবং এর শিকার রোগীদের চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়, এই রোগের সাধারণ লক্ষ্যণগুলো কী সে বিষয়ে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত ও লেখা, সাক্ষাৎকার বেশি করে প্রকাশ করতে হবে, প্রচার করতে হবে। গণমাধ্যম এদিকে অবশ্যই বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কোন কোন লক্ষ্যণ দেখা দিলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্য অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে, পরিবারের সদস্যদের কিভাবে আচরণ করতে হবে সে বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার দরকার।

কিন্তু সবাই তো আর clinical depression এর রোগী নন। তাদের জন্যই আমার এ কথাগুলো বলছি। আমি নিজে খুবই পজিটিভ চিন্তার মানুষ। আমার জীবনে যে সমস্যা আসেনি তা নয়। বাবার মৃত্যু, অর্থ-সংকট, মায়ের মানসিক অসুস্থতা, সন্তানের অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা, চাকরি হারানো, চাকরি খোঁজা, ব্যবসা করতে গিয়ে টাকার ক্ষতি, নিজের অসুস্থতা এগুলোর সবক’টাই জীবনের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন সময়ে আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। আবেগের টানাপোড়েন, খুব কাছের বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতাও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি অকারণ শত্রুতাও সহ্য করেছি। কিন্তু আমি কোনদিন জীবনের উপর বিশ্বাস হারাইনি। এবং খিটখিটে মেজাজেরও হয়ে যাইনি।

আমার মনের স্বাভাবিক গড়নটাই এমন যে খুব সাধারণ বিষয় থেকেও সুখ খুঁজে নিতে পারি। এই করোনা সংকটে প্রায় চার মাস ধরে ঘরের ভিতর বসে আছি। আমি এক্সট্রোভার্ট মানুষ। মানে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিতে, বেড়াতে, ভালোবাসি। আগের দিনে যাদের বলা হতো মজলিশী মানুষ। তো, সেই আমি চার মাস ধরে পুরোপুরি ঘরের ভিতর। কীভাবে সময় কাটছে? অনলাইনে চাকরি করছি, আর বাকি সময়টা দেদারসে বই পড়ছি, সিনেমা দেখছি, ডকুমেন্টারি দেখছি, গান শুনছি, বাড়ির সবাই মিলে লুডু খেলছি, একটা দুটো মজার খাবার রান্না করছি আর ফেসবুকে গুলতানি মারছি। হ্যাঁ লিখছিও। জানি আমি মোটেই ভালো লিখি না। তা ছাই ভস্ম যাই লিখি, নিজের আনন্দের জন্যই লিখি।

যখনই হতাশা দরজায় কড়া নেড়েছে, নিজেকে বলেছি ‘আরে তুমি অতি সাধারণ মানুষ। তোমার চেয়ে কত বেশি যোগ্যতা নিয়ে কত মানুষ কত দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে। যেটুকু পেয়েছো তার জন্যই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও’। সেই যে একদা ছিল না জুতা চরণ যুগলে.. সেই কবিতার মতো।

আমার মনে হয়, মানুষ যখন নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, নিজের চাওয়া পাওয়া সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়, নিজের সাফল্যের টার্গেট খুব বড় করে ধরে, নিজের দুঃখ কষ্ট নিয়ে বেশি চিন্তা করে তখনই হতাশা, বিষণ্নতা তাকে বেশি গ্রাস করতে চায়। বিশেষ করে মধ্য বয়সে মানে পঞ্চাশ বছর পার হওয়ার পর এই হতাশাগুলো বেশি কাজ করতে থাকে। দাম্পত্য জীবনের টানাপড়েনও অনেক সময় মধ্যবয়সে অশান্তি ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় দেখা যায় স্পাউস অন্যত্র কারও সঙ্গে ইনভলবড। তখনও কিন্তু হতাশা, অভিমানে আত্মহত্যা, মাদকাসক্ত হয়ে যাওয়াটা জাস্টিফায়েড নয়। বেঁচে থাকতে হয়, ভালো থাকার চেষ্টা করতে হয় নিজের জন্যই। আমি যে বেঁচে আছি সেটাই আমার বেঁচে থাকার সার্থকতা। আমি ঈশ্বরে প্রবলভাবে বিশ্বাসী। তাই ভাবি ঈশ্বর আমাকে যতটুকু দিয়েছেন ততোটুকুই আমার প্রাপ্য ছিল।
যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন, তাকেও যে হতাশায় ভুগতে হবে তা তো নয়। তিনি নিশ্চয়ই ভাবতে পারেন, যতক্ষণ বেঁচে আছেন, ততক্ষণই সাফল্য। টিকে থাকাটাই সার্থকতা, মরলেই তো সব শেষ।

মোট কথা, হেরে যাওয়া চলবে না কিছুতেই। বেঁচে থাকাটাই জয়লাভ।

আমি খুব ব্যাকডেটেড। তাই মনে করি, মানব সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করাই জীবনের চরম সার্থকতা। ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ ধরণী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। এসব পুরনো বিলুপ্তপ্রায় মূল্যবোধে বোকা আমি এখনও বিশ্বাস রাখি। তাই মনে করি যদি অন্যের সামান্য উপকারেও লাগতে পারি তাহলেই বেঁচে থাকাটা সার্থক। আমার নিজের কাছে মনে হয়, সমাজের সকলের কল্যাণে, বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় যদি একটু ভূমিকা রাখা যায়, সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা যায় তাহলে হতাশা দূর হয়ে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে কী পেলাম সেটা বড় কথা নয়, আমি কতোটা দিতে পারলাম সেটাই চিন্তা করা উচিত।

না, মাদার তেরেসা হওয়ার যোগ্যতা সকলের নেই। কিন্তু গৃহকর্মীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার, প্রতিবেশির সুখ-দুঃখে সামিল হওয়ার, পথে-ঘাটে, নিজের চারপাশে সকলের সঙ্গে একটু হেসে কথা বলা, একটু সহৃদয় ব্যবহার করার যোগ্যতা আমাদের সকলেরই আছে। গলির মোড়ের কুকুরটাকে দুটো বিস্কুট কিনে দেয়া, বাড়ির ব্যালকনিতে আসা চড়ুই পাখিটাকে রুটির টুকরো দেয়ার সামর্থ্য সকলেরই আছে। এটাও তো আমার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হতে পারে। এটাও তো আমাকে হতাশা কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

আসুন আজ একটা মজার হিসেব করি। কী পাইনি নয়, বরং কী পেয়েছি তার হিসেব করি। দেখবেন আমরা প্রত্যেকেই জীবনে কিছু না কিছু ভালো পেয়েছি। কেউ আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য, কেউ খ্যাতি, কেউ রূপ, কেউ স্বাস্থ্য, কেউ ধৈর্য্য, কেউ উচ্চ শিক্ষা, সুসন্তান, ভালো সঙ্গী, ভালো সহকর্মী, ভালো বন্ধু, ভালো বাবা, মা, ভাই বোন, আত্মীয়, প্রতিবেশি, চমৎকার একটা ব্যালকনি গার্ডেন, বই পড়ার অভ্যাস, গান গাওয়ার গুণ, ছবি আঁকতে পারা, মজা করে কথা বলতে পারা, ভালো রান্না করতে পারা, ভালো সেলাই, লিখতে পারা, ঘর সাজাতে জানা, নিজেকে সাজাতে জানা, এর এক বা একাধিক কিন্তু আমাদের জীবনে আছেই। কারও জীবনই লাগাতার ‘স্যাড স্টোরি’ নয়। জীবনে একটিও ভালো অভিজ্ঞতা হয়নি, একজন মানুষেরও ভালোবাসা পাননি, এমন কি কেউ সত্যিই আছেন? আমরা কি আমাদের সেই পাওয়াটাকেই বড় করে দেখতে পারি না?

আসুন না জীবনে সেই পাওয়াগুলোকেই বড় করে দেখি, অভিজ্ঞতাকেই সম্পদ ভাবি। অন্তত এই মহামারীর সময়টাতে হতাশা জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার চেষ্টা করি।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

যাবার দিনে এই কথাটি
বলে যেন যাই–
যা দেখেছি যা পেয়েছি
তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিঃসমুদ্র-মাঝে
যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি
ধন্য আমি তাই–
যাবার দিনে এই কথাটি
জানিয়ে যেন যাই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.