কেমন হওয়া উচিৎ ভালোবাসার সম্পর্কের শুরুটা?

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

প্রেম নিয়ে বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ, “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার”। বহুল প্রচলিত বলতে শুধু মুখে মুখে প্রচলিতই না। যে কয়টি প্রবাদের ব্যবহারিক প্রয়োগও মানবজাতি সবচেয়ে বেশি করে থাকে, তার মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলেই কি প্রেমের ক্ষেত্রে সব কিছু ন্যায়সঙ্গত? কারো ভালোবাসা পেতে, কিংবা কারো সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য যা খুশি করা যায়?

এক বন্ধুর সাথে এ বিষয়টা নিয়ে কথা হচ্ছিল সেদিন। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে কি তাকে আর বিরক্ত না করে সরে আসাই ভালো না? প্রেমে সফল হওয়ার জন্য ওই মেয়ের পিছনে পড়ে থাকাটা কি নিজের আত্মমর্যাদার সাথে আপোস করা নয়?” উত্তরে আমার বন্ধু বলেছিল, “কখনো কখনো ভালোবাসায় আত্মমর্যাদার চেয়েও আবেগটা বড় হয়ে দাঁড়ায়।”

আমি যেহেতু আত্মমর্যাদার পক্ষপাতী, তাই চাইলে কোনো রকম যুক্তি-তর্কের ধার না ধেরে এক বাক্যেই ওর এ কথাটিকে নাকচ করে দিতে পারি। কিন্তু সেটি বোধহয় ঠিক না। কারণ এতে আমার অবস্থানটা নিজের কাছে হয়তো অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু বিপরীত মানসিকতার অধিকারী যারা, তারা কোন বোধ ও ধারণা থেকে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়, সেটা উপলব্ধি করা যায় না।

তাই আবেগের বিষয়টা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা যাক। আসলেই তো, প্রেম-ভালোবাসার মতো বিষয়গুলো যতটা না মানবমনের যুক্তি-বুদ্ধির জায়গা থেকে উৎসারিত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি হয় আবেগের জায়গা থেকে। আবেগতাড়িত হয়েই তো একটা মানুষের আরেকটা মানুষের প্রতি এত তীব্র অনুভূতি সঞ্চারিত হয় যে, অনেক সময় এমনটাও মনে হয়, ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, ওকে না পেলে আমার জগৎ সংসার সবই তুচ্ছ হয়ে যাবে।

যে আবেগের ফলে এমনকি নিজের জীবনটাকেও অপ্রয়োজনীয়, অকিঞ্চিৎকর মনে হয়, সেই আবেগ যে আত্মমর্যাদার কোনো তোয়াক্কাই করবে না, সেটা তো খুব স্বাভাবিক!

তাছাড়া এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ছোটবেলায় আমরা যেসব পপ-কালচারের সাথে পরিচিত হয়েছি, অর্থাৎ যেসব নাটক-সিনেমা দেখেছি কিংবা গল্প-উপন্যাস পড়েছি, সেগুলোতে প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে আবেগটাকেই মহিমান্বিত করা হয়েছে, কোনো একজনকে মনে ধরে গেলে তাকে পুরোপুরি নিজের করে পাওয়াকেই জীবনের একমাত্র সার্থকতা হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। সুতরাং এসব পপ-কালচার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই যে আবেগটাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে!

কিংবা যদি আত্মমর্যাদার কথাও চিন্তা করি, সেটার বেলায়ও আমি যে অনুভূতিটাকে আত্মমর্যাদা হিসেবে মনে করি, সবার ক্ষেত্রেও সেটাই আত্মমর্যাদা বলে বিবেচিত না-ও হতে পারে।

শুরুতে বলা যাক আমি কোন জিনিসটাকে আত্মমর্যাদা বলে মনে করি। আমার কাছে আত্মমর্যাদা মানে হলো, কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি এতোটা মোহগ্রস্ত, আবেগ আপ্লুত হয়ে না পড়া যে, সেটি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও, হ্যাংলার মতো সেটা পাওয়ার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকবো। এজন্য আমার কাছে মনে হয়, আমি কোনো মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার পর যদি সে এতে রাজি না হয়, তবে আমার উচিৎ তার সিদ্ধান্তকে যথোপযুক্ত সম্মান দেখানো, এবং নিজে থেকে আর তাকে এ প্রসঙ্গে বিরক্ত না করা।

আমার মনের অনুভূতি জানানোর জন্য একবার তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়াটা দরকার ছিল বটে, সেজন্য আমি তা করেছি। কিন্তু একবার ‘না’ শোনার পরও বারবার নানাভাবে চেষ্টা করে যাওয়া মানে হলো নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যাওয়া। এছাড়া ওই মেয়েটিরও যে আমার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, সেটা তো উপরি পাওনা।

এবার চিন্তা করা যাক বিপরীত মানসিকতার মানুষদের কথা, যাদের কাছে আত্মমর্যাদার সংজ্ঞাটাও একেবারে ভিন্ন। তাদের কাছে আত্মমর্যাদা বলতে বোঝায়, নিজে কিছু একটা চাওয়ার পরও তা না পেলে, যেকোনো মূল্যে সেটির প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, অন্যথায় নিজের ও আশেপাশের কাছে ছোট হয়ে গেছি মনে করা। ছোটবেলায় যেমন মায়ের কাছে দুই টাকা চেয়ে না পেলে অনেক অভিমান হতো, মনে হতো মা কত নিষ্ঠুর যে আমাকে এভাবে কষ্ট দিল, বড়বেলায় তেমন কোনো মেয়ে প্রেমের প্রস্তাবে অসম্মত হলেও মনে হওয়া, মেয়েটা আমাকে এভাবে অপমান করলো!

তো, এই অভিমান করা বা অপমানিত বোধ করার পরবর্তী ধাপ কী? ছোটবেলায় অনেক বাচ্চা অভিমান করে চুপ করে যেত। হয়তো একটু আধটু প্যাঁ পোঁ করত, কিন্তু পরক্ষণেই বিষয়টা ভুলে যেত। আবার কোনো কোনো বাচ্চা চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তুলত। তাকে ওই দুই টাকা দিতেই হবে। নইলে সে ভাত খাবে না। ঠিক তেমনই, কোনো মেয়ের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর অপমানিত ছেলেটা ওই ভদ্র বাচ্চার মতোই চুপ করে যেতে পারে, কিংবা সে দ্বিতীয় মানসিকতার অধিকারী হলে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, যে করেই হোক মেয়েটাকে আমার পেতেই হবে, না পেলে চলবেই না। যদি মেয়েটাকে না পাই, তা হবে আমার জন্য চরম মর্যাদা হানিকর।

তখন এ জাতীয় মানসিকতার ছেলেরা বিচিত্র সব কাজ করতে শুরু করে, যেগুলোর বেশিরভাগই তারা পপ-কালচার থেকে শিখেছে। মেয়েটাকে স্টক করতে শুরু করে, অর্থাৎ মেয়েটা যখন যেখানে যায় তার পিছু পিছু যায়। রাস্তা একটু ফাঁকা পেলেই মেয়েটাকে গিয়ে পুনরায় “আই লাভ ইউ” বলে, মেয়েটার হাত ধরার চেষ্টা করে। অনেকে আবার মেয়েটার স্কুল-কলেজ-কোচিং-ভার্সিটি ক্যাম্পাস কিংবা অফিস-বাসার সামনে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ মেয়েটার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবীর সাথে যোগাযোগ করে তার সাহায্য নেয়। তার মারফত মেয়েটার কাছে লাভ লেটার, ফুল, চকলেটসহ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী পাঠাতে থাকে। এই সব কাজকেই তারা অত্যন্ত রোমান্টিক বলে মনে করে। কেননা তাদের প্রিয় নায়ককেও যে তারা এসব কাজই করতে দেখেছে!

এদিকে এখন যেহেতু তথ্য-প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হয়েছে, তাই মেয়েটার মন জয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে অনলাইনেও। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা মেয়েটাকে সমানে মেসেজ দিতে থাকা, কল করতে থাকা, ওই নম্বর বা আইডিতে ব্লক খেলে অন্য নাম্বার বা ফেক আইডি খুলে আবারো মেসেজ দেয়া, কল দেয়া, এগুলো সবই চলতে থাকে। এদিকে মেয়েটার পাবলিক পোস্টে গিয়েও সবার সামনে “আই লাভ ইউ” বলার মতো ‘সাহসী’ কাজও কেউ কেউ করে থাকে।

আবারও বলছি, এগুলো সবই তারা করে খুব রোমান্টিক কিছু করা হচ্ছে ভেবে। কেননা তাদের প্রিয় নায়ক শাহরুখ-সালমান-আমিররাও এসব কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে তাদের ধারণা হয়েছে, সিনেমার নায়করা যেমন শেষ দৃশ্যে ঠিকই নায়িকাকে পেয়ে যায়, এবং তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষিত হয়, তেমনই তাদেরও এই কাজগুলো করা খুবই সমীচীন।

এতক্ষণ তো স্রেফ আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিহীন কর্মকাণ্ডের কথাই বললাম। অথচ পপ-কালচারে, এমনকি ওই শাহরুখ-সালমান-আমিরদের প্রথম দিককার অনেক সিনেমাতেও কিন্তু দেখানো হয়েছে যে চাইলে নায়ক এক ঘর লোকের সামনে নায়িকাকে ফ্লার্ট করার নামে তাকে হ্যারাস করতে পারে, বিনা অনুমতিতে তার শরীর স্পর্শ করতে পারে, এমনকি তাকে জাপটে ধরতে বা কোলে তুলে নিতেও পারে। কথায় আছে না, “এন্ড জাস্টিফাইস দ্য মিনস,” এ যেন ঠিক তা-ই। যেহেতু মেয়েটার মন জয় করা, তাকে ভালোবেসে “হ্যাপিলি এভার আফটার” হওয়াই চূড়ান্ত লক্ষ্য, তাই সে লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তে এরকম দুই-একটা ‘বাড়াবাড়ি’ করা যেতেই পারে!

এবার এসব ছেলেরা যে মেয়েদের মন বোঝে না, সে দাবিও করা যাবে না। বরং এ ধরনের ছেলেরা মেয়েদের মন একটু বেশিই বোঝে! মেয়েদের মন সম্পর্কে তাদের মনে বেশ কিছু শক্তপোক্ত ধারণা রয়েছে।

প্রথমত, মেয়েদের ‘না’ মানেই ‘হ্যাঁ’। অর্থাৎ কোনো মেয়ে ‘না’ বললেও, আসলে সে ‘হ্যাঁ’-ই বুঝিয়েছে। শুধু লজ্জা পায় বলে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলতে পারেনি। তাই শুরুতে ‘না’ বললেও আমাদেরকে ওই মেয়ের পিছনে লেগে থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মেয়েরা ভীতু-কাপুরুষ ছেলে পছন্দ করে না, তাদের পছন্দ আত্মবিশ্বাসী-পুরুষালি ছেলে। ভীতু-কাপুরুষ কারা? যারা এক-আধবার প্রত্যাখ্যাত হয়েই চুপ করে যায়। আর আত্মবিশ্বাসী-পুরুষালী হলো তারা, যারা জানে একসময় না একসময় মেয়েটা ঠিকই রাজি হবে, সুতরাং চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

তৃতীয়ত, মেয়েরা চায় কোনো ছেলে তাকে জিতে নিক, ঠিক যেমন সিনেমায় নায়করা নায়িকাকে জিতে নেয়। অর্থাৎ সিনেমায় যেমন দেখানো হয় নায়িকা কোনো প্রতিযোগিতার ট্রফি, যেটা জয়ের জন্য নায়ক সকল বিরুদ্ধ শক্তি ও প্রতিবন্ধকতাকে হার মানাচ্ছে, আমাদেরকেও সেভাবেই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে; হারার আগে হার মেনে নিলে চলবে না।

এসব কারণেই দেখা যায়, প্রেমকে যুদ্ধ মনে করা ছেলেরা একবার-দুইবার-তিনবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও হাল ছেড়ে দেয় না। কোনো মেয়ের পেছনে চিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে। এমনকি তথাকথিত রোমান্টিকতা প্রদর্শন করতে গিয়ে চূড়ান্ত রকমের হ্যারাসমেন্টও করে মেয়েটাকে।

তবে এতোক্ষণ যা বললাম, এ জাতীয় মানসিকতা কি মনেপ্রাণে ছেলেদের একাংশই কেবল ধারণ করে? বোধ হয় না। কারণ আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক যেমন অনেক ছেলে, তেমনই অনেক মেয়েও। তাছাড়া ছেলেরা যেমন সমাজে প্রচলিত ধারণা কিংবা পপ-কালচার থেকে প্রভাবিত হয়ে এ ধরনের বিষাক্ত মানসিকতার চর্চা করে, সেসব সামাজিক ধারণা কিংবা পপ-কালচারের সান্নিধ্যে তো মেয়েরাও আসে, ফলে তাদের কেউ কেউও প্রভাবিত হয়। আমি একজন ছেলে হিসেবে মেয়েদের মনের কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারব না ঠিকই, তবে এটা অবশ্যই সত্যি যে নিজের চোখে কিছু কিছু মেয়েকেও এমন মানসিকতা পোষণ করতে দেখেছি।

যা-ই হোক, এই লেখার উদ্দেশ্য ছিল প্রেমের ব্যাপারে আমার নিজের কী ধারণা তা ভাগ করে নেয়া। সেটাই করা যাক। না, কোনোভাবেই আমি প্রেম-ভালোবাসাকে যুদ্ধের সমতুল্য মনে করি না, কিংবা এখানে সবকিছু ন্যায়সঙ্গত বলেও মনে করি না। আত্মমর্যাদার জায়গাটা তো আগেই পরিষ্কার করেছি। এছাড়াও আমার মনে হয়, জোর করে কখনোই কোনো সম্পর্ক হয় না। বিশেষত ভালোবাসার মতো সূক্ষ্ম আবেগিক সম্পর্ক তো নয়ই।

আমার কাছে ভালোবাসা বলতে যতটা না রোমান্স, তারচেয়ে বেশি হলো বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বকেই আমি মনে করি ভালোবাসার মূল ভিত্তি। এই বন্ধুত্বকে পাশ কাটিয়ে ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করা যায় না। আর যদি ক্ষেত্রবিশেষে যায়ও, সেই সম্পর্কের ভিতরটা হয় ফাঁপা, ঠুনকো।

একটা সম্পর্ক তখনই সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক হয়, যখন একটা মানুষ আরেকটা মানুষের মনকে বুঝতে ও অনুভব করতে পারে। একজন কোনো কথা কেন বলছে বা কোনো কাজ কেন করছে, ব্যাখ্যা করে না দিলেও সেগুলোর নেপথ্যের কারণ নিজে থেকেই বুঝতে পারে। একটা মানুষ আরেকটা মানুষের পছন্দ-অপছন্দগুলোকে সম্মান করে, স্বপ্নপূরণের পথে একে অন্যের পাশে থাকে, সাহায্য করে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিকতা, জীবনের লক্ষ্য সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ না হলেও, তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা অটল থাকে, ফলে জোরপূর্বক কোনো একজনকে কম্প্রোমাইজ করতে হয় না, আপনাআপনিই সেই কম্প্রোমাইজের জায়গাটা তৈরি হয়ে যায়।

সম্পর্কে এই বিষয়গুলো কখন উপস্থিত থাকে? যখন সম্পর্কটা হয় বন্ধুত্বের, কেবল শরীরী আকর্ষণ কিংবা একের উপর অন্যের কর্তৃত্বের নয়। এবং অতি অবশ্যই, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার তো নয়ই।

আমি আরো মনে করি, দিনের পর দিন কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার পেছনে লেগে থেকে যেমন ভালোবাসা হয় না, তেমনই কাউকে শুধু ‘ইমপ্রেস’ করার মাধ্যমেও ভালোবাসার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায় না। কেননা প্রাথমিক ইমপ্রেশন বা মুগ্ধতা কিছুদিন পরই উবে যায়, যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে আরো গভীরভাবে জানতে পারে।

প্রাথমিক ইমপ্রেশন অনেকটা ইলিউশনের মতো, সেন্সর্ড একটা বিষয়। নিজের খারাপগুলোকে ঢেকে রেখে, শুধু ভালোগুলোকে তুলে ধরা। যে আমার খারাপগুলোর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণা না রেখে শুধু আমার ভালোগুলো দেখেই আমার প্রেমে পড়ে গেল, সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার পর আমার খারাপগুলো একে একে বেরিয়ে এলে যদি সে নিজেকে প্রতারিত মনে করে, আমার প্রতি তার আবেগ, টান কমতে থাকে? তাই পারস্পরিক ভালো-মন্দের ব্যাপারে জেনেবুঝেই কোনো কমিটমেন্টে যাওয়া জরুরি, ঝোঁকের মাথায় নয়। আর এই পারস্পরিক জানাবোঝাটাও তখনই সম্ভব, যখন নিজেদের মধ্যে একটা নির্ভেজাল, অকপট বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

শুধু কারো সৃজনশীলতা বা কাজের জায়গার প্রেমে পড়ে একটা গোটা মানুষকে ভালোবাসার সিদ্ধান্ত নেয়াটাও নিতান্ত হঠকারি বলে মনে হয়। যেমন ধরুন আমি এই লেখাটা লিখলাম, এটা পড়ে কারো ভালো লাগল। তো এই ভালোলাগা শুধু লেখাতেই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক। লেখাকে ছাপিয়ে ব্যক্তি আমাকেও সমান ভালোলাগা যদি কারো মনে জন্মায়, তা সর্বৈব ভুল। একজন লেখায়, গানে, নাচে, অভিনয়ে কিংবা অন্য যেকোনো কিছুতে ভালো মানেই যে সে সামগ্রিকভাবেও ‘মানুষ’ হিসেবে ভালো, তা তো কখনোই নয়। সুতরাং ভালোবাসতে হলে মানুষটাকে ভালোবাসা দরকার, তার মনটাকে ভালোবাসা দরকার। শুধু তার গুণগুলোকে নয়। নইলে নিজের প্রত্যাশার সাথে বাস্তবতার ফারাকটা বেরিয়ে আসার পর নিজেকে প্রতারিত মনে হওয়াটা খুবই সম্ভব।

পরিশেষে আবারো বলছি, জোর করে, আবেগতাড়িত হয়ে ভালোবাসা কোনোভাবেই নয়। কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়েকে সত্যিই ভালোবাসে, তবে সেই ভালোবাসাকে একটা সম্পর্কে রূপান্তরের প্রচেষ্টার শুরুতেই থাকা উচিৎ মেয়েটার নিজস্ব ইচ্ছা-অনিছার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। মেয়েটা যদি রাজি না থাকে, সেখানেই ওই প্রচেষ্টায় ইতি টানা উচিৎ।

ঘটনাপ্রবাহের এক পর্যায়ে, কোনোরকম জোরজবরদস্তি ছাড়াও, না হওয়া ভালোবাসাটা হয়ে যাওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা থাকে। আমার প্রতি কোনো ভালোবাসা না থাকা মেয়েটা কোনো একদিন আমার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতেই পারে। কিন্তু আমি যদি একদম গোড়াতেই মেয়েটার সিদ্ধান্তকে অসম্মান জানাই, তাকে জোর করতে থাকি, তাহলে এক পর্যায়ে যদি একটা সম্পর্ক গড়েও ওঠে, পরবর্তীতে সেই সম্পর্কের প্রতি পদে পদেই কি পারস্পরিক অশ্রদ্ধা ও জোর খাটানোর ব্যাপার থাকবে না? ফলে সেই সম্পর্ক যে ফুলের সুবাস ছড়ানোর বদলে কাঁটায় কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত করবে উভয়ের হৃদয়কে, তা-ও বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.