জীবন যখন যেমন

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

বিয়ের মাত্র তিন মাস পর জানতে পারলাম আমি মা হতে যাচ্ছি। তখনও মনে হয় আমার গা থেকে নতুন বউয়ের গন্ধ যায়নি। অথচ আমি লাইফের তৃতীয় স্টেপে চলে আসলাম। দ্বিতীয় স্টেপ যেন বুঝতেই পারিনি। আমি জাস্ট একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আমার বড় মেয়ের জন্ম হলো। তার জন্মের সময় আমার বয়স ২১ বছর। ছেলের যখন জন্ম হয় তখন আমার বয়স ২৫ বছর। আর তৃতীয় বাচ্চাটা যখন হয়, তখন আমি ৩০ বছরের। এখন আমি ৩৬ বছরের, আর আমার বড় মেয়ের ১৫ বছর হতে চললো।

আমি বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু মা হওয়ার জন্য নয়। বাচ্চা কোলে নিয়ে আদর করা, খাওয়ানো, কয়েক ঘন্টা নিজের কাছে রাখা সত্যিই অনেক মজার, আনন্দের। কিন্তু দিনের পর দিন বাচ্চার জন্য রাত জাগা, হাগু-মুতু পরিষ্কার করা, কাঁথা ধোয়া, রান্না করা কি আসলেই সবসময় এতো আনন্দের থাকে? থাকে না। এর জন্য প্রস্তুতি দরকার হয়। শারীরিক এবং মানসিক। মা-বাবা দু’জনের জন্যই।

লকডাউনে আমরা প্রায়ই ছাদে যেতাম একটু রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য। একদিন ছাদে হাঁটছিলাম, আমার মেয়ে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললো, চল মা একসাথে হাঁটি। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কবে মেয়েটা বড় হয়ে গেল! আমার ছোট বোন যখন মাত্র এক বা দেড় বছরের, একদিন মা কোন কারণে আমাকে মেরেছিলো। আমি ছোট বোনের ছোট্ট হাত ধরে কান্না করছিলাম আর বলেছিলাম, “কেউ আমাকে ভালোবাসে না, তুই আমাকে অনেক ভালোবাসিস”।

আমার ছেলেটার বয়স যখন ৫ বছর মাত্র, এতো নরম আর তুলতুলে। একদম মাখনের মতো। সবার নয়নের মণি। যেদিন আমার ছোট্ট পরীটাকে বাসায় নিয়ে আসি হাসপাতাল থেকে, বাসায় এসে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরার পর মনে হলো, বাচ্চাটা যেন হঠাৎ করেই শক্ত হয়ে গেছে, মাখনের মতো ভাবটা আর নেই! আমি এতো অবাক হয়েছিলাম, বরকে বললাম, পোলাটা এতো শক্ত হয়ে গেল কেমনে? বর বললো, “পিচ্চিটা বেশি নরম যে তাই”। হঠাৎ করেই সবার নয়নের মনি ছেলেটা ভীষণ দুষ্টু হতে শুরু করলো। যে বাচ্চাকে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে বললে দাঁড়িয়ে থাকে, সে একটু একটু করে অবাধ্য হতে শুরু করলো। কারণ হলো, সবার মধ্যমনি তখন চেঞ্জ হয়ে ছোট্ট পরীটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। আর আমার ছোট বাচ্চা ছেলেটা হুট করেই বড়দের কাতারে পড়ে গেছে। আসলে সে বড়দের সাথেও মিশতে পারে না, ছোটদের সাথেও না। একদম বন্ধুহীন, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে বাচ্চাটা।নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কেউ এখন আর আগের মতো তাকে প্রায়োরিটি দেয় না, এটেনশন দেয় না। বাচ্চাটার সব কিছুতেই না, না। এটা করো না, বোন ব্যথা পাবে, ওটা করো না, বোন ব্যথা পাবে। পান থেকে চুন খসলেই ধুমধাম মাইর। এমনকি নিজের মায়ের সাথে সাথে দাদা মাসির কাছে কদর কমে গেল।

আস্তে আস্তে বাচ্চাটা আমার বিগড়ে যেতে শুরু করলো। এখন আর সহজে কোন কথা শোনানো যায় না। এক কথা দুই, তিনবার করে বলতে হয়। ছোট বা বড় বোন কারও সাথে বনিবনা হয় না সহজে। ছোট্ট পরীটা যখন বাসায় এসেছে তখন আমার ছেলেটাও নিশ্চয়ই ওর হাত ধরে চুপি চুপি কান্না করে বলেছিলো, “কেউ আমাকে ভালোবাসে না, তুই অনেক ভালোবাসিস”।

আমার মা বেশ নাদুস নুদুস টাইপ ছিলেন। দুপুরে ঘুমানোর সময় গরমে তিনি পেটের কাপড় সরিয়ে ঘুমাতেন। ঘর্মাক্ত তুলতুলে পেটটা ধরতে খুব আরাম লাগতো। কিন্তু মা ভীষণ বিরক্ত হতেন। কারণটা এখন বুঝি। আমার মেয়ে লম্বায় আরও বছর দুয়েক আগে আমাকে ছাড়িয়েছে। মেয়েটা এসে যখন জড়িয়ে ধরে হাঁসফাঁস লাগে। সেজন্যই বিরক্ত লাগে। আর আমার মেয়েটার মন খারাপ হয়ে যেতো। ওর ধারণা হচ্ছিল, ওকে আমি পছন্দ করি না।

স্বামী, বাচ্চা, সংসার, অফিস, এরপর ছোট বাচ্চা নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকতাম যে অন্য বাচ্চাগুলোর বোবা কান্না আমি শুনতে পাইনি। যখন ছোট বাচ্চাটাকে কোলে নিতো সবাই, আদর করতো, তখন অন্য বাচ্চা দুইটার চোখের আকুতি বুঝতে পারলেও আমি পারিনি তাদের মনের আশা পূরণ করতে। বড় মেয়েটা প্রায়ই এসে আগে জড়িয়ে ধরতো, চুমু খেতে চাইতো। কিন্তু আমি অন্যসব কাজ নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত থাকতাম যে ও আমাকে আদর করতে এলে বিরক্ত হয়ে যেতাম, ছেলেটার বেলায়ও তাই-ই হয়েছে। দু’জনেই শুধু অভিযোগ করে, “তুমি তো ওকেই বেশি ভালোবাসো!”

মা বাবা হওয়া কি এতোই সহজ? না, মোটেই সহজ না। সবাই যখন আমার বাসায় বেড়াতে এসে, “ওলে সোনা বাবু, ময়না বাবু বলে ছোট মেয়েটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে”। আমার ছেলেটাও একদম এতিমের মতো তাদের পিছন পিছন ঘুরে যেন তারা ওর উপরও আদরের বর্ষা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সেটা হয় না। সবাই ছোটটাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

আমার বড় মেয়ের বয়স যখন ১৪ বছর, টিনএজ, তখন আমাদের বাসায় ঝড় হয়, মেয়েটা কান্না করতে করতে অতল সাগরে ডুবতে থাকে। সে চায় দু’হাত দিয়ে কলাগাছের ভেলাটাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে। একবার এর কাছে, আরেকবার ওর কাছে ছোটাছুটি করে শান্ত করার চেষ্টা করে। হাপুস নয়নে নিঃশব্দে কান্না করতে থাকে। ঝড় তো ঠিকই শান্ত হয় এক সময়, কিন্তু মেয়েটার মনে যে হারানোর ভয়ের ছাপ পড়ে, সেটা কি মুছে যায়?

মেয়েটা এক কোরিয়ান গায়কের ভক্ত, তার ক্রাশ। সারাক্ষণ বিটিএস বিটিএস করে। আমি ওকে খুব খেপাতাম এটা নিয়ে। একদিন রাগ করে বলেছে, ধ্যাত আর বলবোই না তোমার কাছে। আরেকদিন আরেকটা ছেলের ছবি দেখিয়ে বলছিল, “আমার না এই ছেলেটাকে খুব ভালো লাগে”।
আমি জিজ্ঞেস করি, “বিদেশী?”
সে হাসে।
আমি বলি, “বিয়ে করবি?”
খুব অবাক হয়ে বলছে, আজব, বিয়ে করবো ক্যানো? ভালো লাগলেই কি বিয়ে করতে হয় নকি?
ওকে আমি জিগ্যেস করি, তুই কি জানিস, সেক্স সম্পর্কে? অনেক লজ্জা পেয়েছিলো। মাথা নিচু করে কাজ করতে করতে বলেছিলো, “হুম”।
আমি বললাম, কিছু জানার থাকলে আমাকে জিগ্যেস করিস। আমি প্রাকটিক্যাল করছি।
ধ্যাত মা, তুমি কি যে বলো না..!! অন্যের কাছ থেকে ভুল শোনার চেয়ে মায়ের কাছ থেকে সঠিক শোনাটা ভালো না? আমি বলি।
মেয়েটার যেদিন প্রথম পিরিয়ড হয়, ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভয় পাইছিস’?
ও বলেছে, “একটু পেয়েছি, কিন্তু তুমি তো আগেই বলে দিয়েছিলে, এজন্য প্যানিক হই নাই। তাছাড়া আরেকটা বান্ধবীর হয়েছে যখন দেখেছিলাম তো।সোজা পিটি ম্যাডামের কাছে চলে গেছি।”
এরকম টুকটাক আমাদের মা মেয়ের অনেক কনভারসেশন আছে।

বাচ্চাগুলো একটু একটু করে বড় হয়ে যাচ্ছে। এখন ওদের ভুল করার সময়। ভুল করবে, খুব স্বাভাবিক। মা বাবাদের যেটা করতে হবে, প্যানিক হওয়া যাবে না। আমরা প্যানিক হলে ওরা ভয় পেয়ে যাবে। আর বাচ্চারা ভয় পেলে কোনভাবেই পুরোপুরি সত্যিটা বলবে না। আমরা মা-বাবারা সঠিক সমাধানও দিতে পারবো না। আমি মেয়েকে প্রায়ই বলি, যা কিছুই হোক, মা-বাবাকে আগে বলবে। হয়তো মা- বাবা রাগ করবো, চিল্লাচিল্লি করবো, মাইরও দিতে পারি, কিন্তু যখন মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে আমরাই তোমাকে সঠিক সমাধান দিবো। এক্ষেত্রে মা-বাবার সাথে সাথে অন্য আত্মীয়রাও (খালা/ফুপু/মামা/ কাকা/দাদা- দাদী/নানা-নানী) এগিয়ে আসতে পারেন।

মা-বাবা যেমন সংসার, অফিস, বাজার, রান্না, ছোট বাচ্চাকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে, তেমন অন্যরা ছোট বাচ্চার চেয়ে বড় বাচ্চাদের দিকে নজর দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। অবশ্যই মা-বাবাদের জানাবেন। বাচ্চারা বেশির ভাগ সময় ভুল করে, কারণ তারা তাদের সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারে না, কারও সাথে আলোচনা করতে পারে না। বাচ্চাদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সেটা যে মা’ই করবেন তা কিন্তু নয়। বাবাও হতে পারেন, আবার অন্যান্য বিশ্বাসযোগ্য আত্মীয়ও হতে পারেন।

আমি এইচএসসি ২য় বর্ষ পর্যন্ত জানতামই না আন্ডার আর্মসের হেয়ার রিমুভালের ব্যাপারে, যে কারণে পরবর্তীতে বান্ধবীদের কাছে হাসির পাত্র হতে হয়েছে আমাকে। এসমস্ত সেন্সিটিভ ব্যাপার মা-বাবারই বলা উচিত বাচ্চাকে। বাচ্চাদের এটাও জানাতে হবে যে, মা-বাবা কষ্ট পাচ্ছেন তাদের কাজকর্মে।তাহলে যেকোনো কাজ করার আগে দশ বার চিন্তা করবে, মা-বাবা কষ্ট পাবে না তো!

আমি মেয়ের সাথে প্রায়ই আমার লাইফের গল্প করি। মেয়ে জানতে চায়, আমি প্রেম করেছি কিনা? আমি খুব সিরিয়াসভাবে ওকে বলি, চান্স পাই নাই। তোর দাদু-দিদা বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। তোর যদি কাউকে ভালো লাগে আমাকে বলিস।
মেয়ে বলে, বিয়েতে অনেক ঝামেলা, আমি বিয়েই করবো না।
আমি বলি প্রেম করতে অনেক মজা আছে, প্রেম করবি? মেয়ে বলে, দেখা যাক।

বাচ্চারা আসলে এটেনশন চায়। প্রশংসা চায়। দায়িত্ব চায়। এডভেঞ্চার চায়। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বাচ্চাদের আগ্রহ অনেক। সেই ব্যাপারগুলো ওদের সাথে আলাপ করা উচিত। ভালো-মন্দ বুঝতে ওদের সুবিধা হবে। তাদের পছন্দ-অপছন্দের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত, যাতে ওরা ভাবে ওদের মতামতের মূল্যায়ন হচ্ছে। বাইরে অন্যের কাছ থেকে জানার চেয়ে মা-বাবার কাছে জানাটা বেশি জরুরি। বাসার কাজে সংযুক্ত করা উচিত, পরবর্তীতে পথ চলতে সুবিধা হবে।

আমাদের সমাজে আসলে বিয়ে হচ্ছে, “সেক্স” করার বৈধ উপায়। এজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংসারগুলোর মধ্যে ভালোবাসার কমতি থাকে, যেটা থাকে সেটা হলো “নিয়তি” বলে মেনে নেয়া। নিজেদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সময় কাটানোর মতো সময় থাকে না। বিয়েটা হয়ই বৈধভাবে বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য। বাচ্চা জন্ম দেয়া হয়, কারণ ‘শাশুড়ি জোয়ান, বাচ্চা পাইলা দিবে, বোন আছে, বাচ্চা পাইলা দিবে, মামা/কাকা আছে, বাচ্চা পাইলা দিবে”।

আজব! একটা শিশুর জন্মের পর শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র তার মা-বাবাকে প্রয়োজন। অথচ তারাই সময় দিতে পারেন না। একটা ভ্রুণ যখন একটু একটু করে শরীরে বাড়তে থাকে তখন শরীরে অনেক পরিবর্তন হয়। জীবন যাপনে অনেক পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন মেনে নেয়ার জন্য আসলেই একটা প্রস্তুতি দরকার হয়। বোঝাপড়ার দরকার হয়। যেখানে জীবনের পার্টনারকেই ঠিকমতো জানলাম না, সেখানে এই প্রস্তুতি কীভাবে নেয়া সম্ভব?

পার্টনারকে ভালোভাবে জানুন। সন্তান জন্মদেয়ার আগে এর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে নিজেরা আলোচনা করুন। আপনার সন্তানকে আপনি আপনার মত করে বড় করবেন, অন্যরা আপনাকে সহয়তা করবেন মাত্র। দায়-দায়িত্ব পুরোটাই মা-বাবার। এজন্য সন্তান জন্মদানের আগে প্রস্তুত হউন। সন্তান যখন ছোট ছোট পা দিয়ে পেটে লাথি দেয়, সেটা একটা স্বর্গীয় অনুভূতি। সন্তান যখন তোতলা ভাষায় এইটা ওইটা কথা বলে, সেটা একটা স্বর্গীয় অনুভূতি।
সন্তান যখন আকুতি নিয়ে আপনার দিকে তাকায়, আর সেটা আপনি মিটাতে না পারেন, জীবনে এর চেয়ে বেশি ব্যর্থতা অন্য কিছুতে নাই।

লেখক: ব্যাংকার

শেয়ার করুন:
  • 990
  •  
  •  
  •  
  •  
    990
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.