ঠিকানা

ফাহমিদা খানম:

লজ্জা, ঘৃণায় সমস্ত শরীর রি রি করছে –মনে হচ্ছে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই, কিন্তু কোথায় যাবো? মস্তবড় দুনিয়ায় কারও কারও ঠিকানা থাকে না, পরজীবী হয়েই বেঁচে থাকে কিছু মানুষ।

“কী হিসাবে আমার সাথে কথা না বলে তুমি বোনদের সাথে তাল মিলিয়ে কথা দিয়ে এলে?”
“বাহ রে, তিন বোনের একটা ভাই আমাদের, এটুকু শখ কি হতে পারে না?”
“নিজের টাকা দিয়ে ফুটানি করো, আমার আপত্তি নাই, আমার রক্ত পানি করা টাকা আমি ফালতু কাজে দিবো না”
“সংসার কি আমারও নয়? আমি কি সংসারে নিজের শ্রম দেই না?”
“আরে ঘরের কাজ কি তেমন কোনো ব্যাপার! আমাদের নানী-মায়েদের যুগে সবই তারা নিজে করতেন, তোমরা সবকিছু রেডিমেট পেয়েও খুশি হও না, লোভী মেয়েমানুষ!”

এ জীবনে অসংখ্যবার অপমানিত হবার পরেও এখানেই ফিরে আসতে হয় – কিছু মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকে না।

“আরে, দুটো হাঁড়িপাতিল এক সাথে রাখলেই তো শব্দ হয়, আর এতো মানুষের জীবন! নিজেকে যতো ভোঁতা করে চলতে পারবি দিনশেষে লাভবান হবি”
“সংসারটা কি লাভ –হিসাবের খাতা, মা? আর কতোটা উজাড় করে দিলে মনে হবে সংসারটা দুজনের!”
“তোদের নিয়ে হইছে এক জ্বালা, এতো অল্পতে অসহিষ্ণু হয়ে পড়িস? জামাইকে ফোন করে আসতে বল, ছুটির দিন একসাথে সবাই খাই!”

শরীরের ক্ষতটুকু মাকে দেখাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু চেপে যাই, হয়তো এই বয়সে এসব ধকল নিতে পারবেন না, তার চাইতে মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে অভিনয়টা অনেক সহজ – সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে গল্প করে সহজ হতে চেষ্টা করি।

“ও কাজে বাইরে গেছে, ফিরতে রাত হবে বলেছে”

অন্যদিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলি—মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলার সাহস হয় না। দশ বছরে প্রেম উবে গিয়ে বাস্তবতায় ফিরে অনুভব করেছে শ্বশুরবাড়িতে এলে জামাই আদর পায় না। বাবা নেই, তিন বোনের একটা ভাই, বাবার মৃত্যুর পর আমার বিয়ে হয়েছে অবশ্য নিজ পছন্দেই। তখন চোখে রঙ্গিন চশমা ছিলো, কিন্তু পরে বুঝেছে তাকে যথাযথ সম্মান বা আদর করা হয়নি যেটা আগের দুই জামাইকে করা হয়েছিলো! কতবার যে বলেছে, আমার সংসার! তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মা কিংবা ভাইয়ের জন্যে কিছুই করা হয় না, আমার অথচ এই মানুষটা বিয়ের আগে পরে কথা দিয়েছিল – আজীবন আমাকে আগলে রাখবে, আর এখন সামান্য ভুল ত্রুটি হলেই তুই –তোকারি করে, গায়ে হাত তুলেও লজ্জিত হয় না।
আচ্ছা বিয়ের পরে যে স্নেহ, আদর, ভালোবাসা দিয়েছিলো, সেগুলো কি স্রেফ মোহ ছিলো? নাকি সময়ে সবকিছু ফিকে হয়ে যায়? প্রতারণা কি কেবল প্রেমিকরাই করে? স্বামীরা করে না? সারাজীবন পাশে থাকে, কিন্তু কাছে আর থাকে কই?

আমার মাঝে এখন অনেক দোষই খুঁজে পায়, অথচ আগে এমন ছিলো না –সময়ে হয়তো সবকিছুই বদলে যায়। ভাইয়ের বিয়েতে তিন বোন মিলে ঘর সাজিয়ে দিবো বলেছিলাম, কিন্তু ওর কথায় বাস্তবতায় ফিরলাম, আচ্ছা সংসারে উপার্জনশীল হলেই কি অন্যপক্ষকে ঘায়েল করতে খুব সুবিধা নাকি এসব রক্তেই লুকায়িত থাকে সুপ্ত হয়ে? সুযোগ পেলে তাই এক কণাও ছাড় দেয় না!
গত দশ বছরে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে বলা যায়। আমাদের থেকে এখন আমার সংসার শুনতে অভ্যস্ত হয়েছি – বাবাদের রাজকন্যারা বিয়ের পর স্রেফ অন্য বাড়ির কেয়ারটেকার হয়ে যায় বুঝেছি। বাবার মুখে শোনা পল্লী কবির ‘কবর’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায় —

“হাতে তে মারিতো না মোটে
ঠোঁটে যে মারিতো সতত”

এই মানুষটা অন্যদের সামনে যখন ভালবাসার, যত্নের অভিনয় করে, আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি – দ্বিমুখী স্বভাব জেনেও চুপ করে থাকি, ভাগ্যটা এমন বাচ্চা-কাচ্চাও হলো না। আগে চেষ্টা করলেও আজকাল ডাক্তারের কথা বললেই রেগে যায়। আমি বুঝে যাই দুজনের মধ্যে থাকা শেষ টানটুকুও মরে গেছে।
বাবার বাড়ির কাছাকাছি বাসা নিয়েছিলাম বলে কৌশলে টাকা –পয়সা নিজের কাছে রাখা শুরু করে দিলো, অথচ আমি এসব টের পেয়েছি অনেকদিন পরে। ভাইটা অফিসের ট্যুরে বিভিন্ন জায়গায় যায় দেখে মাকে নিয়ে আসতে বার বার ঝামেলা মনে হতো, সেজন্যেই বাসাটা কাছাকাছি নেওয়া।

“কী ব্যাপার, ড্রয়ারে টাকা নেই দেখছি”
“তুমি যখন-তখন বাসায় যাও, তাই বাসায় রাখা নিরাপদ ভাবছি না”

তারপর ড্রয়ার আলাদা হবার পর আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম, ভালোবাসার বিয়ে হলেও সেটা একসময় ফিকে হতে লাগলো, তারপর শুধু মানিয়ে চলা দুপক্ষেরই, তবে খোঁটা সহ্য করতে পারতাম না, কান্না করতাম, না খেয়ে থাকতাম, তারপর সব গা সওয়া হয়ে গেলো। আগে রাগ করলে অভিমানিনীর রাগ ভাঙ্গাতো, খাইয়ে দিতো। কতকাল আগের কথা সেসব! এক সময় আবিষ্কার করলাম কথার বাক্যবাণে আহত হলেও খিদে পায়! আচ্ছা সময়ের সাথে কি অনুভূতি মরে যায়? বাসার সবচেয়ে আদরের মেয়েটা অজান্তেই নিজের ভেতরে গুটিয়ে নিলো নিজেকে। একবার দত্তক নেবার উদ্দেশ্যে একটা বাচ্চা এনেছিলাম বাসায় – পুতুলের মতো দেখতে –

“কার না কার বাচ্চা আমার বাসায় তুলে এনেছো তুমি?”
“যারই হোক, এখন থেকে আমাদের হবে, বড়ো আপুর পরিচিত একজনের”
“আমার সংসারে আমি এসব এলাও করবো না”
সেই ছিলো শুরুমাত্র, আমিই বুঝিনি। তারপর থেকে আমাদের আর হলো না।
“তুমি নাকি চাকরির জন্যে দরখাস্ত করেছো?”
“হ্যাঁ, ঘরে বসে থেকে সময় কাটতে চায় না সেজন্যে”
“তুমি করবে এতিমখানায় চাকরি? বাচ্চার মা না হলে কি ওদের প্রতি মন থেকে ফিলিংস আসবে?”
“পেটে না ধরলে বুঝি মা হওয়া যায় না? মা শব্দটাকে এতো ছোট গণ্ডিতে বেঁধো না”
“যা ইচ্ছে হয় করো গিয়ে, আমি তোমার কোনো ব্যাপারেই নেই”

একটা জেলা শহরে কীভাবে জানি চাকরিটা হয়েই গেলো – কেউই খুশি হলো না। মা, আপু সবাই বললো –
“কীসের অভাব তোর? ভরা সংসার আর স্বামী রেখে কীজন্যে দূরে গিয়ে চাকরি করতে হবে? কীসের অভাবে?”

মনে মনে বলি – ভাগ্যিস সব ভেংগে যাবার বিদীর্ণ শব্দ শোনা যায় না!
“তাহলে তুমি যাচ্ছোই! ভেবে দেখো আমাদের সংসারটা এভাবে টিকে থাকবে কি?”

অনেকদিন বাদে ‘আমাদের’ শব্দটা শুনে অবাকই হলাম, কিন্তু মুখে কিছুই বললাম না, আমার যে একটা ঠিকানার খুব দরকার! অনঢ় দেখে আমাদের বাসায় গেলো —- যাকে কেউ অনুরোধ আর ভালবেসেও নিতে পারে না! স্বার্থ বড়ো খারাপ জিনিস!

দুজন মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসা ফুরিয়ে গিয়ে সম্মানের জায়গাটা যখন হারিয়ে যায়, সেটা খুবই ভয়ঙ্কর, শ্রদ্ধাটা যেখানে নেই সেখানে লোকলজ্জা আর সামাজিকতার ভারী পোশাক খুলে দম নিয়ে বাঁচতে শেখাটা জরুরি। লাঞ্ছনা, অবহেলা, অনাদর পেয়েও মেয়েরা সংসারে থাকে, কারণ তাদের যাওয়ার মতো ঠিকানা থাকে না। সময় কী নির্মম! সংসারের সব জিনিসের প্রতি আগে এক সময় যে তীব্র মায়া ছিলো, সেসবের জন্যে খারাপ লাগছে না। অথচ আগে কী টান অনুভব করেছি! আমার সংসার শব্দটা আমার জগত বদলে দিয়েছে – এক সন্তানের মা হতে পারিনি কী হয়েছে! শত সন্তানের মা হবো আমি, কেউ আংগুল তুলে খোঁটা দিবে না – একটা ঠিকানা হবে আমার।

কেউ জিজ্ঞেস কোরোনা
“তোমার চোখে মেঘ কেন?”
আমি কী করে বোঝাব তোমাদের!
আমার প্রিয় নদীটা ভাল নেই।
আমার ব্যথাগুলো
আরও ব্যথা নিয়ে,
মেঘ হয়ে ছেপে গেছে চোখে।
আমি ভাল নেই।
তবু যদি কেউ কিছু বোঝো
দেখে জলছাপা দুটো চোখ,
আমাকে শুধিয়ো না কিছু
বলে যেয়ো শুধু –
তোর নদীটার ভাল হোক।

-রুদ্র গোস্বামী
-ভাল নেই

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.