নারীর প্রতি কটূক্তি: এই বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করতে বলেন?

নাজমুল আলম:

আজ প্রথম আলোর একটা খবরের শিরোনামে চোখ আটকে গেল – “মা দক্ষিণ সুদানে, বাবা দক্ষিণ কোরিয়ায় এবং সন্তানেরা উগান্ডায় আটকে”। নিজে একজন উন্নয়ন কর্মী হওয়ায় আর আফ্রিকার অনুন্নত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নাম শিরোনাম হওয়ায় বুঝতে বাকি রইলো না যে এই মা নিঃসন্দেহে একজন উন্নয়ন কর্মী।
পুরো খবরে চোখ বুলাতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল, উগান্ডা প্রবাসী নূর আয়েশা জাতিসংঘে কর্মরত এবং তার স্বামী আজিজ নূর একজন পাইলট, এই করোনা পরিস্থিতিতে দুজনেই নিজ নিজ কর্মস্থলে আটকে আছেন, লকডাউনের কারণে গত দুইমাসে সন্তানদের কাছে উগান্ডাতে ফিরতে পারছেন না। করোনা ভাইরাসে কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এলোমেলো পৃথিবীতে একজন মা এবং বাবার অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে এই খবরে। কিন্তু খবরের শেষে কিছু পুরুষের (যদিও তাদের আসলে মানুষ বলা যায় কিনা আমার সন্দেহ আছে) মন্তব্য দেখে রীতিমতো চমকে উঠলাম। সবাই তাদের সব ঘৃণা এবং ধিক্কার উগরে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং রীতিমত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এই নূর আয়েশাকে।

একজন মন্তব্য করেছে “পাইলট স্বামীর টাকায় সংসার চলতো না?” যুগ যুগ ধরে চলে আসা সেই কীর্তন। নারী তুমি যতই শিক্ষিত আর যোগ্য হও না কেন, তুমি সংসার আর ছেলেমেয়ে সামলাবা। তোমাকে চাকরি করতে কে বলেছে? জাতিসংঘের পলিটিক্যাল অফিসার এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে চেনাবার কী অসাধারণ প্রতিদান আমাদের পুরুষ সমাজের!

আমার মা একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন, আর তার উপার্জন না থাকলে আমাদের পরিবার কোনদিন স্বচ্ছলতার মুখ দেখতো কিনা সন্দেহ। আর একজনের মন্তব্য আরও কয়েক কাঠি সরেস – “টাকা এবং স্ট্যাটাস এর কাছে আজ মাতৃস্নেহ পরাজিত”। আপনাদের মতো নোংরা কীটদের কাছে টাকাটাই চোখে পড়বে … কিন্তু আমাদের এই বোন নূর তার কাজের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ সুদান এর মতো একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কত মা আর সন্তানকে নিরাপদে রাখতে সক্ষম হচ্ছেন, সেই খোঁজ কখনও নিয়েছেন?

বিগত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র পাশাপাশি যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে সেটা হলো আমাদের নৈতিক এবং মূল্যবোধের অধঃপতন। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে নারী (সে যে বয়সের হোক) তাকে অপমান–অপদস্ত-হেয় করার প্রতিযোগিতায় নেমেছি আমরা। একটা সময় শেখানো হতো যে সমাজের সর্বস্তরে যখন শিক্ষার আলো পৌঁছাবে, তখন নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে! এই সহিংসতা থেকে হয়তো নারী মুক্তি পাবে! কিন্তু গত কয়েক বছরের সামাজিক চিত্র বলে দেয় যে অবস্থার আরও বেশি অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা পত্রিকার অনলাইন এডিশনে মানুষের মন্তব্যের যায়গাতে চোখ বুলালে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।

একজন নপুংসক পুরুষ আজ মন্তব্য করেছেন, এটাই হলো আধুনিকতা আর নারী স্বাধীনতার পরিণাম। সংসারের বাবা পাইলট হসাবে ভিনদেশে আটকে আছে তাতে কোন সমস্যা নাই, শুধু ঐ মা কেন আজ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সেটাতে জাত চলে যাচ্ছে? নাকি আজ নারীর এই বিশ্বজয়ী রূপ দেখে আপনারা শংকিত?

বেশ অনেক দিন আগে ওয়াসফিয়া নাজরিন সফলভাবে এভারেস্ট অভিযান থেকে ফেরার পর পত্রিকার ছবির নিচে একজন পুরুষের মন্তব্য ছিল “এই পুড়ে কয়লা হওয়া মাগীরে বিয়ে করবে কোন ছাগল?” (এখানে এই মন্তব্যকারী অবশ্য নিজের অবস্থানটা অন্তত বুঝতে পেরেছিলেন)। সময়ের হিসাবে বছরের পর বছর গড়ায়, কিন্তু নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় না।

শুধু যে অশিক্ষিত, অসচেতন আর নিম্ন শ্রেণীর মানুষেরাই এই সব মন্তব্যকারী সেটা ভাববেন না প্লিজ।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা কথা, আমি তখন একটি একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। সেখানে সকল কর্মীদের মাঝে “Gender equity self-assessment” শিরোনামে একটি জরিপ করা হল, যাতে উঠে আসল ভয়াবহ সব তথ্য। কয়েকবার জেন্ডার এবং নারী পুরুষের সমতা নিয়ে প্রশিক্ষণ পাওয়া স্মার্ট এবং উচ্চশিক্ষিত ভাই’রা মনে করেন Humanitarian Crisis Response (মানবিক বিপর্যয় যেমন ঘূর্ণিঝড় বা রিফিউজি সংকট) কর্মকাণ্ডে নারী কর্মীরা বাড়তি বোঝা। অথচ তখন সেই প্রতিষ্ঠানের Disaster Risk Management Team এর সফলভাবে নেতৃত্ব দেন একজন নারী। প্রতিষ্ঠানটির Country Representative একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও অর্থ ও প্রশাসন বিভাগ নারী কর্মীদের রাখতে চান না কারণ তাদের কাজে অনেক কৌঁসুলি হওয়া প্রয়োজন এবং অনেক সময় অফিস টাইমের পরেও কাজ করতে হয়। সত্যিই সেলুকাস! অথচ এই সব কর্মীদের Gender transformative approach শেখাতে কত না অর্থ, শ্রম আর সময় ব্যয় করা হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পুরুষের নোংরা মন্তব্যের শিকার হননি এমন নারী খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। পোশাক দিয়ে শুরু – আগে শুধু শাড়িতে সমস্যা ছিল, ইদানিং বোরখা পরেও নিস্তার মেলে না। আর কোনভাবে সেই নারী যদি উচ্চশিক্ষিত বা উচ্চপদে কর্মরত হন, তাহলে তো আর কথাই নেই। রুবাবা দৌলা মতিন এর প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া মন্তব্যগুলো ভুলে গিয়ে থাকলে একবার ডাক্তার আফরিন সুলতানা বা আমাদের নারী ক্রিকেটার জাহানারা’র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একবার ঘুরে আসুন। অন্য সব অস্ত্র ব্যর্থ হলে তাদের ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে আছে ধর্ম এবং ফতোয়া। বেশিদিন কিন্তু হয়নি আমাদের কলসিন্দুরের নারী ফুটবল দলের সব ট্রফি, মেডেল ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিল, আর তাতে সমর্থন দেওয়া শখানেক মন্তব্য।

এই বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করতে বলেন? এই মানসিকতা নিয়ে সারা পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চান? #abuseagainstwomen #abuseinsocialmedia

লেখক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.