সেনোরা’র বিজ্ঞাপনটি চলবে

সুপ্রীতি ধর:

সেনোরার একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে শোরগোল দেখে মনে পড়লো নজরুলের এই কবিতাটি:

“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে- বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে”। বিশ্ব আজ কোথায় চলে গেছে, আর আমাদের দেশের কিছু কুলাঙ্গার মুমিন ধর্মের দোহাই দিয়ে সবাইকে আবার পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় দিনরাত একাকার করে ফেলছে। আর তাতে ইন্ধন দিচ্ছে খোদ রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রের বৃহত্তর একটা জনগোষ্ঠী।

ঘটনা তেমন কিছু না, গত ২৮ মে মেন্সট্রুয়াল হাইজিন ডে উপলক্ষে স্কয়ার গ্রুপ থেকে একটি টিভিসি প্রকাশ করা হয়, যেখানে ছোট বোনটির মন খারাপ দেখে বড় ভাই বার বার জানতে চায় কী হয়েছে, বোনটি বলে যে, ভাই বুঝবে না। তখন ভাইয়ের মাথায় আসে যে নিশ্চয়ই বোনটি পিরিয়ড সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়েছে, আর সে কারণেই সে বিষন্ন। তাৎক্ষণিকভাবে সে অনলাইনে বোনের জন্য প্যাড কেনার ব্যবস্থা করে দেয়, বোনটির মুখে হাসি ফুটে উঠে। ব্যস, এইটুকুই। বিজ্ঞাপনটি আগে চোখে পড়েনি, ফেসবুকে বেশ কয়েকজনের এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া পড়ছিলাম যে কোথায় নাকি কারা এই বিজ্ঞাপন না-জায়েজ বলে রীতিমতোন ফতোয়া দিয়ে বসেছে, সেনোরাকে বয়কটের আহ্বান জানাচ্ছে এবং আমার সেই ফেসবুক বন্ধুরা মোটামুটি তুলোধুনা করে দিয়ে এসেছে সেই লিংকে গিয়ে। আজ একজন বিষয়টি নজরে আনার পর পড়তে গিয়েছিলাম কী লেখা হয়েছে Sunni Cyber Army নামের গ্রুপটিতে।

গ্রুপটা স্বভাবতই মৌলবাদী বা ধর্মান্ধ বা প্রতিক্রিয়াশীল। তারা তীব্রভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারে, কারণ এতে ধর্ম আর রক্ষা করাই যাচ্ছে না, চলে যাচ্ছে। মেয়েরা তো আগে থেকেই বিপথে চলে গেছে তাদের ভাষায়, এখন এসব মেয়েদের মাসিক বা পিরিয়ডের সময় তাদের বাবা বা ভাই স্যানিটারি প্যাড কিনে দিলে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে সমাজে, যা কিনা জেনার শামিল।

তো চলুন দেখে আসি কী কী বিষয় তারা অবতারণা করেছে বা আমাদের মেয়েদের জন্য নির্দেশ জারি করেছে:

১) ভাই নয়, পিতা Senora কিনে এনে মেয়ের মাকে দিবে এবং মা মেয়েকে দিবে (যদি মা বেঁচে থাকে)। অথবা

২) মেয়ের মা না হয় মারা গেছে, তাই বলে কি মেয়ের চাচী, ফুফু, খালা, মামীরাও মারা গেছে? মেয়ে তাদের সাহায্যে Senora কেনার ব্যবস্থা করতে পারে। অথবা

৩) বাবা না থাকলে ভাই বোনকে তার ভাবির মাধ্যমে দেবে, ভাবি না থাকলে মার্কেটে নিয়ে যাবে এবং পিতা/ভাই মেয়েলি প্রোডাক্ট যে Shop এ পাওয়া যায় সেই Shop এর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং মেয়ে/বোন সেই Shop এর ভিতরে গিয়ে Senora কিনে তার হ্যান্ড ব্যাগের ভিতরে নিয়ে বাইরে আসবে। অথবা

৪) পিতা/ভাই মেয়েকে বাসাতেই নিজ জ্ঞানে টাকা দিবে যেমনভাবে সাধারণ খরচ করার জন্য টাকা দিয়ে থাকে (এটা এ্যাডে না দেখালেও চলবে) এবং মেয়ে/বোন তার menses শুরু হওয়ার আগেই সতর্কতামূলকভাবে স্কুল কলেজ কিংবা ভার্সিটি থেকে আসার সময় Shop এ গিয়ে Senora কিনে আনবে।

…এক কথায় পিতা/ভাই যেন এইসব ব্যাপারে মেয়ের মুখোমুখি না হয়।

…এই সব মেয়েলি ব্যাপারে পিতা/ভাই এবং মেয়ের/বোনের মুখোমুখি হওয়াটা যে কতোটা লজ্জার, দৃষ্টিকটু, বিব্রতকর এবং অশালীন তা বুঝতে হলে একবার নিজেকে দিয়ে imagine করুন যে আপনার পিতা/ভাই সরাসরি আপনার হাতে Senora দিচ্ছে অথবা আপনার পিতা/ভাই আপনাকে সরাসরি প্যান্টি কিনে দিচ্ছে। আমি শেষের কথাটা এই জন্য বললাম কারণ Senora যে জায়গায় ব্যবহার করা হয়, ঠিক সেই জায়গাতেই প্যান্টি ব্যবহার করা হয়। যদি সরাসরি প্যান্টি কিনে দেওয়াটা অশালীন হয়, তাহলে সরাসরি Senora কিনে দেওয়াটাও অশালীন।

এটুকু পড়লেন তো? দেখুন, আমার কিন্তু রাগে গা জ্বলছে, আপনার কি জ্বলছে? কোথাকার কোন আবালের দল আমাদের শেখাতে এসেছে কীভাবে, কী পদ্ধতিতে আমরা স্যানিটারি প্যাড কিনবো, কার মাধ্যমে কিনবো, ঘূণাক্ষরেও বাবা বা ভাই যেন নিজ হাতে না কেনে। কারণ কী? কারণ, এতে করে নিজের মেয়ে বা বোন যে প্যাড ব্যবহার করবে যে অঙ্গে, মানে যৌনাঙ্গে, সেই অঙ্গ সম্পর্কে বাবা বা ভাইয়ের একটা ইমাজিনেশন হবে, মানে কল্পনায় তারা মেয়ে বা বোনের ভ্যাজাইনা দেখতে পাবে!

হাউ ডেয়ার ইউ মুমিনের দল! কে তোদের বলেছে এ ধরনের ইমাজিনেশন হয়? সবাইকে তোদের সাথে এক নিক্তিতে মাপিস কেন? এজন্যই তো তোরা জন্মের পরপরই পারলে ঘরের কন্যাশিশুটিকে কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে ভরে রাখিস যেন তোদের ঈমানদণ্ড মিইয়ে থাকে। তোদের নিজেদের মেয়ে বা বোনের কথা ভেবে তোদের বীর্যপাত ঘটে যায়। হায় রে! সেইসব পরিবারে জন্ম নেয়া কন্যাশিশুদের প্রতি আমার করুণাই হয়। সেই কন্যাশিশুটি এক বীভৎস শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যখন তারুণ্যে পা দেয়, তার আগেই বিয়ে নামক এক প্রহসনের দিকে ওদের ঠেলে দিয়ে জীবনটা একেবারে শেষ করে দেয়া য়য়!

এই যে কদিন পর পর একেক বিষয় নিয়ে এইসব ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়, আর সবই হয় নারী, নয়তো ধর্মকেন্দ্রিক। দুটোই তোদের কাছে ‘গেল গেল’ অবস্থায় আছে।

গ্রুপটাতে এও বলা হয়েছে যে স্কয়ার গ্রুপ যেন অতিসত্ত্বর এই টিভিসি সরিয়ে নেয় বা মডিফাই করে দেয় তাদের দেয়া স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী, নয়তো বড় ধরনের মাশুল গুনতে হবে। রীতিমতোন হুমকি এটা। এটুকু পড়ে আমার মনে হলো, এই যে এই গ্রুপগুলোকে প্রশ্রয় দিতে দিতে আজ এই পর্যন্ত আনা হয়েছে, এই যে ইসলামের নামে ওদের ন্যাক্কারজনক সব কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয়া হলো দীর্ঘকাল ধরে, আমরা যারাই ওদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেয়েছি, আমাদেরকেও থামিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ তো স্পষ্ট হয়ে উঠছে ওদের আসল উদ্দেশ্য। ওরা অনেক আগে থেকেই আমাদের মেয়েদের চলাফেরা, পোশাকআশাক নির্ধারণ করে দিচ্ছে, আর আমরাও এক মূর্খ, অসভ্য জাতি তাদের কথা মেনে নিচ্ছি, তাও আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে, সুতরাং তাদের এই উল্লম্ফন তো হবেই!

একটা সামান্য বিজ্ঞাপন, আমি সামান্যই বলছি একে, কারণ এতে আসলে তেমন কিছুই বলা হয়নি। আমরা এবছর মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে এতো লেখালেখি, লাইভ প্রোগ্রাম করেছি, এতোসংখ্যক বিষয় নিয়ে কথা বলেছি যে, সেই তুলনায় এই টিভিসির ভাষা নেহায়েতই মামুলী। কিছুই না বলতে গেলে। একজন বললেন আমাকে যে তারা এসব ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ভয়েই ভাষা ব্যবহারে সংযত থাকেন, যতোটুকু ঢেকেঢুকে বলা যায় ততোটুকুই বলেন।

ভীষণ রাগ হলো সংশ্লিষ্টদের এই নমনীয় ভাব দেখে। এতো ভয় পেলে সমাজে পরিবর্তনটা আসবে কী করে? এই যে আমরা লেখালেখির মাধ্যমে কিছু একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি, সেখানে এতোবড় একটা কর্পোরেট হাউজ যদি ‘জী হুজুর’ মার্কা হয়ে থাকে, ভয় পায় এসব উচ্ছিষ্টভোগীদের, তাহলে তো আমরা ‘নাই’ হয়ে যাই!

মনে হচ্ছে, আমি নিজে স্ক্রিপ্ট লিখলে আরও কঠিন বিষয়ের অবতারণা করতাম। কিন্তু সমস্যা হলো সেই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী টিভিসি কেউ বাংলাদেশের মতোন দেশে নির্মাণ করতে রাজী হতো কিনা, সেটাই প্রশ্ন। এতো রয়ে-সয়ে, এসব ধর্মান্ধ গ্রুপগুলোর মাথায় বাবা বাবা বলে হাত বুলিয়ে এই যে একটা টিভিসি তৈরি হলো, আমি বরং এই কাজেরই সমালোচনা করতে পারি। বার্তাটা আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল, ভাষা হওয়া উচিত ছিল আরও টু দ্য পয়েন্ট।

লেখক: উইমেন চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.