পুরুষের আহাজারি

অর্ভ নগভিত শুভ ঔষ্ণিক:

সাম্প্রতিককালে মাঝে-মধ্যেই সম্মুখ অভিজ্ঞতায় কিংবা বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে নব্য-তপ্ত পুরুষদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে অভিযোগের চাপা আর্তনাদ শোনা যায়। উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা না হলেও যদি একে ছোট-ছোট টুকরোতে ভেঙে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে ফলাফল অনেকটা ‘নিজের পায়ে কুড়াল মেরে কুড়ালের নামেই অভিযোগ’ এর মতো শোনায়।

অভিযোগ আসে- ‘পুরুষের এক মর্মান্তিক, পাশবিক জীবন। পুরুষের শখ আহ্লাদ মাটি-চাপা পড়ে সামাজিক দায়বদ্ধতায়। পুরুষ নির্মম, অক্লান্ত পরিশ্রম করে একাই উপার্জন করে। উপার্জন ছাড়া পুরুষের যেন সামাজিক পরিচয় নেই, মূল্যও নেই। পুরুষ বিয়ে করতে গেলেও পেছনে অর্থের খুঁটি থাকা অত্যাবশ্যক, নারীর তা না হলেও চলে। তবে পুরুষের চলে না। সমাজের নিয়ম-কানুনের কাড়ি কাড়ি বস্তা যেন সব পুরুষেরই কাঁধে। নারীর কী? রান্না করে, খায়,  ঘুমায়,  স্টার জলসা দেখে, আবারও বৃত্তাকারে একই কর্মের পুনরাবৃত্তি করে। তাই শুধুই নারী-অধিকারের কথা বললে চলবে না, পুরুষের কথাও বলতে হবে। পুরুষের কি আবেগ, অনুভূতি নেই?’

এই অভিযোগসমূহ নারী আন্দোলন, নারীবাদ বা নারীর সমানাধিকারের বিপরীতে প্রতিযোগিতা আকারে পুরুষেরা নিয়ে আসে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়গুলো ফাঁকা বুলি বা আমলে নেয়ার অযোগ্য, এরকমটা মোটেও দাবি করা যায় না।

কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, এই ধরনের অভিযোগ, ক্ষোভ প্রকাশকারী পুরুষেরা নারীবাদীদের দৃষ্টিগোচরে এনে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চায়, নারী-আন্দোলনকারীরা নারী-পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলে না, বরং তারা পুরুষের কষ্ট, বেদনার কথা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে (!), পাশাপাশি নারীবাদীরা পুরুষ বিদ্বেষী এবং নারীগোষ্ঠীর প্রতি সম্পূর্ণ বায়াসড (!), হয়তো তারা এটাও ভাবে যে নারীবাদীরা পুরুষের সমস্যা সম্পর্কে অবগতই না। (সাধারণত যারা নারীবাদ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখে না, তারা ভাবে নারীবাদ মানে উইমেন সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক রূপ। যদিও এই চিন্তা নারীবাদের সাথে সাংঘর্ষিক)।

এখন আসা যাক উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিশ্লেষণে। যারা সমানাধিকারের কথা বলে, উত্থাপিত অভিযোগগুলো তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি এমনটা ভাবা যায় না।

সে যা-ই হোক, বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে। প্রতিটি অভিযোগকে যদি আমি ‘কেন’ দিয়ে প্রশ্ন করি, তাহলে সহজে উত্তর পাওয়া যেতে পারে। যেমন:

– শুধু পুরুষই কেন একা উপার্জন করবে?

– সংসারের দায়িত্ব কেন দুজনে ভাগাভাগি হবে না?

– বিয়ে করতে গেলে নারীর যোগ্যতা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও পুরুষেরই কেন চাকরি থাকতে হবে?

– ঘরের কাজ নারীকেই কেন একা সামাল দিতে হবে?

– সন্তান দুজনের। কিন্তু নারীকেই কেন একা দায়িত্ব নিয়ে সন্তান লালন-পালন করতে হবে?

এর সহজ উত্তর আমরা সবাই হয়তো জানি। শুধু এই সামাজিক প্রথাগুলোকে উলঙ্গভাবে প্রশ্ন করা হয় না বলে বুঝে উঠতে পারি না কিংবা আমাদের ভাবায়ও না।

সমাজে নারীর উপর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা, নারী প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল আর পুরুষ শক্তিশালী, নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাপুরুষ অপেক্ষা কম, নারী থাকবে ঘরে আর পুরুষ বাইরে, অর্থাৎ ঘরে-বাইরে এবং পৃথক-এলাকাতত্ত্বের ধারণাসমূহই আজ পুরুষের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরুষই নারীকে ঘরে বন্দী করেছে নিজের প্রভুত্ব ঠিক রাখতে, আবার পুরুষই তার নিজ-হস্ত-সৃষ্ট প্রথার ভারী বস্তায় নুইয়ে পড়ে আহাজারি করছে। নিজ ফাঁদের বলির শিকার সে নিজেই হয়েছে।

তাই এই ক্লান্ত পুরুষ যখন ভার বহন করতে গিয়ে নুয়ে পড়ে তার একার কষ্টের জন্যে প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, প্রকারান্তরে তারা নারীর সম-অধিকারের জন্যই লড়াই করে। এজন্যেই এই সমাজে আমরা এমন ঢের-সংখ্যক পুরুষ চাই যারা নিজের কষ্টের জন্যে লড়বে, একাই সকল অর্থোপার্জনের ভার থেকে মুক্তির জন্যে প্রতিবাদ করবে এবং সমাজে নারী-পুরুষ কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে সমানাধিকারের সাথে উদ্ধত-শিরে চিরমঙ্গলের গন্তব্যে ছুটবে।

লেখক পরিচিত: শিক্ষার্থী, বি.এ. (সম্মান)- দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.