শ্বাস তবু নিতেই হবে

শান্তা মারিয়া:

জর্জ ফ্লয়েড বলেছিলেন ‘আই কান্ট ব্রিদ’ ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’ তাঁর মৃত্যুকালীন সেই ভিডিও দেখতে আমার প্রয়োজন হয়েছিল অনেক সাহসের। একজন মানুষ ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করছে, তার দম আটকে আসছে, তার ঘাড়ে হাঁটু চেপে আছে আরেকজন মানুষ(?)। অন্য তিনজন তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। ফ্লয়েড যখন আর্তস্বরে বলছেন, ‘আই কান্ট ব্রিদ’ তখন ‘ব্রিদ’ কে ‘ব্রিড’ বানিয়ে অশ্লীল ইয়ার্কি করছে তার আততায়ীরা। ধীরে ধীরে ফ্লয়েডের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। দম আটকে স্বর দিয়ে বের হচ্ছে মৃত্যুকালীন গোঙানি। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে একজন মানুষ। তবু তার আততায়ীদের দয়া হচ্ছে না। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছানোর পরও একটি মিনিট দাঁড়িয়ে আছে। পুরো আট মিনিট ধরে ধীরে ধীরে নির্বাপিত হয়ে গেল একজনের জীবন প্রদীপ। দম আটকে, শ্বাস নিতে না পেরে মারা গেলেন ৪৫ বছরের তরতাজা একজন মানুষ।

এই দৃশ্য কি হলিউড-বলিউডের কোন হরর বা অ্যাকশন ছবির? না তা নয়। ফ্লয়েডের সঙ্গে কি এই চারজনের কোন পূর্বশত্রুতা ছিল? তাও নয়। এই চারজন কি কোন মাফিয়া বা গুন্ডাদলের? কিংবা ফ্লয়েড ছিলেন কোন জঙ্গী বা ব্যাংক ডাকাত? না। কোনটাই নয়। ফ্লয়েড ছিলেন একজন সাধারণ নাগরিক। আর ওই চারজন ছিল সেই নাগরিকদের রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। অর্থাৎ পুলিশের অকারণ সহিংসতায় একজনের করুণ মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড। ঘটনাটি ঘটছে কোথায়? বাংলাদেশের মতো এশিয়ার কোন দেশে? নর্থ কোরিয়ার মতো স্বৈরশাসকের দেশে?আফ্রিকার কোন পল্লীতে? না। তাও নয়।

ঘটনাটি ঘটছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক দেশে। যে দেশ স্বপ্নের (নাকি দুঃস্বপ্নের)দেশ বলে খ্যাত। যে দেশ মানবতার অতন্দ্র প্রহরী বলে নিজেদের জাহির করে। পৃথিবীর কোথায় কোন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটলে, কোথাও পান থেকে চুন খসলে তারা ‘মানবাধিকার রসাতলে গেল’ বলে চিৎকার করে গলা ফাটায়। কোথায় কে রাসায়নিক অস্ত্র বানানোর চিন্তা করছে, কোথায় কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর পায়ঁতারা করছে সেদিকে এদেশের কড়া নজর। যেকোনো ছুতায় সেসব দেশে সৈন্য পাঠাতে কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপে তাদের জুড়ি নেই। সেই মানবাধিকারের স্বর্গভূমিতে একি অঘটন? তাও আবার পুলিশ বাহিনী দ্বারা!

এখন আসি ফ্লয়েডের অপরাধের বৃত্তান্তে। জর্জ ফ্লয়েড নাকি একটি ইউটিলিটি শপে(মুদির দোকানে) সিগারেট কিনে বিশ ডলারের একটি নোট দিয়েছিলেন। দোকানির মতে নোটটি জাল। ২০ ডলার মানে ১৬৪০ টাকার মতো। ধরলাম ১৫শ থেকে ১৭শ টাকার মধ্যে। আচ্ছা দুহাজার টাকাই ধরা গেল। এই সামান্য টাকার জন্য দোকানি ফোন করলেন ৯১১ এ। যেন ব্যাংক ডাকাতির মতো ভয়াবহ কিছু ঘটেছে। আর তড়িৎ গতিতে পুলিশও পৌঁছে গেল। আর ফ্লয়েডকে ধরে মাটিতে চেপে, হাঁটু দিয়ে তার দম বন্ধ করে, তাকে মেরে তবে ছাড়লো।

এতক্ষণ আমি ফ্লয়েডের আসল অপরাধটিই কিন্তু বলিনি। ফ্লয়েডের আসল অপরাধ, অমার্জনীয় অপরাধ, অসংশোধনযোগ্য অপরাধ ছিল তার গায়ের রং। সে ছিল কালো। সে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। তার প্রধান অপরাধ ছিল যে, আজ থেকে দুই বা তিনশ বছর আগে, তার পূর্ব প্রজন্মের কোন নিরাপরাধ মানুষকে আফ্রিকা থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছিল আমেরিকায়।

সাত বা আট প্রজন্ম আগে আফ্রিকার উদার মুক্ত প্রান্তর থেকে এক প্রাণবন্ত তরুণ বা তরুনীকে মাছ ধরা জাল দিয়ে ধরে ফেললো একদল মানব শিকারী।তার গলায় ফাঁশ দড়ি দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে চললো। তারপর খোঁয়াড়ে ভরে উঠালো জাহাজে। যেভাবে একপাল ভেড়া বা ছাগলকে চালান দেয়া হয়। তেমনি পশুর মতো তাকে পাচার করে নিয়ে আসা হলো আমেরিকায়। সে হয়ে গেল কোন মালিকের ক্রীতদাস। আফ্রিকা থেকে ধরে আনা এই স্বাধীন মানুষগুলো আমেরিকায় ক্রীতদাসে পরিণত হয় অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে। তাদের উপর চলে অবর্ণনীয় নির্যাতন। আমেরিকার বর্তমান কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠির প্রায় সকলেই এইভাবে আফ্রিকা খেকে অপহরণের শিকার হয়ে আসা মানুষের বংশধর।

ইতিহাসের নির্মম কৌতুক হলো, এদেরকে ধরে আনা হলো, আবার কালো মানুষ বলে তাদের ঘৃণাও করা হলো।বর্ণবাদের কি বীভৎস তামাশা। শ্বেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ। কেন শ্রেষ্ঠ? কারণ তারা কালোদের অপহরণ করে ক্রীতদাস বানিয়েছে, এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাদের ভূমিতে জবর দখল করেছে, উপনিবেশ বানিয়েছে, তাদের নারীদের ধর্ষণ করেছে, পুরুষদের হত্যা করেছে। হ্যা, হত্যাকারী, ধর্ষক, জবর দখলকারী হিসেবে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব আছে বটে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই সেদিন পর্যন্ত কালোদের দেশে কালোদেরই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদ নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করছে কোন যুক্তি ছাড়াই কেবল গাযের জোরে। অবশ্য বিশ্বে নির্যাতকের কোন যুক্তি লাগে না। আমেরিকাতে স্রেফ কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার অপরাধে অনেকবার মেরে ফেলা হয়েছে নিরাপরাধ বালক ও কিশোরদের। এই তো কয়েক বছর আগে কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ বালক খেলনা পিস্তল দিয়ে খেলছিল। পুলিশ তাদের গুলি করে মারে। তারা নাকি ভেবেছিল ওগুলো আসল পিস্তল। কৃষ্ণাঙ্গ মানেই অপরাধী, কৃষ্ণাঙ্গ নারী মানেই ধর্ষণের সামগ্রী- আমেরিকার সাদা পুলিশ ও বর্ণবাদী সাদা মানুষরা অনেক বছর ধরেই এ ধারণায় বিশ্বাস করেছে, সেই অনুযায়ী আচরণও করেছে।

বিশ শতকেও আমেরিকার বহু স্টেটে সূর্যাস্ত আইন ছিল কালোদের জন্য। তাদের সূর্যাস্তের পর শহরের নির্ধারিত অংশে চলে যেতে বাধ্য করা হতো। তাদের জন্য আলাদা স্কুল ছিল। জলের কলও ছিল আলাদা। এমনকি অনেক জায়গায় সাদাদের চার্চে কালোদের প্রবেশও ছিল নিষেধ। ঈশ্বরের ঘরেও সাদা ও কালোর প্রভেদ। কি ভয়ংকর মানসিকতা। যে মানসিকতা নিয়ে হিটলার নিজেকে আর্য ঘোষণা করে, বর্ণশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বন্দী শিবিরে পাঠিয়েছিল অসংখ্য ইহুদী নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বেসামরিক সাধারণ মানুষকে। হত্যা করেছিল গ্যাস চেম্বারে। সেই একই মানসিকতায় আমেরিকায় কালোদের উপর চলছে বৈষম্য, নির্যাতন। বর্ণবাদ যে কত গভীরে থাবা বিস্তার করে আছে তা বোঝা যায় ফ্লয়েডের উপর সাদা পুলিশ সদস্যদের আচরণ দেখে।

ইতিহাসের কথা না হয় বাদই দিলাম। এখনও আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অনেক সাদা মানুষের নোংরা মনের পরতে পরতে জমে আছে বর্ণবাদী মনোভাব এবং অন্যান্য রঙের মানুষের প্রতি ঘৃণা। যখন তখন এই চেপে রাখা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে আর প্রাণ হারাতে হয় জর্জ ফ্লয়েডদের।
গায়ের রং, দৈহিক গড়ন, জাত, ধর্ম কোন কিছুর জন্যই একদল মানুষ অন্য দল মানুষকে ঘৃণা করার, তাদের উপর নিপীড়ন চালানোর, বৈষম্যমূলক আচরণ করার অধিকার রাখে না।

আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকারের মহান সেনাপতি, মানবাধিকারের প্রবক্তা শহীদ মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণ ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ এর কথাগুলো মনে পড়ছে প্রবলভাবে। তাঁকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল হত্যাকারীর গুলিতে। জর্জ ফ্লয়েডের মতো তিনিও ছিলেন বর্ণবাদের নিষ্ঠুর বলি। বর্ণবাদের প্রতিবাদে আজ ফুঁসে উঠেছে আমেরিকা। এই আন্দোলন মানবতার পক্ষের আন্দোলন। এই আন্দোলন মানবাধিকারের আন্দোলন। এই আন্দোলন নিপীড়িত জনতার আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে সর্বাত্মক সহমর্মিতা ও সংহতি প্রকাশ করি। এই আন্দোলনকে মনে প্রাণে সমর্থন করি।

এক্ই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু নির্যাতন, পাহাড়ে ও সমতলে আদিবাসী জনগোষ্ঠির উপর নির্যাতন, নারীর উপর চলা সকল প্রকার সহিংসতা, ঘরে বাইরে নারীর উপর সংঘটিত সকল প্রকার বৈষম্য, নির্যাতনের বিরুদ্ধেও আমার ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাই। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন থেকে এগুলো খুব বেশি আলাদা নয়। সংহতি জানাই সকল প্রকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে। আমারও একটি স্বপ্ন আছে। সে স্বপ্ন বৈষম্যমুক্ত, নির্যাতন মুক্ত, পরিবেশ বান্ধব একটি বিশ্বের। সে বিশ্ব গড়ার আন্দোলনে সকল সচেতন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বৈকি।এই পৃথিবীর অবস্থা যত শ্বাসরুদ্ধকরই হোক না কেন, শ্বাস তবু নিতেই হবে। বাঁচাতে হবে মানুষকে।

জয় হোক মানবতার।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.