‘ঘরজামাই’ পুরুষ যখন শ্বশুরবাড়ির সকলের মাথাব্যথার কারণ!

নাসরীন রহমান:

বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যাবেন, এটাই আমাদের সমাজে চলে আসা সাধারণ নিয়ম। আর সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে যদি বিয়ের পর মেয়ের স্বামী শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকেন, তবে তাকে বলা হয় ‘ঘরজামাই’। যখন কোনো পুরুষ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, বুঝতে হবে সে হয়তো অকর্মা নয়তো লোভী! মানসিকভাবে সুস্থ শারীরিকভাবে সবল কোন পুরুষ কখনই চাইবে না আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ঘরজামাই হতে।

সানজিদা খাতুন, হাসিখুশি, দু-চোখে স্বপ্ন নিয়ে আগামীর পথে এগিয়ে চলার স্বপ্নে বিভোর ছিল মেয়েটি। কিন্তু এর মধ্যে বিষাদের কালো ছায়া এসে ভর করতে শুরু করেছে ওর মনে! না, ওর নিজস্ব কোন কারণে নয়; ঘরজামাই বোনের স্বামী ওর মাথাব্যথার কারণ!

বিয়ের দুই বছর পর বাচ্চাসহ বোন আর বোনের স্বামী এসে উঠেন বাবার বাড়ি; সেই থেকে স্থায়ী সেখানেই। ছোট্ট ফ্লাট, এর মধ্যে একটি রুম ছেড়ে দিতে হয়েছে ওদের। সানজিদাকে থাকতে হচ্ছে মেজ বোনের সাথে এক রুমে। আরেক রুমে মা, বাবা।

একবছর আগে সানজিদার বাবা স্ট্রোক করায় এখন বলতে গেলে পরিবারের অভিভাবক এখন বোনের স্বামী, ওরফে ঘরজামাই! সাথে সহযোগী বড় বোন!
এরই মধ্যে সে কব্জা করে নিয়েছে শ্বশুরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান! মিষ্টি কথায় শ্বশুরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করেছে; সানজিদার কোন ভাই না থাকায় সুযোগটা নিয়েছে; অসুস্থ শ্বশুরের কী করার আছে? নিজের শারীরিক অক্ষমতার কারণে নির্ভর করতে হচ্ছে জামাই-র উপর।

ঘরজামাই বোনের বরই এখন হর্তাকর্তা! সংসারের সব সিদ্ধান্ত বোন আর বোনের জামাই-ই নেন। সানজিদাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিতে হয় সবকিছু; এমন নয় বোন আর বোনের জামাই খুব খুব ভালো চায় ওদের। কথায় কথায় খবরদারি, শাসন! বোন-বোন জামাইয়ের অভিভাবকসুলভ এই আচরণ এতটাই পীড়াদায়ক যা রীতিমতো মানসিক নির্যাতন সানজিদার কাছে! ও ঠিকই বুঝতে পারে যে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে বোন আর বোনের জামাই। অসুস্থ বাবা, মায়ের দিকে তাকিয়ে নিরবে সহ্য করে সব। দেখেও সব না দেখার ভান করে।

আমাদের সমাজে ‘ঘরজামাই’ থাকার প্রচলন নুতন নয়, বহু যুগ থেকেই এর প্রচলন। অনেক পরিবারেই অভিভাবকেরা ইচ্ছে করেই মেয়ে -মেয়ে জামাইকে নিজেদের কাছে রাখেন, তাদের কোনো ছেলে সন্তান না থাকার কারণে, ভাবেন মেয়ের জামাই-ই ছেলের মতো তাদের দেখভাল করবে! অনেকে আবার রাখতে বাধ্য হন; হালসময়ে অনেক স্বামী -স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় সন্তানদের দেখভাল করার সুবিধার্থে অনেক পুরুষ ঘরজামাই থাকেন।

কিন্তু এই ঘরজামাই প্রথাই মাথাব্যথার কারণ হয় যখন ঘরজামাই হয় সুযোগসন্ধানী, লোভী! শ্বশুরের সম্পত্তির উপর যখন লোভের থাবা বসায় এই ঘরজামাই এবং অলিখিত অভিভাবক এতো ভূমিকার জেঁকে বসে অভিভাবকত্ব আচরণের মাধ্যমে!

এখন দেখা যাক কেন এই মোড়লগিরি ঘরজামাইদের?

যেহেতু এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজে ঘরজামাই প্রথাকে সুদৃষ্টিতে দেখা হয় না, বরং সমালোচনার দৃষ্টিতেই দেখা হয়, স্বাভাবিক কারণে ঘরজামাই থাকা পুরুষ মানসিকভাবে হীনমন্যতায় ভুগেন; তাদের এই মানসিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে তাদের মোড়লগিরি আচরণের মাধ্যমে। শ্বশুরবাড়িতে বসবাসরত ঘরজামাইরা তাদের অবস্থানকে আরও পাকাপোক্ত করতে, নিজেদের গ্রহণযোগ্য করতে অলিখিত অভিভাবক এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন!

এই অভিভাবকসুলভ আচরণ করতে গিয়ে অনেক সময়ই সীমারেখা মেইনটেইন করতে পারেন না।
অনেক ঘরজামাই আবার ইচ্ছে করেই এমন করেন; সামাজিক অবস্থানগত দিক থেকে স্ত্রীর পরিবার উচ্চ অবস্থানে থাকায় এবং নিজে ঘরজামাই থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন; ভাবেন সবাইকে দমন করে রাখতে পারলে শ্বশুরবাড়িতে তার অবস্থান মজবুত হবে!

শেয়ার করুন:
  • 276
  •  
  •  
  •  
  •  
    276
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.