সম্পত্তিতে বাংলাদেশি হিন্দু-বৌদ্ধ নারীর অধিকার, বিদ্রুপ ছাড়া কিছু নয়

সান্দ্রা নন্দিনী:

এটি ভীষণরকম যৌক্তিক এক দাবি। বাংলাদেশের হিন্দু ও বৌদ্ধ নারীদের নিজের বাবার বাড়ির ও স্বামীর সম্পত্তির যে এককণা পরিমাণও পাওয়ার অধিকার নেই, আমরা সেই ঘৃণ্য কালো আইনটিই সংশোধন করার জোরালো দাবি তুলতে চাই। আমরা চাই আমাদের কণ্ঠস্বর, আমাদের চিৎকার যেন দেশের সকল মানুষের কানে তালা লাগিয়ে দেয়। আর সেই তীব্র আওয়াজে যেন রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসে। কেননা অতীত অভিজ্ঞতা বারংবার প্রমাণ করেছে যে নাছোড়বান্দা না হলে, চিৎকার জোরালো না হলে কোনো দাবিই পূরণ হয় না।

একই মা-বাবার সন্তান হয়েও শুধুমাত্র জেন্ডার আলাদা এই দোহাই দিয়ে যখন প্রাপ্য সম্পত্তির ভাগ দেওয়া থেকে কন্যাসন্তানকে বঞ্চিত করা হয়, তখন বুঝতে হবে এই রীতির পেছনে কতখানি রাজনীতি ও পুরুষতন্ত্র কাজ করে। মেয়েদের অন্য এরেকটি পরিবারে চলে যেতে হয় এটি কীভাবে তার জন্মগত অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে! অথবা মেয়েসন্তান অন্য ধর্মে বিয়ে করলে তার নিজের পরিবারের সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার হুমকিতে পড়ে যাবে এজন্য তাদের সম্পত্তির ভাগ দেওয়া যাবে না, এই যুক্তিও ভীষণ ঠুনকো মনে হয় না?

সান্দ্রা নন্দিনী

ঠুনকো এই কারণে বলছি কেননা প্রথমত, সম্পত্তির ভাগ না দিয়েও এতদিন যাবত অন্য ধর্মে বিয়ে করা কোনভাবেই ঠেকানো যায়নিl দ্বিতীয়ত, যেসব হিন্দুনারী নিজধর্মেই বিয়ে করছেন তাদের কেন বঞ্চিত করা হচ্ছে তবে যুগের পর যুগ? তাদের পুরস্কার কোথায় তাহলে? তাছাড়া, প্রচুর ছেলেও অন্যধর্মে বিয়ে করে এবং ধর্মান্তরিত হয়েছে, হচ্ছে (কেননা ধর্মান্তরিত না হয়ে বিয়ের রীতি খুব বেশিদিন আগে চালু হয়নি) তাহলে সেই ভয়ে কেন আগে থেকেই আইন করে তাদেরকেও সম্পত্তি দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয় না? অন্য সম্প্রদায়ে বিয়ে করলে মেয়ে বা ছেলে সন্তানটি পারিবারিক সম্পত্তি পাবে কিনা সেটা সেই পরিবারকেই নির্ধারণ করতে দিন, আইন করে আপনাকে তা বন্ধ করতে হবে না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমার মাও একজন স্বোপার্জিত স্বনির্ভর নারীl সেক্ষেত্রে মা-বাবা দু’জন তথা পারিবারিক সম্পদের ভাগ পেতে যদি আমাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে হয়, কিংবা আমার পরিবারের পক্ষ থেকে ‘দানপত্র’ করে আমাকে প্রাপ্য হিসেব বোঝাতে হয়, তবে সেক্ষেত্রে আমি বিষয়টিকে অত্যন্ত অন্যায়, লজ্জা ও অপমানজনক বলেই মনে করছি। আমি ছেলেসন্তান হলে আরামে চোখ বন্ধ করে সব পেয়ে যেতাম, আর মেয়ে বলে এখন কাঠ-খড় পুড়িয়ে নিজের পরিরাবের কাছ থেকেই ‘দান’ পাওয়ার জন্য হাত পেতে বসে থাকবো, এভাবেতো চলতে পারে না। একজন নারীকে কী ভয়াবহভাবে অসম্মানিত করার একটি প্রথা!

আরেকটি কঠিন ও জোরালো যুক্তি সমাজপতিরা দিয়ে থাকেন যে, বিয়ের সময় মেয়েদের তাদের ভাগ বুঝিয়ে দিয়েই পরিবার থেকে খরচ করা হয়। দেখুন, এটা অনেকটা কান টানলে মাথা আসার মতো ব্যাপার। কেননা মেয়েসন্তানটি যেহেতু পারিবারিকভাবে সম্পত্তির কোনো ভাগ পায় না, সেক্ষেত্রে একটা হিসেব চলে আসে যে ঠিক আছে তাহলে বিয়ের সময় একটা খরচ দেখিয়ে দেওয়ার। পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ দেওয়া হলে সেক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা এমনিতেই আর থাকবে না, যারযার সামর্থ্যানুযায়ীই ছেলে ও মেয়েসন্তানের বিয়ে দেওয়ার চল শুরু হয়ে যাবে। মেয়ের বিয়ের খরচ যোগানোর জন্য পরিবারকে নিঃস্ব হতে হবে না তখন। কেননা গলায় জোর থাকবে যে পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ তো মেয়ে পাবেই তবে আর বিয়ের সময়ে কেন সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করতে হবে। এখন সে জোরটা নেই বলেই মেয়ের বিয়ে মানেই পরিবারের জন্য বিশাল পাহাড় সমান চাপে হাস-ফাঁস অবস্থা।

সময়ের সাথে সকল নিয়ম-রীতি পাল্টায়, এই অবস্থাটিরও পরিবর্তন আনতে হবে। আধুনিকতা মানে কেবল সারাদিন মোবাইল হাতে নিয়ে গ্রুপচ্যাট, অনলাইন শপিং কিংবা নতুন নতুন রেস্টুরেন্টে খেয়ে বেড়িয়ে সেই ছবি ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করা না। একটি রাষ্ট্র ও সেই রাষ্ট্রের মানুষ আদৌ কতখানি ‘আধুনিক’ সেটা সেখানকার প্রচলিত আইন-কানুন, রীতি-নীতি ও সামাজিক প্রথার ওপর নির্ভর করেl তাই নিজেদের ভিত্তি আগে মজবুত করে তারপর নাহয় আধুনিকতার ওই চটুল জোয়ারে গা ভাসানো যাবে।

আসুন না, সবাই মিলে একজোট হয়ে একটা অন্ধকার দিককে আলোকিত করি। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-জেন্ডার ভেদে দেশের সকল মানুষ অসম্ভব যৌক্তিক এই দাবিটি আদায়ে একাট্টা হয়ে লড়াইয়ে নামি…।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ (বৌদ্ধদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য)

বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার নির্বাচন দুইটি মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘দায়ভাগ’ ও ‘মিতাক্ষর’ এই দুই মতবাদের মাধ্যমে হিন্দু আইনে সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে হস্তান্তর হয়ে থাকে। ‘দায়ভাগ’ পদ্ধতিটিই বাংলাদেশে প্রচলিত আছে।

‘দায়ভাগ’ মতে, পিণ্ডদানের অধিকারী ব্যক্তি মাত্রই মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী! যারা পিণ্ড দিতে পারে,তারাই মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির ওয়ারিশ! ‘দায়ভাগ’ মতবাদের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরে হিন্দু নারীদের প্রতি চরম বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। যারফলে,একজন নারী তার পিতা ও স্বামী উভয়ের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দায়ভাগ উত্তরাধিকারের কিছু সাধারণ নিয়ম

১। দায়ভাগ আইনে পিতার মৃত্যুর পর পুত্রগণ পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার লাভ করে।
২। পিতার মৃত্যুর পর পুত্রগণ যৌথ পরিবার গঠন করতে পারে। যৌথ পরিবারের কর্তা প্রয়োজনে সম্পত্তির কিছু অংশ ক্রয়, বিক্রয় , বন্ধক বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে পারেন।
৩। কোন হিন্দু মালিক যখন মারা যান, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে উত্তরাধিকার শুরু হয়। ভবিষ্যতে কোন উত্তরাধিকারী জন্মগ্রহণ করতে পারে বলে উত্তরাধিকার স্থগিত রাখা যাবেনা।
৪। স্ত্রীধন বলতে নারীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বোঝায়। এর উপর নারীর চূড়ান্ত অধিকার ও কর্তৃত্ব রয়েছে।
৫। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও পুত্র থাকলে স্ত্রী পুত্রের ১ অংশের সমান অংশ পাবে।
৬। একাধিক কন্যা থাকলে কুমারী কন্যা পাবে, বিবাহিত নিঃসন্তান কন্যা পাবেনা। কন্যার গর্ভজাত পুত্রসন্তান উত্তরাধিকারী হবে।
৭। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী জীবন সত্ত্ব ভোগ করেন। তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি পুত্রদের মধ্যে ভাগ হয়।
৮। বণ্টনের সময় কোন অংশীদার মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীগণ ওয়ারিশ হবে।
৯। কোন পুত্র দত্তক নিলে সে স্বাভাবিক পুত্রের ১/৩ অংশের মালিক হয়।
১০। কন্যার পুত্র অর্থাৎ দৌহিত্ররা মাথাপিছু হারে সম্পত্তি পাবে।

কখন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন

হিন্দু আইনে কিছু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন, যথা:
ক. ধর্মচ্যুত হলে বা ধর্মত্যাগ করলে।
খ. সন্ন্যাসী উত্তরাধিকার হয় না। সন্ন্যাসীকে সংসার ত্যাগী হিসাবে মৃত ধরা হয়।
গ. অন্ধ, বধির, মূক, অঙ্গহীন, পুরুষত্বহীন এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী পুরুষ ও মহিলাগণ হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত। এমনকি দুরারোগ্য কুষ্ঠ-ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তিগণও উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত।
ঘ. স্বামী অসতী স্ত্রী রেখে মারা গেলে, সেই অসতী স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি পাবে না।
ঙ. হত্যাকারী ও তার ওয়ারিশ মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হবে।

এসকল পুরোনো আইনে এখনো হিন্দু সম্পত্তি বণ্টনের ফলে বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা শুধুমাত্র সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবেই না,সাংবিধানিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতে প্রচলিত উত্তাধিকার আইন

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ইতোমধ্যে তাদের উত্তরাধিকার আইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।

Hindu Succession Act, 1956 প্রণয়নের মাধ্যমে এখন ভারতীয় হিন্দু নারীরা পুরুষের মতই সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার পাচ্ছে! এই আইনকে সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে আরো সময়োপযোগী করা হচ্ছে। এছাড়াও সম্পত্তি অর্জন বিষয়ক আইন ১৯৩০; উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫; ভূমি আইনে হিন্দু নারীদের অধিকার, ১৯৩৭ ইত্যাদি আইনসমূহ ভারতীয় হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার অর্জনে ও হস্তান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.