লকডাউনের পর যে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বাধিক

নাসরীন রহমান:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এর মতো করে যদিও অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানেরা হুমকির স্বরে ঘোষণা করেননি যে, “প্রতিষেধক আবিষ্কার হোক না হোক, লকডাউনে তুলে নেওয়া হবে”, তারপরও ইতিমধ্যেই আক্রান্ত অনেক দেশেই সীমিত পরিসরে লকডাউন তুলে নেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে অর্থনৈতিক বিবেচনায়ই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে দেশে দেশে।

বাংলাদেশে যদিও ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বলবৎ আছে, তবে এই ছুটি বাড়ানো হবে না বলেই অনুমান করা যায়। ইতিমধ্যেই সীমিত পরিসরে গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হয়েছে, মার্কেট, শপিংমল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হলেও মালিক সমিতি তাদের ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় আপাতত মার্কেট বন্ধ রেখেছেন, কিন্তু ঈদের পর খুলে দেওয়া হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা কবে স্বাভাবিক হবে, তা আমরা জানি না। আর স্বাভাবিক হলেও তা কেমন স্বাভাবিক হবে, তা আগে থেকেই অনুমান করা যায় না। আর সে কারণেই আমাদের যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ! এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই আমাদের সামনের দিনগুলোতে এগিয়ে যেতে হবে। যে বিষয়গুলো ছাড়া আমাদের সামনের কঠিন চ্যালেঞ্জিং পথ পাড়ি দেওয়া যাবে না তার মধ্যে রয়েছে যেমন কৃষিখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত, তেমনি রয়েছে স্বাস্থ্যখাত, আইটি খাতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত।

নাসরীন রহমান

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবারই প্রস্তুতি থাকতে হবে যেন আগামীতে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো যায়। অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে সম্ভাব্য সব সুযোগ ও বিকল্প কাজে লাগানো যায়। যে বিষয়গুলোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে:

মনে রাখতে হবে কৃষি না বাঁচলে বাঁচবে না দেশ! জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান ১৩ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থান করে ৪০ শতাংশের। এই সংকটে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নিতে হবে কৃষি ও কৃষককে ঘিরে। প্রতি ইঞ্চি জমি চাষ করতে হবে। কৃষককে সার, সেচ ও বীজ ভর্তুকি বা বিনামূল্যে দিতে হবে এবং সময়মতো কৃষি উপাদান প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

যদিও সরকার ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। এই তহবিল থেকে গ্রামাঞ্চলে যাঁরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি তাঁদের দেওয়া হবে। যাঁরা পোলট্রি, কৃষি ফার্ম, ফলমূল, মসলাজাতীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদন করবেন, তাঁরা এখান থেকে ঋণ নিতে পারবেন, যাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ হয়।

দরিদ্র কৃষক যাতে করে সহজে ঋণের টাকা নিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন না হয় ঋণের টাকা নিতে যেয়ে হাজারো ভোগান্তি পোহাতে হয়! কৃষক যাতে ন্যয্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে প্রয়োজনে ধানের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া সহ অন্যান্য রবিশস্য মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। এই সময়ে দেশের কৃষক যেন দারিদ্র বা অনাহারের গহ্বরে না প্রবেশ করে, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে।।

মনে রাখতে হবে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলেই দেখা দিবে খাদ্যঘাটতি; যা ডেকে আনবে মহাবিপদ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

করোনার কারণে ঘরবন্দি দিনমজুর, ছোট দোকানি, ঠেলাওয়ালা, রিকশাচালকসহ কাজ হারানো প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়ে যেসব শ্রমিক গ্রামে অবস্থান করছে তাদের গ্রামেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাছ চাষ, পশু খামার, সব্জি উৎপাদনের মতো লাভজনক আয়ে তাদের নিয়োজিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও সরকার করোনা পরবর্তীতে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে এমন বিষয়ে প্রকল্প নেয়ার জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছে তবে এই নির্দেশনা যাতে দ্রুত কার্যকরী হয় তারও ব্যবস্থা নিতে হবে। কাজ হারানো শ্রমিকদের শহরমুখী প্রবণতা রোধ করে গ্রামেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কর্মপ্রত্যাশী যুবদের আয় বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত করার মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস; বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

এই তো গেল গ্রামীণ পর্যায়ে। শহরে?

করোনা পরিস্থিতিতে ই-কমার্স খাতের গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। লকডাউনের নিত্য প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুর জন্য সকলকে ই কমার্সের উপর নির্ভরশীল। করোনা ভাইরাসে দেশের সংকটকালীন প্রথাগত ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন অচলাবস্থা তখন সীমিত পরিসরে হলেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ই-কমার্স কোম্পানিগুলো।

বর্তমানে দেশে ই-কমার্সের প্রায় আট হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এই খাতে কর্মরত আছে প্রায় সোয়া লাখ উদ্যোক্তা ও কর্মী। জিডিপিতে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ আসে ই-কমার্স থেকে। করোনা পরবর্তী সময়ে ই কমার্স হতে পারে একটা সম্ভাবনাময় খাত। যেসব প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার তারা ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতে পারেন। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি রাইড শেয়ারিং ব্যবসা ‘পাঠাও’ এর অনেকে ফুড ডেলিভারিতে নিয়োজিত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে হবে। লকডাউন তুলে নিলে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ উপসর্গবিহীন ভাইরাসবাহী হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াবে; অন্যকে সংক্রমিত করবে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটু কম, বয়স বেশি বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তাদের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যবস্থাসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, সেবাকর্মীর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের সীমিত সামর্থ্য দিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দিতে হবে জনগণকে।

আবার কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে নন কোভিড রোগীরাও যাতে বাদ না পড়েন সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয় সেই সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও যাতে কোভিড রোগীরা সেবা পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, লকডাউন পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মাঝে যেমন সমন্বয় প্রয়োজন, তেমনি সরকারের সঙ্গে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত শক্তি কাজে লাগিয়ে এ সংকট মোকাবিলা করতে সরকারকেই। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সহযোগিতা করতে হবে।

সম্ভাব্য সংকট ও প্রতিকার আগে থেকেই ভেবে রাখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.