মুড সুইং আর মেল ডিপ্রেশনের কথা কেউ বলে না

আহনাফ তাহমিদ রাতুল:

মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বললে ভুল হবে। এরচেয়ে যদি বলি সমস্যা দুটো হাতে হাত রেখে সমাজে বিরাজমান, সেটাই বোধহয় সত্য। তবে প্রথমটা নিয়ে আমরা যতটা কনসার্ন, দ্বিতীয়টা নিয়ে খুব বেশি একটা কথা বলা হয় না। আমাদের সাইকিতে মুড সুইং ব্যাপারটা ইমোশনালি যতটা পুশ করা হয়েছে, সেটা রীতিমতো প্রশংসার বিষয়। মেয়েদের এই সমস্যাটা নিয়ে কথা বলা, আওয়াজ তোলা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে মনে রাখতে হবে, মেল ডিপ্রেশনের হাতটা ছেড়ে দিয়েও কাজটা বোধহয় আমরা ঠিক করছি না। মুড সুইং যতটা আলোচনার দাবিদার, মেল ডিপ্রেশনও ততটাই। কিংবা মেল ডিপ্রেশন নিয়াও অনেক কথা হয়। আমার চোখে খুব একটা পড়েনি। ভুল বললে দুঃখিত।

রুট আসলে কোথায়? পরিবার থেকে আসে। সমাজ থেকে আসে। ছোটবেলা থেকেই ছেলে সন্তানকে অন্যরকমভাবে ট্রিট করা হয় পরিবারগুলোতে। ব্যাটাছেলে, পুরুষ হয়ে জন্মেছিস, সিনা টান করে চলবি- এসব কথা বলতে বলতে ছেলেগুলোকে যেন আরও দাবিয়ে দেয়া হয়। কেন রে ভাই! ছেলেদের কি কাঁদার অধিকার নাই? ছেলেদের মন খারাপ হতে পারে না?

বি আ ম্যান- বলে সোসাইটি আমাদের হাই ফাইভ দেয়, পরিবার চোখ রাঙায়। আমরা আরও ভয়ে কুঁকড়ে যাই। ম্যান হতে যেয়ে মানবিক সত্ত্বাটা ধীরে ধীরে হারায়ে যেতে থাকে। দুই কাঁধে ফেরেশতার ভারটা টের পাওয়া যায় না, তবে সোসাইটি আর ফ্যামিলি থেকে আসা ক্রমাগত চাপটা বেশ টের পাওয়া যায়।

আহনাফ তাহমিদ রাতুল

মেয়েদের একটা ব্যাপারকে আমি রীতিমতো হিংসা করি। সেটা হচ্ছে তাদের সাপোর্ট সিস্টেম। চমৎকার একটা সাপোর্ট সিস্টেম তারা তৈরি করে নেয়, কিংবা হয়ে যায়। যে কোনো সমস্যায় পড়লে বন্ধু বান্ধবের সাহায্যটা না চাইতেই পেয়ে যায়। শেয়ার করতে পারে। ছেলেরাও যে পায় না, সেটা বলব না। তবে এক্ষেত্রে শক্তিশালী একটা সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করাটা খুব জরুরী। সেটা আমরা পারি কয় জন? মন খারাপের নিত্যসঙ্গী হয় সিগারেটের প্যাকেট। একের পর এক জ্বালিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়তে থাকি। এভাবে মন ভালো হয়? ফুসফুস পুড়িয়ে? কে জানে!

বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে “কী হয়েছে খুইলা বল!” এর চেয়ে “চল মামা, বিড়ি খাই। এগুলা কোনো সমস্যা না।” সার্কেলের জোরটাই বেশি। ভুল। এগুলা অনেক বড় একটা সমস্যা। শুনতে হবে। বলতে হবে।

ডিপ্রেশনে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ থাকে। শেয়ার করতে না পারা, পারিবারিক ঝামেলা, প্রেমে ছ্যাকা খাওয়া, পড়াশুনায় সমস্যা, আর্নিং সোর্স না থাকা। সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে নির্দিষ্ট একটা বয়সের এসে টাকা কামাই করার উৎস হতে না পারা। এই টাকা কামাই করার উৎস হবার সাথে অনেক কিছু ডিপেন্ড করে। পরিবারের দেখভাল, সামাজিক স্ট্যাটাস, প্রেমিকাকে দেয়া কথার বরখেলাপ না হওয়া, মানসিক শান্তি। আর এগুলো যদি না হয়, একটা ছেলে (ছেলে না বলে পুরুষ ধরে নিন। সোসাইটিতে ছেলে টার্মের চেয়ে পুরুষ টার্মের ভার বেশি) ধীরে ধীরে চাওয়া-পাওয়ার নিকেশে ডুবতে শুরু করে। অবস্থা চরমে পৌঁছালে সুইসাইড করার মতো পথও বেছে নেয়। পত্রিকা, সামাজিক মাধ্যম আর ক্যাম্পাসের হলগুলোই প্রমাণ।

ডিপ্রেশনে পড়লে প্রথমে ক্ষয় হতে থাকে মন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটার স্থায়িত্ব মেয়েদের মুড সুইং-এর সময়কালের চেয়েও অনেক অনেক বেশি। কারণ, ডিপ্রেশনের সাথে আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছু জড়িত থাকে। ফলটা ভোগ করতে হয় পরিবারকে, বন্ধুদের, প্রেয়সীকে। কারণ এখানে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ নিজের মতো বসে থাকার সুযোগও কেউ দেয় না। ওই যে, বি আ ম্যানের ঘেরাটোপে ছেলেরা আগেই বন্দী! এরপর মনের সাথে সম্পর্ক চলে আসে শরীরের। স্বাস্থ্য ভাঙতে থাকে, চোখের নিচে কালি পড়তে থাকে, বিবাহিত হলে কিংবা সেক্সুয়াল লাইফে একটিভ থাকলে সেটার ওপরও প্রভাব পড়তে শুরু করে।

এতোকিছুর পরও কিন্তু শেয়ার করার একটা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না সহজে।

কী রে, গাঁজা খাওয়া ধরেছিস?

কী রে, ছ্যাক খেয়েছিস?

কী রে, দেবদাস হয়ে গেলি?

আরও কত-শত প্রশ্ন। বেচারা ছেলেটা মনের মধ্যে আরও কুঁকড়ে যায়। সমাজটাও খুব একটা ভালো না। মনের কথা আপনি কারও সাথে শেয়ার করতে যাবেন। দুদিন পর দেখবেন আড়ালে আবডালে আপনাকে নিয়েই মজা লোটা হচ্ছে। এরচেয়ে নিজের কষ্টগুলো নিজের কাছেই জমা থাক। বুকটায় পাথর জমতে শুরু করুক। একদিন না আবার টুপ করে ডুবে যায় জলের অতলে!

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশনের মতে প্রতিদিন ৯ শতাংশ মানুষ ডিপ্রেশন কিংবা এনজাইটিতে ভুগতে থাকে।

আর লাইফটাইমের হিসাব করলে সেটা ৩০.৬ শতাংশ। উন্নত দেশের শতাংশটা যদি এমন হয়, আমাদের দেশে এটা নিয়ে কোনো শতাংশের হিসাব করাটাও ভয়ের ব্যাপার। সকাল বেলা যেমন ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করাটা নিয়ম, মেল ডিপ্রেশনকে পাশে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে ফাইট করে যাওয়াটাও একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মনের সাথে শরীরের সংযোগটা অনেক বড়। কাজের পারফর্ম্যান্সের ক্ষেত্রেও এটার প্রভাব পড়ে। চলতে থাকে একটা অনগোয়িং নেভার এন্ডিং সাইকেল। ডিসথেমিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, স্লিপ ডিস্টার্বেন্স- অনেক অনেক সমস্যার সূত্রপাত হতে থাকে। তারচেয়ে বেশি যেটা দেখা যায়, তা হচ্ছে হতাশা। সবকিছু নিয়েই হতাশা শুরু হয়ে যায়। নিজের সক্ষমতার ওপর যখন একজন মানুষ সন্দেহে পড়তে থাকে, কুঁকড়ে যেতে থাকে, তারচেয়ে বড় সমস্যা আর কিছু নেই। কাউন্সেলরের কাছে যেতে কিংবা মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে যেতেও দোনোমনা। বাড়তে থাকে ক্রনিক ডিজিজ। এসকেপিস্ট বিহেভিয়ারও এরমধ্যে অন্যতম। দায়িত্ববোধ থেকে পালানো, দায়িত্ব থেকে পালানো। মানুষ আঙুল তোলে খুব সহজেই। কিন্তু কেন লোকটা পালাচ্ছে, সেটা নিয়ে কখনও কথা বলতে চায় না। দুদণ্ড স্থির থেকে একটু কথা বলার মতো শান্তির কিছু কি আছে?

আমি আসলে কেন কথাগুলা বললাম নিজেও জানি না। সাইকোলজি নিয়া আমার পড়াশোনা শুণ্যের কোঠায়। যখন ইচ্ছা হয়, হেলথ রিলেটেড ওয়েবসাইটগুলা ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। আমার হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। বি আ ম্যানের ফাঁদে পড়তে ভালো লাগে না। বি আ হিউম্যান কেউ বলে না।

একবার কোথায় জানি দেখেছিলাম পুরুষের নিচের ঠোঁট ধরে কাঁদতে নেই জাতীয় একটা কবিতার বইয়ের নাম। আচ্ছা, নিচের ঠোঁট ধরে কাঁদতে না হয় না-ই দিলো সমাজ, অন্তত কাঁদার অধিকারটা দিক! দিনশেষে হতাশা, দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করার অধিকার একটা মেয়ের যতটা আছে, একটা ছেলেরও ততটাই। এভাবেই সমাজ গড়ে। আর সমাজের কথাও বলে লাভ নাই। যেই সমাজ পঁচিশের কোটায় আসার পরপরই ছেলেদের চাকরি আর কবে বিয়ে করছ টাইপ প্রশ্ন শুরু করে, তাদের নিয়া কিছু বলারও নাই। সব প্রশ্নের সমাধান এদের কাছে বিয়ে আর চাকরি পর্যন্তই।

শেয়ার করুন:
  • 3.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.