আতংক-কালে প্রবীণরা কেমন আছেন?

নাসরীন মুস্তাফা:

আমার শাশুড়ি মা কানে শুনতে পান না। চশমা ছাড়াই সুঁচে সুতো পরানোর কাজটা কিন্তু এখনও করেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়ম মেনে হাঁটতেন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে ঘরের চৌকাঠ পার হননি।
কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য নিয়ে দুপুর নাগাদ প্রেস ব্রিফিং হয় বলে দুপুর দুপুর নামাজ পড়ে তসবিহ হাতে নিয়ে টিভির কাছে গিয়ে বসেন। পর্দায় ছুটতে থাকা স্ক্রল খবর দিতে থাকে প্রতিদিনের মৃত্যুর সংখ্যা। মা মনোযোগ দিয়ে সংখ্যা হাতড়ান। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে আসেন। আমাদের কাউকে খুঁজে বের করতে হয় তখন। মুখ শুকনো করে জানান সংখ্যাটি। এরপর হাহাকার ছড়িয়ে বলেন, কী যে হবে!

কারোর সাথে সামনাসামনি দেখা হওয়ার উপায় নেই। ভিডিও কলে দেখেন। নিউইয়র্কে ছোট নাতিন, উত্তরায় মেয়ে, পরীবাগে বড় নাতিন, গ্রামে কোন আত্মীয়, এভাবে সবাই এক জোট হয়ে ডিজিটাল আড্ডায় বসা হয়। তিনি তখন স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে প্রিয়জনদের স্পর্শের স্বাদ নিতে চান। মাঝে মাঝে কোনো কথা নেই। চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন।
বয়সী মানুষটা সব চিন্তা এড়ানোর জন্য খুব করে ব্যস্ত থাকতে চান। যে কাজ করা হয়ে গেছে তা আবারও করেন। যে কাজ তার করার দরকার নেই, সেটাও করেন। সেলাই করতে ভালোবাসেন। এখন আর তা করছেন না। কেবলই রান্না করেন। সেদিন পিঠা বানাতে বসলেন। মিষ্টিতে আগ্রহ নেই কারোর, মিষ্টি পিঠাও বানালেন।

নাসরীন মুস্তাফা

আজকাল মৃত্যুর সংখ্যা কেবল নয়, সমান বয়সী মানুষগুলোর মৃত্যুযাত্রা মুখটাকে শুকিয়ে ফেলছে, টের পাই। স্বজন হারানোর মতো করে কষ্ট পান। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বড় নাতিনটা ডাক্তার, তার সুস্থতা নিয়ে চিন্তা করতে করতে কখনো আবার রেগে যান তাদের উপর, যারা নিয়ম মানছে না, পথে নামছে। ধার্মিক মানুষটি মসজিদে নামাজ পড়া মানুষগুলোর উপরও রাগ ঝাড়েন। ইদানিং ঈদের শপিং কেন করতে হবে, কেনই বা ঈদের জামাতে যেতে হবে, এসব নিয়ে আপন মনেই বকবক করছেন। হঠাৎ হঠাৎ আমার দুই কন্যাকে ডেকে কাছে বসান। ক্লাস এইটে পড়া জনকে আহ্লাদ করে বলেন, মন্টু! কোলে আইস!

কয়েক বছর আগে পেট্রোল বোমায় মানুষ পোড়ানোর ভয়াবহ ঘটনা যখন ঘটতো, তখন বেঁচেছিলেন বাবা। পুলিশ সার্ভিসে ছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধের সময়কার বাস্তবতা পেট্রোল বোমার ভয়াবহতার সাথে মিলিয়ে ফেলতেন। বারান্দা থেকে হঠাৎ ছুটে ঘরের ভেতর এসে বলতেন, রাজাকাররা নেমে গেছে পথে। ওদের হাতে বড় বড় রামদা। সবাইকে মেরে ফেলবে। দরজা লাগাও। জানালা লাগাও।

তখন আমরা টেলভিশনের খবর দেখা বন্ধ করেছিলাম। বাংলাদেশ টেলিভিশন ভয়াবহতার খবর প্রচারে সাবধানতা অবলম্বন করে। সেই খবরও দেখা হতো না। দেশের গান, কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান, কার্টুন, ফিল্ম আর খেলার সম্প্রচারে নিমগ্ন থাকতাম বাকিরা। বাবা তামিম ইকবালকে চিনে গেলেন। সালমান শাহ্ আর শাহেদ কাপুরকে তার খুব ভালো লেগে গেলো। আমরা স্বস্তি টের পেতাম।

খবর দেখা বন্ধ করেছি এবারও। দেশি কোন চ্যানেলেই থাকি না। স্পোর্টস চ্যানেল, বিদেশি ফিল্ম চ্যানেলে ঘুরছি। কেননা এখানে বাংলা ভাষায় স্ক্রল ছুটতে পারছে না, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা লেখা থাকে। মা’কে নিয়ম করে জানাচ্ছি, দেশের অবস্থা ভালো হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো ব্রিফিং হচ্ছে না। ঈদের পরেই সব পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে। কোনোদিন দেখা হয় না এমন কিছু বাংলা সিরিয়াল, বাংলা ফিল্ম টিভি আর ইউটিউবে নামিয়ে তাকে দেখানো হচ্ছে, যেখানে সেই রকমের প্যাঁচানো পারিবারিক গল্প আছে, যা দেখে মা চেনা বাস্তবতার স্বাদ পান। অচেনা মহামারীর আতংক তিনি আর নিতে পারছেন না।

মা’কে দেখতে দেখতেই বয়সী মানুষগুলোকে মন দিয়ে দেখছি। ফেসবুকে আছেন এমন বয়সী মানুষগুলো, তারা অন্ততঃ স্ট্যাটাস দিতে পেরে আতংকের ভার হাল্কা করতে পারেন। উল্টোটাও হচ্ছে। বেয়াক্কেলে অনেকের ফেসবুক স্ট্যাটাস বয়সী অনেকের মাঝে আতংক ছড়াচ্ছে। তরুণরাও স্বভাবজাত ডোন্ট কেয়ার ভাব বজায় রাখতে পারছেন বলে সব সময় মনে হচ্ছে না। আর যেসব বয়সী মানুষের এমন ডিজিটাল জানালার খোঁজ জানা নেই, হয়তো অনেকের সহানুভূতিশীল পারিবারিক পরিবেশ নেই, হয়তো অনেকের পরিবারও নেই, হয়তো অনেকের ঠাঁই মিলেছে বৃদ্ধাশ্রমে, তাদের আতংক তারা কোথায় রাখছেন জানা নেই।
এই ভয়ংকর ভাইরাস ঠেকাতে চাই মনের সাহস। আতংকিত প্রবীণরা সেই সাহস খুঁজে না পেলে আক্রান্ত হবেন বেশি। সেই জন্যেই এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত মৃত্যুর হার প্রবীণদের মাঝেই বেশি। সারা বিশ্বেই এটি ঘটছে।

ঢাকা শহরে থাকা আত্মীয়দের সাথে চাইলেও দেখা করতে না পারায় জন্ম নেওয়া হতাশাজনক একাকিত্ব এড়ানো মুশকিল। শিশুদের মতোই বয়সী মানুষগুলোও সব সময় ঠিকঠাকভাবে মনের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক সময় দিয়ে কথা শুনতে হয় এদের। লকডাউনে আটকে পড়া পরিবারের বাকিরা কি মুঠোফোন, সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম থেকে মনোযোগ সরিয়ে পাশের ঘরে থাকা বাবা-মা কিংবা দূরে থাকা বয়সী আপনজনের সাথে টেলিফোনে একটু লম্বা সময় কথা বলেন? সেই কথার মাঝে পুরনো দিনের মজার কথা, ভালোবাসা মাখা আবেগময় সময়ের কথা বলে হা হা করে হাসতে দেন তাদেরকে? লকডাউনের ভালো দিক যে তাদের সাথে কাটাতে পারা মহামূল্যবান সময় পাওয়া, এ কথা কি শুনেছেন তারা?

বহু বছর দেখা হয় না, এমন এক দূর সম্পর্কের খালাতো বোনের মামাতো ভাইয়ের কাকাতো বোন, যে কিনা ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল, সেই বোনের লতাপাতা খুঁজে বের করে ভিডিও কলে বসিয়ে দেওয়া যায় না? খুব যায়। ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া মা’কে আমরা সেদিন মন খুলে আড্ডা দিতে দেখলাম। কানে শোনেন না। ওপাশের তিনিও কানে শোনেন না। আড্ডাতে সমস্যা হয়নি মোটেও।

কত রকমের ফেসবুক লাইভ হচ্ছে দেখছি। সেলিব্রেটি-টেলিব্রেটির সাথে লাইভ তো বহুত দেখেছি। জীবনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই মানুষগুলোর সাথে লাইভে আড্ডা দিতে আগ্রহী কেউ আছেন?
তাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?
করোনা সময়ে কতকিছুই না জানছি। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলে বেশ হতো।

শেয়ার করুন:
  • 107
  •  
  •  
  •  
  •  
    107
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.