পরিবারই হোক প্রতিটি সন্তানের মানসিক হাতিয়ার

শাহানা লুবনা:

লকডাউনের এই সময়টিতে সন্তানেরা বাড়িতে অবস্থান করছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ তাই তাদের হাতে এখন অফুরন্ত সময়। এই সময়টা তারা কীভাবে ইউটিলাইজ করবে বা করা উচিত এ নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন—বই, পড়া, ছবি আঁকা, গান, নাচ কিংবা অন্য কোনো এক্টিভিটিসে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা। কিংবা এমন কোনো বিষয় যা তার মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে সেটিকে জাগিয়ে তোলা ইত্যাদি….।

সময়টিতে সন্তানেরা কী করবে সেটির যেমন গুরুত্ব রয়েছে তেমনি পরিবারগুলো কীভাবে সন্তানদের সঙ্গে সময়টি অতিবাহিত করবেন সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এতোটা দীর্ঘ সময় সন্তানকে কাছে পাওয়া পরিবারের জন্য প্রকৃতির একটি আশীর্বাদ বলা চলে। হ্যাঁ অবশ্যই প্রকৃতির একটি আশীর্বাদ। কেননা শিক্ষার নামে সন্তানদের যেভাবে সারাদিন কলুর বলদের মতো খাটানো হয় তাতে করে এ+ নামক সার্টিফিকেটই তাদের ফাইলে সঞ্চিত হয়, কিন্তু বঞ্চিত হয় তারা প্রকৃত শিক্ষা থেকে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও পারিবারিক শিক্ষা নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেটি গ্রহণ করা বা প্রদান করার সময় আজ কারো হাতে নেই– না পরিবারের না সন্তানদের। ব্যস্ততার ভারে সবাই আজ নুহ্য। ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে সেটি আজ সহজেই পরিলক্ষিত হয় সমাজ এবং রাষ্ট্রে। মানবিকতা ও নৈতিকতা জ্ঞানশূন্য হয়ে বেড়ে উঠে ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে তারা। পারিবারিক শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ঘাটতি বা অপূর্ণতার দায়ভার এড়াতে পারেন না পরিবার গুলো। প্রকাশ্য দিবালোকে শত মানুষের সামনে রামদা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে বিশ্বজিৎ হত্যা, রিফাত হত্যা এবং সবশেষে বুয়েট ছাত্র আবরারকে হলের মধ্যে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা- এরকম অসংখ্য অপরাধ প্রমাণ করে শিক্ষার মূল ঘাটতিটা কোন জায়গায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইঁদুর দৌড়ে মূল শিক্ষাই আজ বিপন্ন। এর খেসারত দিতে হচ্ছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সকলকে।

কেবল নৈতিকতা, মানবিকতা নয়, আত্মসম্মান নিয়ে বেড়ে ওঠার শিক্ষাটাও পরিবারকেই দিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় পরিবারই এই শিক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষার খাতায় দুই/তিন নম্বর বাড়িয়ে দিলে সন্তানের পজিশন অনেকটা এগিয়ে যায় এই চিন্তাধারা থেকে অনেক অভিভাবক শিক্ষকদের কাছে ধর্না দেন। নিজের ব্যক্তিত্ব, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে। ফলে সেই শিশুর মনে ছোটবেলা থেকে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সম্মান অর্জনের বিষয়টি জেঁকে বসে। পরিণত বয়সেও সে এ থেকে বের হতে পারে না।

কর্মক্ষেত্রে অন্যের হাতে পায়ে ধরে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নিজের পজিশন একটু উপরে উঠানো, একটু এগিয়ে নেয়ার প্রবণতা তার মধ্যে থেকেই যায়। এ কারণেই মূলত সমাজে ‘তদবির’ নামক শব্দটির এত ব্যাপক প্রচলন ও চাহিদা দেখতে পাওয়া যায়। ফলে সমাজে কি়ংবা রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি চলে যায় অনেক পেছনে। প্রচলিত হয়ে ওঠা এই সিস্টেমের দায়ভার আমরা কেবল রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দেই। কিন্তু পরিবারগুলো কী এই দায়ভার এড়াতে পারেন? রাষ্ট্র টিকে আছে তার জনগণ নিয়ে। কাজেই রাষ্ট্রকে একতরফা দোষ দিয়ে নিজের দায়িত্বভার অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সম্মান পাওয়া এবং সম্মান অর্জনের মধ্যে ব্যবধানের ব্যাপকতা বুঝতে হবে। যে জিনিষ চেয়ে সহজে পাওয়া যায় সাময়িকভাবে তার মূল্য থাকলেও স্থায়িত্ব ক্ষীণ। যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করা সম্মান নিজের ভিতরের আমিত্বকে বাঁচিয়ে রাখে। সন্তানদের মধ্যে এই ধারণা গুলোর ভীত মজবুত করার দায়িত্ব পরিবারের। বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের ক্ষেত্রে। আত্মসম্মান নিয়ে লড়াই করে টিকে থাকার শিক্ষা তাকে শিশুকাল থেকে পারিবারিক ভাবেই দিতে হবে। গাছের গোড়া শক্ত হলে তবেই সে গাছ ডালপালা মেলে সঠিক ভাবে দাঁড়াতে পারে। তা না হলে সমাজের চোখে সম্মানহানির ভয়ে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নানা ধরনের অন্যায় অবিচার মেনে নিতে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।।

কর্মক্ষেত্রে, বৈবাহিক জীবনসহ বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। উচ্চপদস্থ স্বামীর অনৈতিক কর্মকান্ডকে উপেক্ষা করে, তার সমস্ত অন্যায় অবিচার মেনে নিয়ে সংসারে টিকে থাকে। স্বামীর পদবীর সম্মানে সম্মানিত হয়। নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে, নিজের ভিতরের আমিত্বকে গলা টিপে হত্যা করে। অনেকে সেটি করে স্বেচ্ছায়, অনেকে সমাজের ভয়ে। দুটো ক্ষেত্রেই পারিবারিক শিক্ষার অপ্রতুলতা দায়ী। সমাজের সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তখনই টিকে থাকা যায় যখন পরিবার পাশে থাকে, তার সঠিক দিক নির্দেশনা পাশে থাকে।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অবশ্য মেয়েদের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা দেখা যায়। একসময় নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের দ্বারা এসব অপরাধ সংঘটিত হলেও এখন উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরাও এতে সংযুক্ত হচ্ছে বা হয়েছে। পরিবারের উদাসীনতা, সন্তানদের সাথে পর্যাপ্ত সময় অতিবাহিত না করা, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না তোলা এবং সর্বোপরি সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারাই এর মূল কারণ একথা অনস্বীকার্য। যে কোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এর মূল উদঘাটন করে তবেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

শিশুকাল থেকে সুশিক্ষার পাঠদান পরিবারকেই দিতে হবে। গাছের গোড়া শক্ত না করে আগায় পানি ঢেলে লাভ হবেনা। সন্তানদের প্রকৃত পাঠাগার তার পরিবার একথা মাথায় রাখতে হবে।

সুশিক্ষার অভাবে যে অপকর্ম, যে বিশৃঙ্খলা সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তার শৃঙ্খলা আনতে প্রকৃতি সকলকে এখন এক মহা সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। সময়ের এ সুযোগকে কাজে লাগানো প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব, কর্তব্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে ঘাটতি বর্তমান সময়ে হচ্ছে সেটি পুষিয়ে নেয়ার জন্য রাষ্ট্র রয়েছে। কিন্তু পারিবারিক শিক্ষার যে নিদারুণ ঘাটতি তাদের মধ্যে রয়েছে বা দেখতে পাওয়া যায় তা পূরণ করার এখনই মোক্ষম সময়। দু’শ বছর আগে লালন বলেছিলেন, “সময় গেলে সাধন হবে না”।
লালনের কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় — সময়কে বেঁধে ফেলুন আপনার এবং সন্তানের মাঝে।

সন্তানের পাশে থাকুন, সন্তানকে পাশে রাখুন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.