করোনা সংকটকালে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারী

নাসরীন রহমান:

কোভিড ১৯ মানব জাতিকে এক মহাসংকটে ফেলে দিয়েছে; এক অসহনীয় গৃহবন্দী সময় পার করতে হচ্ছে সকলকে।
যেকোনো দূুর্যোগ, মহামারী যখন আসে তা নারী-পুরুষ কাউকে ছাড়ে না; তবে সমাজব্যবস্থা ও সমাজের জেন্ডার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে দুর্যোগের অভিজ্ঞতা নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা রকম হয়ে যায়। কোভিড ১৯ এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি!

কোভিড ১৯ নারীদের ফেলে দিয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে; কোভিড ১৯ এর ফলে জরুরি অবস্থায় নারীর স্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় রকমের হুমকি হিসেবে কাজ করছে; নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এই মহামারী কালে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ময়মনসিংহের ভালুকায় হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়ার ফলে রাস্তায় সন্তান জন্মদানের ঘটনাটি। এছাড়া গৃহবধূ শিমুলী রানী দাসের সন্তান প্রসবের ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল চত্বরে ভ্যানের ওপর গত ১ মে সকালে সন্তান প্রসব করেন তিনি।

লকডাউন চলায় বিভিন্ন স্থানে এধরনের আরও ঘটনা ঘটছে। এই সময় প্রয়োজনীয় সেবার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়া ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া অনেক কঠিন। আবার অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যেতে চান না। আবার মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের পাওয়াও কঠিন। ফলে এ ধরনের অনিরাপদ প্রসব এবং সেইসাথে অনেক গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটছে।

শুধু প্রসবোত্তর স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়; এই সংকটকালীন সময়ে নারী রয়েছেন অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিতেও।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ইমপ্যাক্ট অব দ্য কোভিড-১৯ প্যানডেমিক অন ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড এনডিং জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে নিম্ন-মধ্যম আয়ের ১১৪টি দেশে প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ নারী আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের হার বাড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে নারী ও মেয়েশিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য।

২০১৪-১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা সংক্রমণের সময় ও দেখা গেছে, নারী ও কিশোরীদের গর্ভধারণের হারও বেড়ে গিয়েছিল সে সময়।

বাংলাদেশেও লকডাউনে বাল্য গর্ভধারণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে লকডাউনের ফলে পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং নারী শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ ও বাল্য গর্ভধারণ বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”

দুর্যোগে নারীর সব ধরনের ঝুঁকি বাড়ে, অর্থনৈতিক, শারীরিক, মানসিক, সহিংসতার ঝুঁকি।

কিন্তু এই সময় এই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের প্রভাব যা ভবিষ্যতে নেতিবাচক হতে বাধ্য; কারণ এই সময়ে অর্থাৎ কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের এই সময় নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করলে একদিকে যেমন গর্ভের সন্তানের সঠিক বিকাশ ব্যাহত হবার আশংকা থেকে যায় নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের দিক বিবেচনা করে, তেমনি নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বেড়ে যায় তার গর্ভকালীন যথেষ্ট যত্নআত্তির অভাবের আশংকা থেকে।

তাছাড়া এই করোনাকালীন সময়ে স্বভাবতই সকলে এক মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন; নারী’ও এর বাইরে নয়, ফলে গর্ভবতী নারীর এই মানসিক অবস্থা তার সন্তানের উপর কি প্রভাব ফেলবে বলা মুশকিল!

অনেকেই জানেন গর্ভাবস্থায় নারী মানসিকভাবে হতাশ, বিষন্ন থাকলে গর্ভের শিশুর উপর তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক সময় মিসক্যারেজসহ অসম্পূর্ণ শিশু জন্মের আশংকা থাকে।

তাই এই সময়ে নারী’র স্বাস্থ্য দিক বিবেচনা করে পুরুষসঙ্গীর উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা। মনে রাখতে হবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ প্রতিহত করার অনেক উপায় আছে, শুধু দরকার সচেতনতা। একমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধিই সাহায্য করতে পারে এই করোনা সংকটকালে নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে।

শেয়ার করুন:
  • 57
  •  
  •  
  •  
  •  
    57
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.